সীরাতে যাকারিয়া আ. (পর্ব ০৩) দীন প্রচারে আল্লাহর নিকট সন্তান কামনা

যাকারিয়া আ. এর জীবনের সংক্ষিপ্ত ঘটনা।

দীন প্রচারে আল্লাহর নিকট সন্তান কামনা


হযরত যাকারিয়া ‘আলাইহিস সালাম স্বগোত্রীয়দের ব্যাপারে শঙ্কা  ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি ভয় পেয়েছিলেন, তার মৃত্যুর পর তারা পাপ-পংকিলতায় জড়িয়ে পড়বে। ফলে আল্লাহর কাছে সন্তান লাভের জন্য প্রার্থনা করলেন, যেন তার ওফাতের পর সেই সন্তান নবী হয়ে নবুওয়্যাতের মাধ্যমে তাদের পরিচালিত করতে পারেন। আল্লাহ তা‘আলা তার মনের বাসনা পূরণ করলেন।



যাকারিয়া ‘আলাইহিস সালাম এজন্য শঙ্কা করেননি যে, তার মৃত্যুর পর তারা তার ত্যাজ্য সম্পদের মালিক হয়ে যাবে। কারণ, প্রথমতঃ নবীগণের সম্পদে কোন ওয়ারিস নাই। তারা যা রেখে যান, তা সদকারূপে গণ্য হয়। এ প্রসঙ্গে বুখারী ও মুসলিম শরীফে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমরা নবীগণ যা-কিছু রেখে যাই, তার কোন উত্তরাধিকারী হয় না। বরং তা সদকার মধ্যে গণ্য হয়।  (বুখারী, ফরযুল খুমুস অধ্যায়)

দ্বিতীয়তঃ নবীগণ এ ধরনের পার্থিব ব্যাপার হতে অনেক ঊর্ধ্বে যে, তারা সম্পদের ভালোবাসায় এতটা মোহগ্রস্ত থাকবেন যে, নিজের মৃত্যুর পর স্বগোত্রীয় লোকদের দ্বারা তাঁর সম্পদের উত্তরাধিকারী হওয়াকে পরশ্রীকাতরতার চোখে দেখবেন এবং সন্তান লাভের জন্য প্রার্থনা করবেন, যাতে সে তার রেখে যাওয়া সম্পদের মালিক হয়। তা ছাড়া স্বাভাবিকভাবেও তাঁর এ পরিমাণ সম্পদ ছিলনা, যে সম্পদের উত্তরাধিকারী হওয়ার জন্য তাঁর গোত্রের লোকেরা লালসা করবেন। কারণ, তিনি নিজ হাতে কাঠের কাজ করে জীবিকানির্বাহ করতেন। এ কাজ করে কতটুকুই বা সম্পদ জমা করা যায়!


সুতরাং আয়াতে বর্ণিত উত্তরাধিকারী হওয়ার অর্থ হবে, তার মৃত্যুর পর নবুওয়্যাতের ক্ষেত্রে তাঁর উত্তরাধিকারী হওয়া। পরবর্তী বাক্য “এবং ইয়াকুব বংশধরের উত্তরাধিকারী হবে” এ কথাটিও উপর্যুক্ত অর্থেরই সমর্থন করে। নবীদের উত্তরাধিকারী হওয়ার বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন, 


وَوَرِثَ سُلَيْمَانُ دَاوُوْدَ


অর্থঃ সুলাইমান ‘আলাইহিস সালাম দাউদ ‘আলাইহিস সালামের উত্তরাধিকারী হলেন। 


অর্থাৎ নবুওয়্যাতের ক্ষেত্রে তার স্থলাভিষিক্ত হলেন। অন্যথায় যদি এখানে সম্পদের উত্তরাধিকারের কথা বলা হত, তবে তাঁর ভাইদের বাদ দিয়ে বিশেষভাবে শুধু তাঁর কথা উল্লেখ করা হত না। কারণ, সব ধর্ম ও শরী‘আতের স্বতঃসিদ্ধ বিষয় হল, স্বাভাবিকভাবেই সন্তান তার বাবার সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়। আলোচ্য আয়াতে যেহেতু নবুওয়্যাত প্রাপ্তির বিশেষ উত্তরাধিকারের কথা বুঝানো হয়েছে, সেজন্যই এ ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। মুজাহিদ রহ. উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, তাঁর উত্তরাধিকার ছিল ইলমকেন্দ্রিক। তেমনি কাতাদা রহ. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা‘আলা যাকারিয়া ‘আলাইহিস সালামের উপর দয়া করুন, তাঁর মাল-সম্পদের কোন উত্তরাধিকারী ছিল না। (তাফসীরে আব্দুর রাযযাক; ২: ৫/১৭৩৪)


বন্ধ্যা স্ত্রীর গর্ভে সন্তানধারণ


হযরত যাকারিয়া ‘আলাইহিস সালাম স্বীয় স্ত্রীর বন্ধ্যা হওয়ার কথা উল্লেখ করে সন্তান লাভের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার খাস কুদরতী করুণা কামনা করেছেন। এতে প্রমাণিত হয়, যাকারিয়া ‘আলাইহিস সালামের স্ত্রী শুরু বয়সে বন্ধ্যা ছিলেন। এ কারণে তাঁর কোন সন্তানাদি হত না। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা যাকারিয়া ‘আলাইহিস সালামের দু‘আ কবুল করে তাঁর স্ত্রীকে সন্তান ধারণের যোগ্যতা দান করলেন।


এ বিষয়ে সূরা আম্বিয়ায় আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “স্মরণ করুন যাকারিয়া ‘আলাইহিস সালামের কথা, যখন তিনি তার প্রতিপালকের নিকট দু‘আ করে বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক, আমাকে একা রাখবেন না। আপনি তো উত্তম ওয়ারিশ দানকারী। আমি তাঁর দু‘আ কবুল করলাম এবং তাঁকে দান করলাম ইয়াহইয়াকে। আর তাঁর জন্য তাঁর স্ত্রীকে যোগ্যতাসম্পন্ন করেছিলাম। তারা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করতেন। তারা আমাকে ডাকতেন আশা ও ভয়ের সাথে এবং তারা ছিলেন আমার প্রতি বিনীত। (সূরা আম্বিয়া আয়াত: ৮৯-৯০)


আবদুল্লাহ বিন হাকিম রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুবকর রা. একবার আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন। হামদ ও সালাত পাঠ করার পর তিনি বললেন, আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে আপনাদের উপদেশ দিচ্ছি। আপনারা আল্লাহ তা‘আলার যথাযথ প্রশংসা করুন ভয়ের সাথে আগ্রহকে সংযোগ করে এবং যাঞ্চার সাথে আগ্রহ-মিনতিকে একত্র করে। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা যাকারিয়া ‘আলাইহিস সালাম ও তার পরিবার-পরিজনের প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন, তারা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করতেন, তারা আমাকে ডাকতেন আশা ও ভয়ের সাথে এবং তারা ছিলেন আমার নিকট বিনীত।  (তাফসীরে ইবনে কাসীর; ৫/৩৮১)


আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বলেন, আল্লাহ তা‘আলা যাকারিয়া ‘আলাইহিস সালামের স্ত্রীকে যোগ্যতাসম্পন্ন করেছিলেন- এর ব্যাখ্যা হল, আগে তার ঋতুস্রাব হতো না। যাকারিয়া ‘আলাইহিস সালামের প্রার্থনার পর তার ঋতুস্রাব শুরু হয়। যার ফলে তিনি সন্তান জন্মদানের যোগ্যতা লাভ করেন। (আল বিদায়া; ২/৫২)

Getting Info...

About the Author

ছোট বেলা থেকেই টেকনোলজির নিজের ভিতর অন্যরকম একটা টান অনুভব করি। যদিও কওমি মাদরাসার চার দেয়ালের ভিতরেই ছিল বসবাস। তারপরও অধম্য আগ্রহের কারনে যতটুকু শিখেছি ততটুকু ছড়িয়ে দিতে চাই সকলের মাঝে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.