দ্বীন ও প্রযুক্তির সংমিশ্রণ

এইচ এম শরীফ

🕌 ইমাম ও খতীব 🎓 আলেম ও শিক্ষক 💻 সল্যুশন ডেভেলপার
আসসালামু আলাইকুম, আমি এইচ এম শরীফ। ১৩+ বছর ধরে ইমামতি, দ্বীনি শিক্ষাদান ও প্রযুক্তি খাতে কাজ করছি। দ্বীনি জ্ঞান ও আধুনিক ডিজিটাল সলিউশনের সমন্বয়ে সমাজসেবাই আমার লক্ষ্য। আমি শরীফ মাল্টিমিডিয়া-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং হিলফুল ফুজুল কল্যাণ পরিষদের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছি।
Sharif
✨ দক্ষতা ও পরিচিতি

দ্বীনি ও সামাজিক খিদমত

🎓 আলেম (দাওরা হাদীস) 🕌 ইমাম ও খতীব 📖 শিক্ষকতা (উচ্চ শিক্ষা) 🤝 সমাজসেবক ও পরিচালক

প্রশিক্ষণ ও আইটি কনসাল্টিং

💻 কম্পিউটার ট্রেইনার ⚙️ অটোমেশন কনসালট্যান্ট 💼 মাল্টিমিডিয়া আইটি উদ্যোক্তা

প্রোগ্রামিং ও ওয়েব ডেভেলপার

JavaScript (ES6) Google Apps Script HTML5 & CSS3 App Dev (PWA) Web UI Design

ডাটাবেজ ও ক্লাউড সিস্টেম

Google Sheets Automation Microsoft Excel VBA Firebase Cloud SQL Database
Excel/Sheets
JavaScript
Apps Script
PWA App
HTML5/CSS3
Firebase
SQL DB
GitHub
UI Design
🏢 ব্যবসায়ী উদ্যোগ

শরীফ মাল্টিমিডিয়া

সেবা ও বিশ্বস্ততার ৫ বছর (২০২১ - বর্তমান)

শরীফ মাল্টিমিডিয়া একটি আধুনিক ও প্রফেশনাল কম্পিউটার এবং ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ কাস্টমারদের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় সব ধরনের অফিশিয়াল, গ্রাফিক্স ও প্রিন্টিং কাজ আমরা অত্যন্ত নিখুঁত, দ্রুত ও বিশ্বস্ততার সাথে সম্পন্ন করে থাকি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা ইতিমধ্যে ৫০+ প্রাতিষ্ঠানের আইটি প্রজেক্ট সফলভাবে সম্পন্ন করেছি। প্রতিদিন শত শত কাস্টমারকে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়াই আমাদের মূল সাফল্য।

৩০০০+

হ্যাপি কাষ্টমার

৫০০+

সফল প্রজেক্ট

মোবাইল ব্যাংকিং ও রিচার্জ

বিকাশ, নগদ ও রকেটের মাধ্যমে ক্যাশ-ইন/আউট এবং বাংলাদেশের যেকোনো সিম কার্ডে দ্রুত ফ্লেক্সিলোড সুবিধা।

টেলিকম ও সিম সার্ভিস

সকল অপারেটরের নতুন সিম বিক্রয় এবং বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে নষ্ট বা হারিয়ে যাওয়া সিম কার্ড উত্তোলন।

অফিস ও ডকুমেন্ট রাইটিং

বাংলা ও ইংরেজি নিখুঁত কম্পিউটার কম্পোজ, কালার বা সাদাকালো ফটোকপি এবং উন্নত মানের ডকুমেন্টস লেমিনেটিং।

অনলাইন আবেদন ও ট্রাভেল চেক

যেকোনো চাকুরীর সরকারি-বেসরকারি অনলাইন আবেদন, ইমিগ্রেশন ভিসা ও এয়ার টিকিট চেকিং এবং প্রিন্ট সুবিধা।

📖 শিক্ষকতা ও প্রশিক্ষণ

মাদরাসা শিক্ষকতা ও উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষা

২০২১ - বর্তমান

দ্বীনি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া এবং একটি নৈতিক ও আদর্শিক প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি কওমি মাদরাসায় শিক্ষকতা করে আসছেন। তিনি ২০২১ ইং থেকে ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি বিদ্যাপীঠ "হোসাঈনাবাদ মদিনাতুল উলুম মাদরাসা"-য় অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সফলতার সাথে ছাত্রদেরকে শিক্ষাদান করে আসছেন। কওমি মাদরাসার উচ্চতর ক্লাসে আরবী ব্যাকরণ (নাহু-সরফ), ফিকহ (ইসলামি আইনশাস্ত্র) ও হাদীস শাস্ত্রে পাঠদানের দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে।

তাঁর মূল শিক্ষকতার ক্ষেত্রসমূহ:
📖
হাদীস শাস্ত্র ও ব্যাখ্যা (Hadith Studies):

হাদীসের মূল কিতাবসমূহের তাত্ত্বিক পঠন, অর্থ এবং সমসাময়িক বাস্তবমুখী ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ।

⚖️
ফিকহ ও ইসলামি আইনশাস্ত্র (Fiqh):

ইসলামি আইন, মাসয়ালা-মাসায়িল এবং দৈনন্দিন জীবনে দ্বীনের বাস্তবমুখী বিধানের বিশ্লেষণ।

✍️
আরবী ভাষা, ব্যাকরণ ও সাহিত্য:

আরবী ব্যাকরণ (নাহু-সরফ), অলঙ্কার শাস্ত্র (বালাগাত-ফাসাহাত) এবং আরবী ভাষায় অলঙ্কৃত ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনা তৈরি।

বর্তমানে তিনি হোসাঈনাবাদ মাদরাসার মূল মহিলা শাখা প্রতিষ্ঠান "জান্নাতুল বুশরা বালিকা মাদরাসা"-র সর্বোচ্চ তাকমিল (মাস্টার্স সমমান/দাওরায়ে হাদীস) এবং উচ্চতর জামাতসমূহে আরবী সাহিত্য ও হাদীস বিষয়ে গুরুত্ব ও দায়িত্বশীলতার সাথে নিয়মিত পাঠদান করছেন।

তাঁর ভিশন: দ্বীনি ইলমের বিশুদ্ধ জ্ঞান ও সমসাময়িক আধুনিক মূল্যবোধের সঠিক সংমিশ্রণ ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের সমাজ বিনির্মাণে সুযোগ্য ও নৈতিক আদর্শ হিসেবে গড়ে তোলা।

কম্পিউটার প্রশিক্ষক ও আইটি প্রফেশনাল

২০২৩ - বর্তমান

তিনি তথ্যপ্রযুক্তি (IT) ইন্ডাস্ট্রিতে একজন সফল কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। আধুনিক কর্মক্ষেত্রের চাহিদাকে মাথায় রেখে তরুণ ও পেশাজীবীদের দক্ষ করে তোলাই তাঁর মূল লক্ষ্য। তিনি মূলত ২০২৩ সাল থেকে স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক আইটি প্রতিষ্ঠান "প্যারাডাইম শিফট এডুকেশন ইঙ্ক" (Paradigm Shift Education Inc.)-এ অফিশিয়াল কম্পিউটার ট্রেইনার ও প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে কর্মরত আছেন।

তাঁর মূল প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রসমূহ:
💻
বেসিক কম্পিউটার ও অফিস অ্যাপ্লিকেশন:

কম্পিউটারের মৌলিক ব্যবহার এবং অফিশিয়াল কাজের দক্ষতা তৈরি।

🌐
ওয়েব ডিজাইন (Web Design):

আধুনিক ও রেসপনসিভ ওয়েবসাইট তৈরির প্রফেশনাল গাইডলাইন।

📊
এক্সেল ও অ্যাপস স্ক্রিপ্ট অটোমেশন:

(Excel & Apps Script Automation) অ্যাডভান্সড এক্সেল এবং ডেটা অটোমেশনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক কাজকে সহজ ও গতিশীল করার বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ।

তাঁর ভিশন: সঠিক ও বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আইটি ইন্ডাস্ট্রির জন্য শতভাগ যোগ্য ও দক্ষ জনবল হিসেবে গড়ে তোলা।

🕌 ইমাম ও খতীব খিদমত

মসজিদ খিদমতের ইতিহাস

ইমাম ও খতীব

বাইতুন নূর জামে মসজিদ খড়িয়া, শিবপুর, নরসিংদী। ৩ বছর (চলমান)
শুকুন্দী দ. পাড়া জামে মসজিদ শিবপুর, নরসিংদী। ৩ বছর
সেকান্দরদী জামে মসজিদ পলাশ, নরসিংদী। ২ বছর
তেলিয়া বাইতুন নূর জামে মসজিদ শিবপুর, নরসিংদী। ২ বছর
মসজিদে কোবা তাতারকান্দী, শিবপুর, নরসিংদী। ১ বছর
কুমরাদী জামে মসজিদ শিবপুর, নরসিংদী। ৬ মাস
মোট ১১+ বছর খিদমত

জুমার খুতবা ও আলোচনা

সমসাময়িক সামাজিক সমস্যা, ধর্মীয় ও নৈতিক অবক্ষয় দূরীকরণে কুরআন-সুন্নাহর সঠিক পথনির্দেশনা প্রদান।

শিশু মক্তব ও কোরআন শিক্ষা

কচি-কাঁচা শিশুদের বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত, মাসনুন দু’আ ও বুনিয়াদি ইসলামি মূল্যবোধ শিক্ষা দান।

দ্বীনি পরামর্শ ও সমাজ সংস্কার

সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের বিভিন্ন দ্বীনি ও ফিকহী সমস্যার সঠিক সমাধান ও নৈতিক পথপ্রদর্শন।

বিবাহ বন্ধন ও দাম্পত্য কাউন্সিলিং

পবিত্র ইসলামি শরিয়তের নিয়মে বিয়ের আকদ সম্পন্ন করা এবং দম্পতিদের জন্য islamic দাম্পত্য কাউন্সিলিং প্রদান।

সাপ্তাহিক তাফসির ও ফিকহী দরস

সাধারণ মুসল্লি ও যুবকদের মাঝে দ্বীনের বুনিয়াদি জ্ঞান ও মাসয়ালা পৌঁছে দিতে প্রতি সপ্তাহে বিশেষ তাফসির মজলিশ পরিচালনা।

🤝 সমাজসেবা ও পরিচালনা

হিলফুল ফুজুল কল্যাণ পরিষদ

প্রতিষ্ঠিত: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

ঐতিহাসিক ‘হিলফুল ফুজুল’ এর সুমহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০২৩ সালে তাঁর হাত ধরে নরসিংদীতে এই মানবিক সমাজকল্যাণমূলক সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। তাঁদের মূল দর্শন হলো মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সমাজের অবহেলিত ও দুস্থ জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়ে একটি স্বনির্ভর ও স্বস্তিময় সমাজ গঠন করা।

স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিয়মতান্ত্রিক পরিচালনাই তাঁদের মূল শক্তি।

বন্যা ও মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলা

সিলেটের ভয়াবহ বন্যার সময় তাঁদের টিম মানুষের মাঝে খাদ্য ও জরুরি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেয়।

ঈদ ও খাদ্য সামগ্রী বিতরণ

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শুকুন্দী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার অসচ্ছল পরিবারগুলোর হাসিমুখ ফোটাতে নিয়মিত উন্নত খাদ্য সামগ্রী বিতরণ।

শিক্ষা ও কুইজ প্রতিযোগিতা

শিক্ষা ও কুইজ প্রতিযোগিতা শিশু ও মক্তবের শিক্ষার্থীদের ইসলামি জ্ঞান অন্বেষণ ও সুপ্ত মেধা বিকাশে নিয়মতান্ত্রিক কুইজ ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন।

💼 সম্পন্ন প্রজেক্ট

Narsingdi Connect

নরসিংদী অঞ্চলের মানুষের সুবিধার্থে তৈরি একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ জরুরি সেবামূলক অফলাইন পোর্টালে যুক্ত অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ। এতে জরুরি রক্তদানকারী, ফায়ার সার্ভিস, থানা পুলিশ, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এবং অ্যাম্বুলেন্সের নির্ভরযোগ্য ও তাৎক্ষণিক যোগাযোগ ডিরেক্টরি রয়েছে।

Fuel Tracker

জ্বালানি ফিলিং স্টেশনের জন্য তৈরি একটি ক্লাউড ম্যানেজমেন্ট ও স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাকিং সিস্টেম। এটি প্রতিটি গাড়ির তেল ক্রয়ের হিসাব-নিকাশ ডাটাবেজে সংরক্ষণ করে, রিয়েল-টাইম কাস্টম ড্যাশবোর্ড আপডেট করে এবং রসিদ ও অটো-মেসেজ জেনারেট করে।

Madrasha Portal

বৃহৎ ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের অনলাইন ভর্তি, শিক্ষার্থীর প্রোফাইল ডাটাবেজ, পরীক্ষার রেজাল্ট শিট জেনারেশন এবং মাসিক ফিস কালেকশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান করার একটি স্বনামধন্য ক্লাউড পোর্টাল ড্যাশবোর্ড ।

Google Sheets Apps Script Admin Web
✍️ সাম্প্রতিক লেখা
পতনের আওয়াজ পাওয়া যায়

 এক. ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ রাহিমাহুল্লাহ খুব চমৎকার একটা ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলের সাথে তার শেষ হজে আমি সফরস...

💬 মানুষের মতামত

"শরীফ আমাদের অত্যন্ত স্নেহভাজন এবং অত্যন্ত দক্ষ একজন ছাত্র ও সুযোগ্য আলেম। সে দীর্ঘ দিন ধরে আমাদের মাদরাসার দাপ্তরিক কাজ, ওয়েবসাইট ও অনলাইন ডাটাবেজ অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে পরিচালনা করছে। বিশেষ করে মাদরাসার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং আইটি সলিউশনে উনার কাজ ও আন্তরিকতা সত্যিই আমাদের আনন্দিত ও গর্বিত করে।"

আমানুল্লাহ সাহেব
হাফেজ মাওলানা আমানুল্লাহ

প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, হোসাঈনাবাদ মাদরাসা

"হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. মাদরাসার অনলাইন ওয়েবসাইট ও সফটওয়্যার ম্যানেজমেন্টের সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমাদের প্রিয় ছাত্র শরীফ অত্যন্ত সফলতার সাথে সামলাচ্ছে। ইলমে দ্বীন অর্জনের পাশাপাশি আধুনিক আইটি প্রযুক্তিতে উনার এই পারদর্শিতা প্রশংসনীয়। উনার তৈরি করা ড্যাশবোর্ড ও সফটওয়্যার সল্যুশন আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে।"

মাহমুদুল হক সাহেব
মুফতী মাহমুদুল হক মামুন

প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, আবু বকর সিদ্দীক রা. মাদরাসা

"সহপাঠী হিসেবে শরীফকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। দ্বীনি ইলমের পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতে উনার অসামান্য জ্ঞান ও দক্ষতা রয়েছে। আমাদের 'আল মদিনা ন্যাচারাল ফুড'-এর অনলাইন ক্যাম্পেইন, ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং ও কাস্টম বিজনেস সফটওয়্যার ম্যানেজমেন্টের সকল ক্ষেত্রে শরীফ আমার বিশ্বস্ত ও সবচেয়ে বড় সহযোগী। উনার টেকনিক্যাল দক্ষতা ও বন্ধুবৎসল আন্তরিক সাপোর্ট আমাদের ব্যবসায়িক অগ্রগতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।"

আমির হোসাইন সাহেব
হাফেজ মাওলানা আমির হোসাইন

প্রতিষ্ঠাতা, আল মদিনা ন্যাচারাল ফুড

❓ সচরাচর জিজ্ঞাসা
১. এইচ এম শরীফ কে এবং তাঁর মূল লক্ষ্য কী?
এইচ এম শরীফ একজন আলেম, ইমাম-খতীব, শিক্ষক এবং সল্যুশন ডেভেলপার। তিনি দীর্ঘ ১৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইমামতি ও দ্বীনি শিক্ষাদানের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করে আসছেন। দ্বীনি জ্ঞান ও আধুনিক ডিজিটাল সলিউশনের সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাজসেবা এবং একটি নৈতিক ও আদর্শিক প্রজন্ম গড়ে তোলাই তাঁর মূল লক্ষ্য।
২. "দ্বীন ও প্রযুক্তির সংমিশ্রণ" বলতে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
এর অর্থ হলো দ্বীনি মূল্যবোধ ও জ্ঞানকে অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক প্রযুক্তিকে ইতিবাচক ও কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করা। যেমন—মাদরাসা ব্যবস্থাপনার জন্য অটোমেশন সফটওয়্যার তৈরি করা, যুবসমাজের কল্যাণে ডিজিটাল ডিরেক্টরি বা অ্যাপ তৈরি করা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে দ্বীনি ও সামাজিক কাজগুলোকে আরও সহজ ও গতিশীল করা।
৩. ইমাম ও খতীব হিসেবে তাঁর খিদমতের অভিজ্ঞতা কেমন?
তিনি দীর্ঘ ১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে নরসিংদীর বিভিন্ন মসজিদে ইমাম ও খতীব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি নরসিংদীর শিবপুরের খড়িয়ায় অবস্থিত "বাইতুন নূর জামে মসজিদ"-এ ইমাম ও খতীব হিসেবে খিদমত করছেন। খুতবা ও জুমার আলোচনার মাধ্যমে তিনি সমসাময়িক সামাজিক সমস্যা ও ধর্মীয় বিষয়ে সঠিক পথনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
৪. মাদরাসায় শিক্ষকতার ক্ষেত্রে তাঁর প্রধান ক্ষেত্রগুলো কী কী?
তিনি কওমি মাদরাসায় শিক্ষকতা করছেন। বর্তমানে তিনি ঐতিহ্যবাহী "হোসাঈনাবাদ মদিনাতুল উলুম মাদরাসা"-র বালিকা শাখা "জান্নাতুল বুশরা বালিকা মাদরাসা"-র দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স সমমান) এবং উচ্চতর জামাতসমূহে আরবী সাহিত্য ও হাদীস বিষয়ে পাঠদান করছেন। তাঁর মূল পাঠদানের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে হাদীস শাস্ত্র, ফিকহ (ইসলামি আইনশাস্ত্র) এবং আরবী ব্যাকরণ (নাহু-সরফ) ও সাহিত্য।
৫. একজন আইটি ট্রেইনার হিসেবে তিনি কোন কোন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন?
২০২৩ সাল থেকে তিনি আন্তর্জাতিক আইটি প্রতিষ্ঠান "প্যারাডাইম শিফট এডুকেশন ইঙ্ক" (Paradigm Shift Education Inc.)-এ প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। সেখানে তিনি মূলত বেসিক কম্পিউটার ও অফিস অ্যাপ্লিকেশন, রেসপনসিভ ওয়েব ডিজাইন (Web Design), এবং এক্সেল ও গুগল অ্যাপস স্ক্রিপ্ট অটোমেশন (Excel & Apps Script Automation) বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।
৬. তাঁর তৈরি করা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ডিজিটাল প্রজেক্ট কী কী?
তাঁর তৈরি করা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রজেক্ট হলো:
Narsingdi Connect: নরসিংদী অঞ্চলের জরুরি সেবা ও যোগাযোগের জন্য তৈরি একটি অফলাইন ডিরেক্টরি সমৃদ্ধ অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ।
Madrasha Portal: মাদরাসাগুলোর ভর্তি পরীক্ষা, রেজাল্ট শিট ও ফিস কালেকশন অটোমেশনের জন্য তৈরি একটি ক্লাউড পোর্টাল ড্যাশবোর্ড।
Fuel Tracker: জ্বালানি ফিলিং স্টেশনের হিসাব-নিকাশ ও ট্র্যাকিংয়ের একটি ক্লাউড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম।
৭. একজন ডেভেলপার হিসেবে তাঁর টেকনিক্যাল স্কিল বা দক্ষতাগুলো কী কী?
তাঁর টেকনিক্যাল দক্ষতার মধ্যে রয়েছে JavaScript (ES6), Google Apps Script, HTML5 & CSS3, PWA App Development এবং Web UI Design। এছাড়া ডাটাবেজ ও ক্লাউড সিস্টেমের জন্য তিনি Google Sheets Automation, MS Excel VBA, Firebase Cloud এবং SQL Database ব্যবহার করে কাজ করেন।
৮. "শরীফ মাল্টিমিডিয়া" কী ধরনের সেবা প্রদান করে থাকে?
এটি একটি আধুনিক ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র, যা ২০২১ সাল থেকে কাজ করছে। এখানে মূলত অফিশিয়াল ডকুমেন্ট রাইটিং (কম্পোজ, কপি, লেমিনেটিং), সরকারি-বেসরকারি অনলাইন চাকরির আবেদন, ট্রাভেল ভিসা ও টিকিট চেকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, এবং বায়োমেট্রিক সিম রেজিস্ট্রেশনের মতো দৈনিক প্রয়োজনীয় আইটি ও রিটেইল সেবা প্রদান করা হয়।
৯. "হিলফুল ফুজুল কল্যাণ পরিষদ" এর সামাজিক কার্যক্রমগুলো কী কী?
২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মানবিক সংগঠনের মাধ্যমে নরসিংদী অঞ্চলে বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে বন্যা ও দুর্যোগে জরুরি ত্রাণ সহায়তা, ঈদ সামগ্রী বিতরণ এবং শিশুদের মেধা বিকাশে কুইজ ও শিক্ষামূলক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা।
১০. কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার জন্য আইটি বা অটোমেশন সেবা নিতে চায়, তবে কীভাবে তাঁর সাথে যোগাযোগ করবে?
মাদরাসা বা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ভর্তি, রেজাল্ট ও হিসাব-নিকাশের অটোমেশন সলিউশনের জন্য "যোগাযোগ করুন" বাটনে ক্লিক করে সরাসরি যোগাযোগ করা যাবে। এছাড়া ইমেইল, মোবাইল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমেও তাঁর সাথে পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করা সম্ভব।
📞 যোগাযোগ করুন
মোবাইল / হোয়াটস্অ্যাপ / টেলিগ্রাম / ইমো +880 1747-878233
অফিশিয়াল ইমেইল admin@hmsharif.com
অফিশিয়াল ওয়েবসাইট www.hmsharif.com
প্রধান কার্যালয় / অফিস তেলিয়া বাজার, শিবপুর, নরসিংদী।

পতনের আওয়াজ পাওয়া যায়

 এক.

ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ রাহিমাহুল্লাহ খুব চমৎকার একটা ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলের সাথে তার শেষ হজে আমি সফরসঙ্গী ছিলাম। আমরা যখন মদিনার শেষ উপকণ্ঠে এসে পৌঁছাই, তখন আমাদের সামনে এক জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ এসে উপস্থিত হলেন। বয়সের ভারে তার চোখের ভ্রু-যুগল পর্যন্ত সাদা হয়ে গেছে।

বয়স্ক লোকটার সাথে তরুণ ও আধ-বয়স্ক মিলিয়ে আরো অনেকগুলো মানুষ ছিলো এবং তাদের একজন আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘আপনাদের মধ্যে আহমাদ ইবনু হাম্বল কে??



তখন আমাদের দলে থাকা অন্য লোকেরা হাত উঁচিয়ে আহমাদ ইবনু হাম্বলকে দেখিয়ে দিলো। এরপর, জরাগ্রস্ত ওই বৃদ্ধ লোক, অন্য একজনের সহায়তায় কোনোমতে আহমাদ ইবনু হাম্বলের সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘তোমার নাম আহমাদ ইবনু হাম্বল?'

আহমাদ ইবনু হাম্বল বললেন, ‘আমার আম্মা এমনটাই আমার নামকরণ করেছেন।' ‘বাছা, তুমি কি আমায় চিনতে পেরেছো?'

‘আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে চিনতে পারিনি।'

বৃদ্ধ লোকটা বললেন, ‘আমি ওবাইদুল্লাহ ইবনু মুসা ইবনি জাফর ইবনি মুহাম্মাদ ইবনি আলি ইবনিল হুসাইন ইবনি আলি ইবনি আবি তালিবের বংশের মানুষ। আমি গতকাল স্বপ্নে দেখেছি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু ও উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বাগদাদ অতিক্রম করছেন। এমন সময় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ডান কাঁধ থেকে তার চাদরখানা মার্টিতে পড়ে যায়। তারপর আমি দেখলাম, হঠাৎ কোত্থেকে যেন এসে তুমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাদরখানা মাটি থেকে কুড়িয়ে পুনরায় তার ডান কাঁদে চড়িয়ে দিলে। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমার দিকে তাকালেন। সাথে আবু বকর ও উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমাও। তারা হাসিমুখে তোমাকে বললেন, ‘আহমাদ! সুসংবাদ গ্রহণ করো! জান্নাতে তুমি আমাদের সাথি হচ্ছো।

এরপর, ওই বৃদ্ধলোক সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “তোমরা কি জানো, ‘আহমাদ ইবনু হাম্বল নবিজির চাদর কুড়িয়ে নিয়ে নবিজির কাঁধে তুলে দিয়েছেন বলতে স্বপ্নে কী বোঝানো হয়েছে? উপস্থিত জনতার মধ্য থেকে একজন শাইখ বললেন, এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে—নবিজির সুন্নাহকে, যা থেকে এখন মানুষ বিমুখ হয়ে আছে, দূরে সরে আছে, আহমাদ ইবনু হাম্বল তা পুনরায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে।'

ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ বলেন, বৃদ্ধের এই কথা শুনে বিমর্ষ হয়ে যান আহমাদ ইবনু হাম্বল। তিনি বলেন, ‘আহা! এই কথা শোনার আগে যদি আমার এবং এই লোকের মাঝে একটা পাহাড় এসে দাঁড়াতো, কতই না উত্তম হতো।'(মিহনাতুল ইমাম আহমাদ, আব্দুল গনি আল-মাকদিসি, পৃষ্ঠা: ৩৩-৩৪; আল-জামি লি উলুমিল ইমাম আহমাদ, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৪২৪)

আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, জান্নাতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথি হতে পারার যে সৌভাগ্য ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহকে বৃদ্ধ লোকটা শোনালেন, তা কি ইমাম আহমাদ পছন্দ করেননি? এজন্যই কি তিনি বলেছেন, 'এই কথা শোনার আগে আমার এবং এই লোকের মাঝে যদি একটা পাহাড় এসে দাঁড়াতো, কতই না উত্তম হতো'?

না, আসলে ব্যাপারটা তা নয়। জান্নাতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের

সাথি হওয়ার স্বপ্ন তো প্রত্যেক মুমিনের। ইমাম আহমাদ সেটা অপছন্দ করবেন, তা কী করে হতে পারে? বরং তিনি ভয় পেয়েছেন একটা জিনিসকে আত্মম্ভরিতা। আত্মমুগ্ধতার ভয়। তিনি শঙ্কিত হয়েছেন—যদি এই বৃদ্ধ লোকের কথা শুনে তার মনে অহমিকা প্রবেশ করে? নবিজির হাদিসকে পুনরুজ্জীবিত করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে পুরস্কারের কথা এই বৃদ্ধলোক তাকে জানিয়ে গেলেন, তা থেকে যদি তার অন্তরে আত্মম্ভরিতার জন্ম নেয়? যদি কোনোভাবে তাতে রিয়া তথা লোকদেখানো অনুভূতি প্রবেশ করে, তাহলে তো সর্বনাশ! এ-কূল ও কূল সবকূলই যে তখন হারাবেন তিনি!

ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ ঠিক এই কারণেই সেদিন ভীত হয়ে ছিলেন। নিজের ভেতরে যাতে কোনো অহংকার, আত্মমুগ্ধতা না আসে, সেজন্যই তিনি দুজনের মাঝে একটা পাহাড়ের বাধা আশা করে ছিলেন।

ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহর এই ঘটনা থেকে আমাদের অনেক কিছুই শেখার আছে। নিজের ব্যাপারে আমরা যখন অনেক বেশি আত্মতুষ্টিতে ভুগবো, তখন আখিরাতে ভালো ফলাফল লাভের আশা আমাদের জন্য ক্ষীণ হয়ে আসবে। আমি তো অনেক বেশি ইবাদত করি, আমল করি, সাদাকা করি, দ্বীন প্রচার করি’ –এই অতি-ভাবনাগুলো আমাদের যাবতীয় আমলকে বিনষ্ট এবং আমাদের আখিরাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবার জন্য খুবই যথেষ্ট।

 দুই.

আবদুল্লাহ নামের একজন বর্ণনা করেছেন, ‘তারাসুসেছি।( বর্তমানে এটি তুরস্কের একটি শহর)

আমি আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক এবং মুতামির ইবনু সুলাইমানের সাথে অবস্থান করছিলাম। এমন সময়, হঠাৎ চারদিকে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো এবং চারদিক থেকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য আহ্বান এলো। রোমান ও মুসলিমরা মুহূর্তের মধ্যেই মুখোমুখি সমরে লিপ্ত হলো।

রোমানদের একজন দলনেতা বললো, ‘আমরা মুখোমুখি, জনে জনে যুদ্ধ করবো। একজনের বিরুদ্ধে কেবলমাত্র একজন।'

সে মুসলিমদের আহ্বান করলো যেন একজন একজন করে তার সাথে ময়দানে নেমে যুদ্ধ করে। তার কথানুযায়ী মুসলিম শিবির থেকে এক যোদ্ধা তার বিরুদ্ধে ময়দানে নামল এবং ওই যোদ্ধা রোমান দলনেতার হাতে শহিদ হলো। এরপর আরেকজন গেলো এবং সেও শহিদ হলো। এভাবে ওই দলনেতার হাতে মুসলিম। শিবিরের মোট ছয়জন যোদ্ধা শহিদ হলেন।

মুসলিম শিবিরে ততক্ষণে একটা চাপা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং ওই রোমান দলনেতা খুব গর্বভরে, অহংকারের সাথে বিজয়োল্লাস করে চেঁচিয়ে বললো, আর কার বুকে সাহস আছে আসো দেখি?'

এরপর, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক আমার দিকে তাকালেন আর বললেন, 'আমি যাচ্ছি তার সাথে লড়তে। আমি যদি মারা যাই, তাহলে তুমি অমুক অমুক কাজ করতে ভুলে যেয়ো না কিন্তু।

আমাকে এতটুকু বলে নিজের ঘোড়া ছুটিয়ে যুদ্ধের ময়দানে রোমান সেনাপতির সাথে সম্মুখ সমরে নেমে পড়লেন তিনি। তখন একটা কাপড় দিয়ে চেহারা ঢেকে নিয়েছিলেন, যাতে কেউ তাকে চিনতে না পারে। দীর্ঘক্ষণ টানা যুদ্ধের পর আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের হাতে ওই দাম্ভিক রোমান সেনাপতির মৃত্যু হয়। তারপরে আরো ছয়জন রোমানযোদ্ধাকে হত্যা করেন তিনি। সম্মুখ সমরে বিজয়াসনে দাঁড়িয়ে তিনি বলতে লাগলেন, “আর কে কে লড়তে চাও, এসো?

কিন্তু আর কোনো রোমান সেনা আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের সামনে আসতে সাহস করলো না। তারা এতটাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো যে, ওখানেই রণভঙ্গ দিয়ে পালালো।

আবদুল্লাহ নামের ওই লোক আরো বলেন, ‘যুদ্ধশেষে আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক পুনরায় আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন এবং আমার কানের কাছে মুখ এনে চুপিসারে বললেন, ‘আবদুল্লাহ, এতক্ষণ ধরে তুমি যা দেখলে, আল্লাহর ওয়াস্তে আমি বেঁচে থাকা অবধি এই ঘটনা তুমি কাউকেই বোলো না।' (সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৪০৮-৪০৯)

সেদিনও আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ আত্মম্ভরিতার ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি জানতেন—আত্মমুগ্ধতার বিষবাষ্প যদি তাকে একবার পেয়ে বসে, তবে তার পদস্খলন অবশ্যম্ভাবী। বিশাল প্রতাপশালী রোমান বীর এবং যুদ্ধবাজ রোমান সৈন্যদের হত্যার সংবাদ যদি দিকে দিকে, মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, সেটা নিয়ে যে তার অন্তরে অহংকার দানা বাঁধবে না, অহমিকা যে হেঁকে বসবে না তার মনে—তার কী নিশ্চয়তা? তিনি ভয় পাচ্ছিলেন—যদি শয়তান তার কৃতিত্বকে তার সামনে বড় করে তুলে ধরে? যদি অবচেতন মনের কোথাও এই আত্মপ্রশংসা ধ্বনিত হয়—'এই মহাবীরকে পরাস্ত করার সকল কৃতিত্ব আমার ‘আমার শক্তিবলেই এই অসাধ্য সাধিত হয়েছে'—তবে ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের পতন ঠেকাবে কে?

আমাদের পূর্বসূরিরা নিজেদের জীবনটাকে এভাবেই সাজিয়েছেন। তারা ছিলেন বীর, কিন্তু বীরত্বের সবটুকু কৃতিত্ব তারা সোপর্দ করতেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দিকে। তারা ছিলেন জ্ঞানের ভান্ডার, তথাপি সেই জ্ঞানের ভারত্ব তাদেরকে বেপরোয়া করে তুলতো না। যুগান্তকারী সকল কর্ম সম্পাদন করতেন, কিন্তু প্রশংসার ভাগিদার তারা হতে চাইতেন না। সমস্ত প্রশংসাকে তারা কেবল মহান মালিকের জন্য তুলে রাখতেন। কৃতিত্বের ভাগ-বাঁটোয়ারা থেকে পালাতেন তারা। বেশ ভালোমতোই তারা জানতেন—যেখানেই কৃতিত্বের আকাঙ্ক্ষা, সেখানেই দাম্ভিকতার সূত্রপাত। যেখানেই প্রশংসা কুড়ানোর লোভ, সেখানেই লোকদেখানো কাজের জন্ম।

তিন.

কুরআনের দিকে যদি আমরা তাকাই, তাহলে দেখবো এই আত্মম্ভরিতা, আত্মমুগ্ধতার কারণেই কিন্তু ইবলিস অভিশপ্ত হয়েছিলো। আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টির পরে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সবাইকে আদেশ করলেন আদম আলাইহিস সালামকে সিজদা করার জন্য। সকল ফেরেশতা বিনা বাক্যব্যয়ে আল্লাহর আদেশ পালন করলো। তারা সিজদা করলো আদম আলাইহিস সালামকে; কিন্তু ইবলিস, যে কিনা একজন উঁচু পর্যায়ের জিন ছিলো, সে রীতিমতো বেঁকে বসলো। আত্মমুগ্ধতায় বিভোর হয়ে সে আল্লাহর আদেশ অমান্য করে বসলো। নিজে আগুনের তৈরি হওয়ায় মাটির তৈরি আদম আলাইহিস সালামকে সে তুচ্ছজ্ঞান করলো। সে বললো, ‘আদম মাটির তৈরি, আমি আগুনের। আগুন মাটির চাইতে সেরা। আদমের চেয়ে তাই আমিই শ্রেষ্ঠ। আগুনের তৈরি হয়ে মাটির তৈরি কাউকে আমি সিজদা করতে পারবো না।'

পরের গল্পটা তো আমাদের সবার জানা। ইবলিস অভিশপ্ত হলো চিরতরে। সে হয়ে গেলো মানবজাতির সবচেয়ে বড় শত্রু। আত্মম্ভরিতা ও আত্মমুগ্ধতা একজনের জন্য কীভাবে যে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে, তা ইবলিসের ঘটনা থেকেই জানতে পাই আমরা।

আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের একটা বড় গুণ হলো—তারা কখনোই আত্মম্ভরিতায় ভোগেন না। আত্মপ্রশংসায় গদগদ হোন না। আত্মবিমুগ্ধতায় ডুবে থাকেন না। কোনোকিছু অর্জন করলে কিংবা কোনো কিছু যদি আমরা ভালো করতে পারি, অথবা ভালো করার যোগ্যতা রাখি, তখনই আমাদের মাঝে অহংকার প্রবেশ করে। আমরা ভাবি—এ বুঝি কেবল আমারই শ্রম আর মেধার ফসল। এ বুঝি কেবল আমারই যোগ্যতা, কিন্তু আল্লাহর কাছে যারা প্রিয় হয়েছেন, যারা নিজেদের নাম লিখে নিতে পেরেছেন আসমানের সোনালি পর্দায়, তারা ভাবতেন ঠিক এর উল্টো।

যাকারিয়া আলাইহিস সালাম মারইয়াম আলাইহাস সালামের ঘরে এসে নানাবিধ ফলমূল দেখে বিস্মিত হয়ে পড়েন। এমনসব ফলমূল যা ওই অবস্থায়, ওই সময়ে বসে পাওয়া মারইয়াম আলাইহাস সালামের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। চমকিত হয়ে যান যাকারিয়া আলাইহিস সালাম! কৌতূহল নিবৃত করতে না পেরে তিনি মারইয়াম আলাইহাস সালামের কাছে সরাসরিই জানতে চান এতসব ফলমূল তিনি কোথা থেকে পেয়েছেন। যাকারিয়া আলাইহিস সালামের কৌতূহলের জবাবে মারইয়াম আলাইহাস সালাম সেদিন যা বলেছিলেন, তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন। মারইয়াম আলাইহাস সালাম বলেছেন, ‘এগুলো আল্লাহর কাছ থেকেই আসে। নিশ্চয় আল্লাহ যাকে চান তাকে অবারিত রিযিক দান করেন।'(সুরা আলি-ইমরান, আয়াত : ৩৭)

মারইয়াম আলাইহাস সালাম বলতে পারতেন, ‘আমি বেশি বেশি ইবাদত করি, তাই তার বিনিমিয়ে এসব লাভ করেছি।' অথবা তিনি এ-ও বলতে পারতেন যে ‘এগুলো আমি আমার যোগ্যতা বলে লাভ করেছি।' আপনি কিংবা আমি হলে হয়তো-বা এভাবেই বলতাম, কিন্তু মারইয়াম আলাইহাস সালাম এভাবে বলেননি।

তিনি এই অর্জনকে, এই প্রাপ্তিকে সরাসরি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দিকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। যাকারিয়া আলাইহিস সালামের কাছে নিজের বড়োতৃ আর গুরুত জাহির না করে তিনি প্রশংসার ঝুড়িটা তাঁর দিকেই সোপর্দ করে দিয়েছেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে সকল প্রশংসার হকদার।

আমাদের সকল অর্জন, সকল প্রাপ্তি মূলত আল্লাহর কাছ থেকেই আসে। তাঁর দয়া ব্যতীত কোনোকিছু অর্জন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এই সূক্ষ্ম ব্যাপারটা আমি আর আপনি না বুঝতে পারলেও, আল্লাহর সত্যিকার প্রিয় বান্দারা বুঝতে পারতেন। তাই, জীবনের সকল অর্জনকে, সকল প্রাপ্তিকে তারা আল্লাহর দিকে ঠেলে দিতেন। আত্মম্ভরিতা, আত্মমুগ্ধতার বশবর্তী হয়ে তারা কখনোই সেগুলোকে নিজেদের যোগ্যতা আর মেধার ফসল ভেবে বসতেন না।

আত্মমুগ্ধতায় বিভোর হয়ে পা ফসকেছে স্বয়ং ইবলিসেরও। নিজের গাঠনিক উপাদানের দিকে তাকিয়ে সে ভেবেছিলো মাটির তৈরি আদমের চেয়ে সে শ্রেষ্ঠ; কিন্তু শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি তো ইবলিস নির্ধারণ করবে না, এটা নির্ধারণ করবেন কেবল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। আদম শ্রেষ্ঠ হবে, না ইবলিস—তা নির্ধারণের ক্ষমতা কেবল এককভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার।

এই আত্মমুগ্ধতা থেকে বাঁচতেই সেদিন বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ। হাদিসশাস্ত্রের যে যুগান্তকারী কাজ তিনি করেছেন, সেকারণে যদি তার মনে কোনো অহংকার জেঁকে বসে, সেই ভয়েই তিনি বলেছিলেন, 'আহা! এই কথা শোনার আগে যদি আমার এবং এই লোকের মাঝে একটা পাহাড় এসে দাঁড়াতো, কতই না উত্তম হতো।”

আত্মগৌরব দ্বারা নিজের অন্তরকে কাবু হওয়ার হাত থেকে উদ্ধার করতেই সেদিন আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ রোমান যুদ্ধবাজকে দারুণভাবে পরাস্ত করার পরেও সঙ্গীকে বলেছিলেন, 'আবদুল্লাহ, এতক্ষণ ধরে তুমি যা দেখলে, আল্লাহর ওয়াস্তে আমি বেঁচে থাকা অবধি এই ঘটনা তুমি কাউকেই বোলো না।'

এই আত্মমুগ্ধতায় বিলীন হননি মারইয়াম আলাইহাস সালাম। আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে যে খাবার তার জন্য বরাদ্দ ছিলো, তা পেয়ে তিনি বলেছেন, 'এগুলো আমার রবের কাছ থেকেই আসে। আর, আমার রব যাকে ইচ্ছা অবারিত রিযিক দান করেন।”

আমরা যখন কোনোকিছু অর্জন করবো অথবা অর্জনের যোগ্যতা অর্জন করবো, আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, এই অর্জন, অর্জনের এই যোগ্যতা আমাদের প্রতি মহান রব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ। তিনি দয়া করেছেন বলেই এগুলো আমার জীবনে এসেছে। কখনোই এটা ভাববো না যে—এটা আমি এককভাবে নিজ যোগ্যতায় পেয়েছি। এমন ধারণা করাটা আত্মম্ভরিতারই নামান্তর; বরং আমাদের মারইয়াম আলাইহাস সালামের মতোই ভাবতে হবে। আমাদের যা কিছু অর্জন, যা কিছু প্রাপ্তি সব মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।

কোনো অর্জন বা অর্জনের কোনো যোগ্যতা যখন আমরা লাভ করবো, তখন আমরা আল্লাহর দিকে ফিরে যাবো সবার আগে। এই শিক্ষাটা আমরা কুরআন থেকেই পাই। সুরা নাসরে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বিজয়ের পূর্বাভাস দেওয়ার সাথে সাথে কয়েকটা করণীয়ও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেছেন—

যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে, আর (হে নবি) আপনি লোকদেরকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে ফিরতে দেখবেন, তখন আপনি আপনার রবের পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি তাওবা কবুল করেন। (সুরা নাসর, আয়াত: ১-৩)

বিজয় অর্জিত হলে এবং লোকেরা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলছেন, যেন তিনি আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং দ্বীন কায়েমের এই কাজে যদি কোনো ভুলভ্রাপ্তি হয়ে থাকে, তার জন্য যেন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। আল্লাহর নবি, যিনি একজন পূত-পবিত্র মানবাত্মা, যাকে দিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা জমিনে বুনেছেন তাওহিদের বীজ, যার মাধ্যমে সুশোভিত করে তুলেছেন তাঁর দ্বীনের সৌন্দর্য, তার জন্যই যদি আল্লাহর আদেশ ও হুকুম এমন হয়ে থাকে, আমাদের বেলায় তাহলে সেটা কেমন হতে পারে?

বিজয় অর্জিত হয়ে গেলে আল্লাহ বলেননি উল্লাসে ফেটে পড়তে। তিনি বলেননি তা নিয়ে গর্ব করে বেড়াতে কিংবা বেপরোয়া হয়ে উঠতে; বরং তিনি বলেছেন, বিজয়ের দেখা পেলে আমরা যেন তাঁর দিকেই ফিরে আসি, সমস্ত প্রশংসার মালিক। যে একমাত্র তিনিই—তা অকপটে স্বীকার করি এবং বিজয় অর্জনে আমাদের পক্ষ থেকে যাবতীয় ভুল-ভ্রান্তির জন্য আমরা যেন তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিই।

চার.

দ্বীনের পথে হাঁটতে শুরু করার পর আমরা সাধারণ যে ভুলটা সবচেয়ে বেশি করি, তা হলো—আত্মম্ভরিতা। জেনে কিংবা না-জেনে, বুঝে অথবা না-বুঝে জীবনে চলার পথে আমরা কোনো না কোনোভাবে এই ফাঁদে আটকে যাই। জীবন থেকে জাহিলিয়াতের ধুলো ঝেড়ে ফেলে দেওয়ার পরে আমরা যখন আমলের একটা বৃত্তে প্রবেশ করি, যখন আমরা সালাতে নিয়মিত হই, সিয়ামে তৎপর হই, দান-সাদাকা এবং ভালো কাজে অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে উঠি, এমনকি তাহাজ্জুদেও আমরা যখন নিয়মিত জাগতে শুরু করি, তখন আমাদের মনের কোনো এক সূক্ষ্ম কোণে এই ধারণা উঁকি দিতে শুরু করে যে—‘আমার চেয়ে বেশি আমল, বেশি সাদাকা, বেশি সিয়াম, বেশি তাহাজ্জুদ-গুজার বান্দা আশপাশে সম্ভবত আর কেউ নেই।”

হতে পারে দ্বীন নিয়ে আমার মতন তৎপর, উদগ্রীব আর সচেষ্ট মানুষ আমার আশেপাশে আর একটাও নেই, কিন্তু তবু কোনোভাবে এই ধারণা মনে আনাই যাবে না যে—আমি এত বেশি আমল-ইবাদত করছি, এত বেশি আল্লাহর স্মরণে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি, এমন কেউ নেই, যে আমাকে টেক্কা দেবে। এমন ভাবনা নিঃসন্দেহে শয়তানের ওয়াসওয়াসা। আমাদের আমল-ইবাদত, আমাদের তাকওয়ার উচ্চতা যতই আকাশ স্পর্শ করুক না কেন, নিজেকে বড় আর অন্যকে ছোট হিশেবে দেখতে গেলেই আমাদের নিশ্চিতভাবে পা ফসকে যাবে। এমন চিন্তা অবশ্যই অহংকার থেকে উৎসারিত। আমরা কেউ কি এই নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, আমাদের যাবতীয় ইবাদত আল্লাহ কবুল করে নিচ্ছেন? এটাও কীভাবে ভাবতে পারি যে—অন্যদের সামান্য আমলগুলো আল্লাহর কাছে খারিজ হয়ে যাচ্ছে?

আবু ওয়াহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের কাছে অহংকার সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, 'যখন তুমি লোকদের ব্যাপারে বিদ্রূপ করো, তা-ই হলো অহংকার।' আমি বললাম, 'আত্মম্ভরিতা কি?' তিনি বললেন, “যখন তুমি ভাবো যে, তুমি এমন কিছু করো, যা আর কেউ করে না।(সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড: ১৫; পৃষ্ঠা: ৩৯৫)

আত্মম্ভরিতা বিপদ ডেকে আনে। ভালো আমলগুলোকে রিয়ায় পরিণত করে। যখনই মানুষ নিজের আমল-ইবাদতের ব্যাপারে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওে তখনই তার পা ফসকে যায়। সাফা পর্বতে দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু দুআ করতেন আর বলতেন, “ইয়া আল্লাহ, আপনি বলেছেন, 'আমাকে ডাকো—আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো’, আর আপনি তো কখনোই আপনার ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। তাই আজ আমি করজোড়ে আপনাকে ডাকছি, আমার কাছ থেকে আমার দ্বীনকে ছিনিয়ে নেবেন না এবং মুসলিম হয়েই যেন আমি মৃত্যুবরণ করতে পারি। (মুআত্তা মালিক : ১২৮; আল-ইস্তিযকার, ইবনু আব্দিল বার, খণ্ড : ৪; পৃষ্ঠা : ২২৪; জামিউল উসুল, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ২১৮)

নবিজির একজন সাহাবি যদি এভাবে দুআ করতে পারেন, যদি তিনি দ্বীন থেকে বিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা করতে পারেন, মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করার ভয়ে তিনি যদি ভীত হতে পারেন, আমরা কেমন ঈমানদার আর তাকওয়াবান যে, নিজেদের আমল-ইবাদত নিয়ে হরহামেশা আত্মম্ভরিতায় ভুগবো? নিজেদের আমলকে, নিজেদের ইবাদত, যাবতীয় রাত্রি জাগরণ, যাবতীয় ভালো কাজকে আবদুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো সাহাবিরা ‘যথার্থ’ ও ‘যথেষ্ট' ভাবতে পারেননি। নবিজিকে সামনে থেকে দেখেও তারা নিজেদের নিয়ে সন্তুষ্ট ও নিশ্চিন্ত হতে পারেননি। আর একটু আমল করতে শুরু করলেই নিজেকে ছাড়া আশপাশের সবাইকে আমরা কিনা গাফিল, উদাসীন আর বিস্মৃত ভাবতে শুরু করি!

হিদায়াত আল্লাহর দেওয়া বড় একটা নিয়ামত। আত্মম্ভরিতা সেই নিয়ামতের রাস্তাকে করে তোলে রুক্ষ ও খড়খড়ে। আমল-ইবাদতের ব্যাপারে অধিক পরিমাণ আত্মবিশ্বাস, অধিক আত্মম্ভরিতা আমাদের এটা ভুলিয়ে দেয়—যেকোনো মুহূর্তেই আমরা পা ফসকে পড়ে যেতে পারি, যেকোনো মুহূর্তেই দ্বীন থেকে আমরা ছিটকে যেতে পারি। একজন হিদায়াতপ্রাপ্ত লোক যে আজীবন হিদায়াতের রাস্তায় অবিচল থাকবে, তার যে পথ হারাবার কোনো আশঙ্কা থাকবে না—এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। আবার হিদায়াত পায়নি এমন লোকও যে আজীবন হিদায়াতের বাইরে থেকে যাবে, এমন ধারণারও কোনো অবকাশ নেই। তাই হিদায়াতপ্রাপ্ত লোক যেমন আত্মগৌরব, আত্মম্ভরিতায় ভুগবে না, তেমনি দৃশ্যত হিদায়াতের রাস্তায় নেই এমন লোককেও কটাক্ষ করা, ছোট করে দেখা সমীচীন নয়।

উম্মু সালামা রাযিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন স্ত্রী। তার কাছে যখন জানতে চাওয়া হলো, কোন সে দুআ, যা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবচেয়ে বেশি করতেন?

তিনি বললেন, ‘নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবচেয়ে বেশি পড়তেন এই দুআটা (ইয়া মুক্বাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত ক্বালবি ‘আলা দ্বীনিক)' অর্থাৎ—‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আপনি আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন। (জমি তিরমিযি : ২১৪০; সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩৮৩৪ – হাদিসটির সনদ সহিহ)

অন্তরকে দ্বীনের ওপর দৃঢ় রাখা মানে হলো—অন্তর যেন দ্বীন থেকে কখনোই সরে না যায়। যেন সর্বদা হিদায়াতের রাস্তায় আমরা থাকতে পারি। মানুষের অন্তরের অবস্থা যেকোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। যেকোনো সময় অন্তর ঝুঁকতে পারে এমনসব দিকে, যা আমাদেরকে দ্বীনের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়। এজন্যই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবচেয়ে বেশি পরিমাণে যে দুআটা করতেন, তা এই অন্তরকে দ্বীনে স্থির রাখা বিষয়ক। আমাদের অন্তরের অবস্থা নবিজি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি এমন একটা দুআ আমাদের শিখিয়ে গেছেন। যেখানে অন্তরের স্থিরাবস্থার কোনো নিশ্চয়তা নেই, সেখানে আমল নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়ার, বেপরোয়া আর অহংকারী হয়ে ওঠার তো প্রশ্নই আসে না।

শাইখ সালিহ আল-উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ‘সর্বপ্রথম আমি নিজেকে উপদেশ দিই এবং অন্যদেরও বলি যে, দ্বীনের পথে অটল-অবিচল থাকার জন্য সর্বদা আল্লাহর কাছে মিনতি করুন। কারণ আমাদের প্রত্যেকের পায়ের তলায় লুকিয়ে আছে ফাঁদ। আল্লাহ যদি আমাদের দ্বীনের ওপর অবিচল না রাখেন, নিশ্চিতভাবে আমরা সেই ফাঁদে আটকে যাবো এবং ধ্বংস হবো। (শারহুল আকিদাতিল মুমিত, ইবনু উসাইমিন, খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা : ৩৮৮)

পাঁচ.

আমাদের আমলগুলো যেন আমাদের বেপরোয়া না করে তুলে। অহংকারে মোয় আমলের কোনো মূল্য আল্লাহর কাছে নেই। অহংকার-বিহীন কম আমল অহংকার। ভরা অধিক আমলের চাইতে ঢের উত্তম। অহংকার আর বিনয় একসাথে থাকতে পারে না, যেভাবে মিশে থাকতে পারে না তেল আর জল।

অহংকার অন্তরে প্রবেশ করলে আমাদের ভেতর থেকে সর্বপ্রথম যে জিনিসটা বিলুপ্ত হয়ে যায় তা হলো বিনয়। ইবলিসের অন্তরে অহংকার ঢুকেছিলো। সে নিজের ব্যাপারে এতই বেশি আত্মবিমুগ্ধ ছিলো যে আল্লাহর আদেশ পর্যন্ত সে অমান্য করলো। আত্মম্ভরিতা ইবলিসকে অভিশপ্তের পথে নিয়ে গেলো।

আবার, যখন অন্তরে বিনয় প্রবেশ করে, আমাদের ভেতর থেকে সবার আগে যে জিনিসটা ধূলিসাৎ হয়ে যায় তা হলো অহংকার। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ আদম আলাইহিস সালাম। ইবলিসের ধোঁকায় পড়ে, আদম আলাইহিস সালাম এবং হাওয় আলাইহাস সালাম জান্নাতের নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে ফেললে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাদের পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন। আদম আলাইহিস সালাম ভুল করেছেন ঠিক, কিন্তু সেই ভুলের ওপর স্থির থাকেননি। সেই ভুলের ওপর গো ধরে বসে থাকেননি। সেই ভুলটাকে তিনি সঠিক প্রতীয়মান করতে উদ্যোগী হোননি৷ বরং, ভুলটাকে ভুল হিশেবে জেনে এবং মেনে নিয়ে তিনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে করজোড়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। নিজেদের কৃত ওয়াদা-চ্যুত হয়ে তারা যে ভুল করেছিলেন তা স্বীকার করে, আল্লাহর করুণা ভিক্ষা করে মাক চাইলেন তারা, এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাদের মাফও করে দেন। অন্তরে বিনয় ছিলো বলেই তারা আল্লাহর কাছে নত হতে পেরেছিলেন। আর বিনয়ের অভাবেই ইবলিস আল্লাহর কাছে নতি স্বীকার করতে পারেনি।

অহংকার, আত্মমুগ্ধতা, আত্মম্ভরিতা একটা খাদের নাম। এই খাদে একবার পড়ে। গেলে ফিরে আসাটা দুঃসাধ্য হয়ে যায়। তাই, আমাদের উচিত কখনোই আত্মবিমুখ না হওয়া, আত্মম্ভরিতায় না ভাসা। নিজের যোগ্যতাকে এমনভাবে প্রকাশ না করা, এমনকিছু না ভাবা যেখানে অহংকারের ছাপ ফুটে ওঠে। নিজের যোগ্যতার জন্য আমরা যেন আল্লাহর কাছে আরো বেশি কৃতজ্ঞ, আরো বেশি অনুগত আর বিনয়ী। হতে পারি। যদি কখনো মনে হয় আমরা কিছু অর্জন করেছি বা করতে যাচ্ছি, তখনই আমরা যেন আল্লাহর দিকে ফিরে আসি। অধিক হারে আল্লাহর তাসবিহ তথা তাঁর প্রশংসা করি এবং নিজেদের যাবতীয় ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করি। মনে রাখতে হবে— অহংকারী ব্যক্তি কেবল অহংকার করে না, নিজের পতনের আয়োজনটাও করতে থাকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

✍️ আমাদের ব্লগ
পতনের আওয়াজ পাওয়া যায়

 এক. ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ রাহিমাহুল্লাহ খুব চমৎকার একটা ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলের সাথে তার শেষ হজে আমি সফরস...