ধনসম্পদের অপব্যবহার ও তার পরিণাম
এই আয়াতের শিক্ষা হলো, আল্লাহ তা‘আলা যাকে মাল-সম্পদ দিয়েছেন, তার উচিৎ মাল-সম্পদকে আল্লাহ তা‘আলার পরীক্ষা মনে করে এর সুষ্ঠু ব্যবহার ও শরী‘আত নির্দেশিতভাবে ব্যয় করতে সচেষ্ট থাকা। কখনও আল্লাহ তা‘আলার হুকুম পালনে অনীহা বা অনাগ্রহ দেখানো কিংবা দীনের পথে খরচ করতে বা যাকাত, ফিতরা, কুরবানী ইত্যাদি আদায়ে কিংবা হকদারদের হক পূরণ করতে কার্পণ্য করা কিছুতেই উচিত নয়।
যদি আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ তাঁর নির্দেশিত পন্থায় ব্যয় না করা হয় এবং আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞ না থাকা হয় তাহলে এর শাস্তি হিসেবে অন্তরে মুনাফেকী চিরস্থায়ী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
আয়াতের শানে নুযুল হিসেবে প্রসিদ্ধ একটি অনির্ভরযোগ্য ঘটনা
এই আয়াতের শানে নুযুল হিসেবে একটি ঘটনা প্রসিদ্ধ রয়েছে। ঘটনার সার সংক্ষেপ হলো, সা‘লাবা ইবনে হাতেব আনসারী, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে ধনসম্পদ প্রাপ্তির জন্যে দু‘আ কামনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিরুৎসাহিত করে ফিরিয়ে দেন।কিন্তু তিনি পরে আবার এসে একই নিবেদন করলেন এবং এই অঙ্গীকার করলেন, যদি আমি মালদার হই, তবে আমি প্রত্যেক হকদারকে তার হক বা প্রাপ্য পৌঁছে দিব। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপছন্দ সত্ত্বেও তার জন্য দু‘আ করলেন, আয় আল্লাহ, আপনি সা‘লাবাকে সম্পদশালী বানিয়ে দিন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু‘আর ফলে সা‘লাবার ছাগল-ভেড়া তড়িৎগতিতে বাড়তে আরম্ভ করলো। এমনকি একসময় মদীনায় বসবাসের জায়গাটি তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে উঠলো। তখন তিনি মদীনা শহরের বাইরে চলে যান। শুধু যুহর ও আসরের নামায মদীনায় এসে আদায় করতেন।
তার ছাগল-ভেড়ার আরো বেড়ে গেলে তিনি মদীনার শহরতলী থেকে আরো দূরবর্তী এক স্থানে চলে যান। সেখান থেকে শুধু জুম‘আর নামাযের জন্য তিনি মদীনায় আসতেন এবং অন্যান্য পাঞ্জেগানা নামায সেখানেই পড়ে নিতেন।
তারপর ক্রমশ এসব ছাগল-ভেড়া বহুগুণে বেড়ে গেলে সেই জায়গাও তাকে ছাড়তে হলো এবং তিনি মদীনা থেকে বহুদূরে চলে গেলেন। সেখানে যাওয়ার পরে মসজিদে নববীতে কোন ওয়াক্তের জন্যও আসতে পারলেন না। ফলে জুম‘আ ও জামা‘আত সবকিছু থেকেই তাকে বঞ্চিত হতে হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা‘লাবার এ অবস্থা শুনে সা‘লাবার প্রতি আফসোস প্রকাশ করেন।
কিছুদিন পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে যাকাত উসুলকারীগণ সা‘লাবার কাছে যাকাত নেয়ার জন্য হাজির হলে সে যাকাতকে জিযিয়া (অমুসলিমদের থেকে উসুলকৃত কর) সাব্যস্ত করে যাকাত প্রদান করতে অস্বীকার করে।
যাকাত উসুলকারীগণ মদীনায় ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে হাজির হলে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবারো সা‘লাবার প্রতি আফসোস প্রকাশ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আফসোসের কথা শুনে সা‘লাবা ঘাবড়ে গেলো এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে নিবেদন করলো, আল্লাহর রাসূল, আমার যাকাত কবুল করে নিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তা‘আলা আমাকে তোমার যাকাত গ্রহণ করতে বারণ করেছেন।
মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর সা‘লাবা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর নিকট উপস্থিত হয়ে যাকাত কবুল করার আবেদন জানালে আবুবকর সিদ্দিক রা. ও তার যাকাত কবুল করতে অস্বীকৃতি জানান। আবু বকর সিদ্দিক রা. এর ওফাতের পর হযরত উমর ফারুক রা. এবং হযরত উসমান রা. ও সা‘লাবার যাকাত গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। হযরত উসমান রা.-এর খিলাফতকালেই সা‘লাবার মৃত্যু হয়।” (তাফসীরে ইবনে কাসীর) দীর্ঘ এ ঘটনাটি মানুষের মধ্যে বেশ প্রসিদ্ধ। ধন-সম্পদের লোভের চরম শাস্তির কথা বুঝাতে গিয়ে অনেকেই এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন। বেশ কয়েকটি তাফসীরের কিতাবেও এর উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এ ঘটনাটি হাদীসের কোন নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায় না। ধন-সম্পদ আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় ব্যয় না করার পরিণতি আয়াতের তরজমা থেকেই সুস্পষ্ট। এটা বুঝানোর জন্য বা নিছক ঘটনা হিসাবে হযরত সা‘লাবা রা. সংক্রান্ত ঘটনাটি বর্ণনা করার কোন সুযোগ নেই।
এ পর্যায়ে আমরা দু’ভাবে ঘটনাটির বিশ্লেষণ করবো-
প্রথম আলোচনা: সা‘লাবা রা. সংক্রান্ত রিওয়ায়েতের সনদ যাচাই:হযরত সা‘লাবা রা. সংক্রান্ত ঘটনাটি তিনজন সাহাবীর বর্ণনায় পাওয়া যায়।
১. হযরত আবূ উমামা রা.
তাঁর রিওয়ায়েতটি আবার তিনটি সূত্রে পাওয়া যায়। (ক) মুহাম্মাদ ইবনে শু‘আইব, (খ) মিসকীন ইবনে বুকাইর। (গ) ওয়ালীদ ইবনে মুসলিম। উল্লিখিত তিনজনই হযরত মুআন ইবনে রিফা‘আর ওয়াসেতায় হযরত আলী ইবনে ইয়াযীদ হতে বর্ণনা করেন। এই আলী ইবনে ইয়াযীদের ব্যপারে ইমাম বুখারী রহ. বলেন, ‘মুনকারুল হাদীস’। (আত-তারীখুল কাবীর: ৬/৩০১)
অন্যত্র বলেন, আমি যার ব্যাপারে মুনকারুল হাদীস বলবো, তার থেকে রিওয়ায়েত করা জায়েয নেই। (মীযানুল ইতিদাল: ১/২; ৬/২০২)
ইমাম দারাকুতনী তার ব্যাপারে বলেছেন, ‘মাতরূক’। [আয-যু‘আফা ওয়াল মাতরুকীন: ১/৭৭; (মীযানুল ইতিদাল: ৩/১৬১)]
২. হযরত ইবনে আব্বাস রা. :
তাঁর থেকে শুধুমাত্র একটি সূত্রে রিওয়ায়েতটি পাওয়া যায়। সেখানে একজন রাবী আছেন হুসাইন ইবনে হাসান ইবনে আতিয়্যাহ, তাঁর ব্যাপারে ইবনে হিব্বান রহ. বলেন, তার রিওয়ায়েত দ্বারা দলীল পেশ করা জায়েয নেই। আবূ হাতিম ও ইবনে সা‘দ রহ. বলেন, তিনি হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে দুর্বল ছিলেন। (লিসানুল মীযান: ৩/১৫৫)
ইবনে মাঈন রহ.ও তার ব্যপারে একই মত পোষণ করেছেন। (তারীখে বাগদাদ: ৮/৫৫২)
তাঁর থেকে শুধু একটি সূত্রে রিওয়ায়েতটি পাওয়া যায়। আর তাতে পাঁচটি ইল্লত (সমস্যা) রয়েছে।
সূত্র: এ সূত্রটির (ইল্লত) সমস্যাগুলোর শাস্ত্রীয় আলোচনা নিম্মরূপ:
১. ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, তাঁর ব্যপারে বর্ণিত ঘটনাটি সহীহ নয়। আবূ উমর বলেন, হযরত সা‘লাবার ব্যপারে যাকাত না দেয়া সংক্রান্ত যে ঘটনাটি বলা হয়, তা সহীহ নয়। (আল জামি’ লি আহকামিল কুরআন: ৮/২১০)
২. শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবূ গুদ্দাহ রহ. বলেন, হযরত সা‘লাবা রা. সংক্রান্ত ঘটনাটি গ্রহণযোগ্য নয়। (আত তালিকাতুল হাফিলাহ, পৃষ্ঠা: ১০৮)
৩. শায়েখ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহ. বলেন, হযরত সা‘লাবা রা. সংক্রান্ত ঘটনাটির সনদ যয়ীফ যিদ্দান। (সিলসিলাতুল যয়ীফা: ৯/৮০)
৪. মুহাক্কিক আব্দুল হুমাইদ সাদানী বলেন, ঘটনাটি সহীহ নয়। (মারেফাতুস সাহাবা লি আবী নু‘আইম: ১/৪১৪)
হযরত সা‘লাবা রা. সংক্রান্ত ঘটনাটির সনদ তথা বর্ণনাসূত্রের অবস্থা এবং এ ব্যাপারে হাদীস শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কেরামের বক্তব্যের আলোকে এ কথা স্পষ্ট যে, ঘটনাটি নির্ভরযোগ্য ও বর্ণনার উপযুক্ত নয়। তাই এটি বর্ণনা করা থেকে আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বেঁচে থাকতে হবে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন