Subscribe Us

header ads

রাসূল সা. এর জীবনি (পর্ব - ০১) আসহাবে ফীলের ঘটনা

আসহাবে ফীলের ঘটনা:

আল্লাহর ঘরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ভয়াবহ শাস্তি
রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ইরশাদ করেন,
 اَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِاَصْحَابِ الْفِيْلِ ○ اَلَمْ يَجْعَلْ كَيْدَهُمْ فِي تَضْلِيْلٍ ○ وَاَرْسَلَ عَلَيْهِمْ طَيْرًا اَبَابِيْلَ ○ تَرْمِيْهِم بِحِجَارَةٍ مِّنْ سِجِّيْلٍ ○ فَجَعَلَهُمْ كَعَصْفٍ مَّاْكُوْلٍ 
আপনি কি দেখেননি, আপনার পালনকর্তা হস্তিবাহিনীর সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন? তিনি কি তাদের চক্রান্ত সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ করে দেননি? আর তিনি তাদের উপর পাঠালেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি, যারা তাদের উপর কংকর জাতীয় পাথর নিক্ষেপ করছিল। ফলে আল্লাহ তাদের ভক্ষিত ভূষিসদৃশ করে দেন। (সূরা ফীল, আয়াত: ১-৫)

এই সূরায় আসহাবে ফীল বা আবরাহার হস্তি বাহিনীর ঘটনা সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে। তারা কাবা ঘর ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে হস্তি বাহিনী নিয়ে মক্কা মুকাররমায় অভিযান পরিচালনা করে ইয়ামান থেকে মিনা পর্যন্ত পৌঁছে ছিল। আল্লাহ তা‘আলা নগণ্য ও ক্ষুদ্র পাখিদের মাধ্যমে তাদের বাহিনী নিশ্চিহ্ন করে তাদের কু-মতলব ধুলায় মিশিয়ে দেন।

খাতামুল আম্বিয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের বছর মক্কা মুকাররমার অদূরে এই ঘটনা ঘটেছিল। বেশ কিছু রেওয়ায়েত দ্বারা এটা প্রমাণিত এবং এটাই প্রসিদ্ধ বর্ণনা। (তাফসীরে ইবনে কাসীর) 

হাদীস বিশারদগণ এ ঘটনাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের একপ্রকার মুজিযারূপে আখ্যায়িত করেছেন। মুজিযা বলতে সাধারণত এমন কোন অলৌকিক ঘটনাকে বুঝানো হয় যেটা নবুওয়্যাত প্রাপ্তির পর নবীগণের দাবিকে সত্য প্রমাণিত করার জন্য আল্লাহ তা‘আলা প্রকাশ করে থাকেন। তবে আম্বিয়া আলাইহিস সালামের নবুওয়্যাত দাবির পূর্বে বরং তাঁদের জন্মেরও পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা মাঝে মধ্যে পৃথিবীর বুকে এমন কিছু ঘটনা ও নিদর্শন প্রকাশ করেন, যা অলৌকিকতায় মুজিযার অনুরূপই হয়ে থাকে। এধরনের নিদর্শনকে হাদীসবিদগণের পরিভাষায় ইরহাসাত (اِرْحَاصَاتْ) বলা হয়। اِرْحَاصَاتْ এর শব্দ رَحْصٌ (রহসুন) অর্থ ভিত্তি ও ভূমিকা। এসব নিদর্শন নবীর নবুওয়্যাত প্রকাশের ভিত্তি ও ভূমিকা হিসেবে সংঘটিত হয় বিধায় এগুলোকে ‘ইরহাসাত’ বলা হয়।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়্যাত এমনকি জন্মেরও পূর্বে এ ধরনের কয়েকটি ইরহাসাত প্রকাশ পেয়েছে। উল্লিখিত সূরা ফীলে বর্ণিত হস্তি বাহিনীকে কুদরতী গজব দ্বারা প্রতিহত করার নিদর্শন এ সবের অন্যতম।

আসহাবে ফীল-এর ঘটনা

হাদীস ও ইতিহাসশাস্ত্রের ইমাম আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বর্ণনা করেন, ইয়ামানের উপর হিমইয়ারী শাসকদের কর্তৃত্ব ছিল, যারা আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করতো। তাদের প্রধান বাদশা যু-নাওয়াস তৎকালীন আহলে হক তথা ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালামের দীনের অনুসারী তাওহীদপন্থীদের উপর খুব জুলুম করেছিল। সে বিশাল আকারে এক গর্ত খনন করে তাতে অগ্নি প্রজ্বলিত করে এবং যে সমস্ত দীনদার তাওহীদপন্থী মূর্তিপূজা ছেড়ে এক আল্লাহর ইবাদত করতেন, তাদের সকলকে উক্ত প্রজ্বলিত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দেয়। যাদের সংখ্যা বিশ হাজারের কাছাকাছি ছিল। এটা ঐ অগ্নিকুন্ডের ঘটনা, যা ‘আসহাবে উখদুদ’-এর আলোচনায় সূরা বুরুজে উল্লেখ হয়েছে।

এদের মধ্য থেকে দুই ব্যক্তি যে কোনো উপায়ে তার কবল থেকে উদ্ধার পেয়ে ছুটে এসে পারস্য-সম্রাটের কাছে ফরিয়াদ করে, হিমইয়ারী শাসনকর্তা দীনদার তাওহিদপন্থীদের উপর এরূপ অত্যাচার চালাচ্ছে। আপনি তার প্রতিশোধ নিন।

তখন পারস্য-সম্রাট ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালামের দীনের অনুসারী হাবশার শাসনকর্তার কাছে চিঠি লিখলেন, আপনি এই জুলুমের প্রতিশোধ গ্রহণ করুন। তিনি এই নির্দেশ পেয়ে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী দুই কমান্ডার তথা আরবাত ও আবরাহার নেতৃত্বে ইয়ামানের ঐ বাদশার মোকাবেলা করার জন্য প্রেরণ করেন। উক্ত সেনাবাহিনী তার দেশের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং গোটা ইয়ামানকে হিমইয়ার সম্প্রদায়ের কবজা থেকে স্বাধীন করে।

তখন হিমইয়ার শাসনকর্তা যু-নাওয়াস পালিয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে নদীতে ডুবে মারা যায়। এভাবে আবরাহার মাধ্যমে ইয়ামান অঞ্চল হাবশার শাসনকর্তার দখলে চলে আসে।

পরবর্তীকালে আরবাত ও আবরাহার মধ্যে লড়াই হয়। তখন আরবাত নিহত হয় এবং আবরাহা জয়ী হয়। এতে আবরাহা ইয়ামানের উপর এককভাবে দখলদারিত্ব কায়েম করে।

আবরাহার ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের বক্তব্য হলো, সে শাহী গোত্রের ছিল। তার নাম ছিল আবরাহা। কিন্তু যেহেতু তার নাক কাটা ছিল, তাই আরবরা তাকে ابرهة الاشرم  (আবরাহা আলআশরাম) বলতো। আরবিতে اشرم শব্দের অর্থ নাক কাটা।

কারো কারো মতে, আবরাহা ৫২৫ খ্রিস্টাব্দে রাজত্ব শুরু করে। আর কোন কোন ঐতিহাসিক ৫৪৩ খ্রিস্টাব্দের কথা উল্লেখ করেছেন। ‘আরদুল কুরআন’ প্রণেতা দ্বিতীয় মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

আবরাহা কট্টর খ্রিস্টান ছিল, যার কারণে সে গোটা সাম্রাজ্যে ঈসায়ী মুবাল্লিগ নিযুক্ত করেছিল এবং শহরে-বন্দরে বড় বড় গির্জা নির্মাণ করেছিল। শেষ পর্যন্ত আবরাহা ইচ্ছা করলো, ইয়ামানে এমন একটি শানদার গির্জা নির্মাণ করবে, যার কোন নযীর পৃথিবীর বুকে থাকবে না। এর দ্বারা তার এই উদ্দেশ্য ছিল যে, ইয়ামানসহ সারা বিশ্বে যে সমস্ত আরব-অনারব মক্কা মুকাররমায় উপস্থিত হয়ে বায়তুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ করে, তারা যেন এই গির্জার শান-শওকতে প্রভাবিত হয়ে কাবার পরিবর্তে এই গির্জায় আগমন করে।

এই খেয়ালে সে একটি সুউচ্চ আলীশান গির্জা নির্মাণ করলো, তার চূড়ায় দাঁড়ালে নিচের মানুষজন দেখা যেত না। সম্পূর্ণ গির্জাটি সে সোনা-রুপা, হীরা, মণি-মুক্তা ও হাতির দাঁত দিয়ে নকশা করে সাজিয়েছিল।

সুহায়লী রহ. বর্ণনা করেন, এই গির্জা নির্মাণের ক্ষেত্রে আবরাহা ইয়ামানের অধিবাসীদের উপর খুব অত্যাচার করেছিল। সে সেখানকার অধিবাসীদের জোরপূর্বক শ্রমিক বানিয়েছিল এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এর পিছনে অঢেল সম্পদ ব্যয় করেছিল।

গির্জা-নির্মাণ সমাপ্ত করার পর আবরাহা হাবশার সম্রাট নাজাশীর কাছে এই মর্মে পত্র প্রেরণ করলো, আমি ইয়ামানের রাজধানী সানআয় আপনার জন্য ‘আলকালিস’ নামক এমন এক নযীরবিহীন গির্জা নির্মাণ করেছি, বিগত ইতিহাস যার কোন দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে পারেনি। এখন আমার আকাঙ্ক্ষা হলো গোটা বিশ্বের যে সকল আরব-অনারব মক্কা মুআজ্জমায় হজ্জ পালন করার জন্য একত্র হয়, তাদের সকলের অন্তরাত্মা এই গির্জার দিকে ফিরিয়ে দিব, আর এখন থেকে এটাই হবে তাদের সবার হজ্জব্রত পালন করার স্থান।

সমস্ত আহলে আরব তথা ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষ সকলেই পবিত্র কাবার খুব সম্মান ও শ্রদ্ধা করতো এবং প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ আকীদা-বিশ্বাস অনুযায়ী বায়তুল্লাহর হজ্জ ও যিয়ারত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত মনে করতো। এ জন্যই আহলে আরবরা যখন আবরাহার এই উদ্দেশ্যের কথা জানতে পারলো, তখন আদনান, কাহতান ও কুরাইশ গোত্রের লোকেরা রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলো। এমনকি এদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি রাতের আঁধারে ঐ গির্জায় প্রবেশ করে তাতে মলমূত্র ত্যাগ করে তা অপবিত্র করে দিল। কোন কোন বর্ণনামতে, মুসাফিরদের একটি দল নিজেদের প্রয়োজনে উক্ত গির্জার পাশে আগুন জ্বালালে তা থেকে ঐ গির্জায় আগুন ধরে যায় এবং তার অনেক ক্ষয়-ক্ষতি হয়।

আবরাহা যখন জানতে পারলো, কোন আরবীয় লোকের দ্বারা এ কাজ হয়েছে, তখন সে শপথ করলো, আমি তাদের কাবাগৃহের ইট একটা একটা করে খুলে ফেলবো এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তা না করতে পারবো, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি শান্ত হবো না। এরই ভিত্তিতে আবরাহা বায়তুল্লাহ অভিমুখে রওয়ানার প্রস্তুতি শুরু করলো এবং এই মর্মে বাদশা নাজাশীর কাছে অনুমতি চাইলো। নাজাশী তার ‘মাহমুদ’ নামক বিশেষ হাতিটি আবরাহার জন্য প্রেরণ করলো, যাতে করে সে সওয়ার হয়ে কাবা শরীফে আক্রমণ করতে পারে।

কোন কোন বর্ণনামতে, এটা খুব বড় ও শক্তিশালী হাতি ছিল, তৎকালীন সময়ে যার কোন দৃষ্টান্ত পাওয়া যেত না। এর সাথে সাথে হাবশা সম্রাট অন্যান্য সেনা সদস্যের জন্য আরও আটটি হাতি প্রেরণ করেছিল। সে এই উদ্দেশ্যে এসব হাতি প্রেরণ করেছিল যে, বায়তুল্লাহ শরীফ ধ্বংস করার ক্ষেত্রে এগুলো ব্যবহার করে যেন সহজেই কার্যসিদ্ধি করা যায়। সে ভাবলো, বায়তুল্লাহর খাম্বাগুলো লোহার শক্ত শিকল দিয়ে আটকিয়ে ঐ শিকলগুলো হাতির গলায় বেঁধে হাতি হাঁকানো হলে, হাতিগুলোর টানের তোড়ে সম্পূর্ণ বায়তুল্লাহ সাথে সাথে ভেঙ্গে পড়বে। (নাউযুবিল্লাহ)।

আরবরা যখন দুর্ধর্ষ আবরাহার এ কাবা আক্রমণের কথা শুনতে পেলো, তখন তারা সকলেই তার মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করলো। সর্বপ্রথম যু-নাযার নামক আরব-বংশোদ্ভূত এক ইয়ামানী সরদার ইয়ামান থেকে বের হয়ে আরবের বিভিন্ন গোত্রের কাছে এই সংবাদ দিয়ে দূত প্রেরণ করলেন যে, আমি আবরাহার মোকাবেলা করতে চাই। সুতরাং আপনাদের উচিত হলো এই সৎকাজে আমাকে সহযোগিতা করা। এই বলে তিনি আরবদের একটি দলসহ আগে বেড়ে আবরাহা বাহিনীর মোকাবেলায় যুদ্ধে লিপ্ত হলেন। কিন্তু তাতে তিনি পরাজয় বরণ করলেন এবং গ্রেফতার হলেন।

আবরাহা পথ অতিক্রম করে যখন ‘খাসআম’ গোত্রের এলাকায় পৌঁছালো তখন ঐ গোত্রের সরদার নুফায়েল ইবনে হাবিব নিজ গোত্রের লোকজন নিয়ে আবরাহা-বাহিনীর মোকাবেলা করলো। কিন্তু সেও পরাজিত হলো এবং গ্রেফতার হলো। তারপর সে প্রাণ বাঁচানোর জন্য আবরাহার পথপ্রদর্শকের দায়িত্ব গ্রহণ করলো।

অতঃপর আবরাহা বাহিনী তায়েফের নিকটে পৌঁছালো। সেখানকার অধিবাসী সাকিফ গোত্র পূর্ব থেকেই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাথে লড়াইয়ে আবরাহা বাহিনীর বিজয়ের কথা শুনেছে। তাই এত বড় শক্তির মোকাবেলা করতে পারবে না মনে করে তাদের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত না হয়ে নিজেদের সরদার মাসউদ ইবনে মুআত্তাবকে একটি প্রতিনিধিদলসহ আবরাহার সাথে সাক্ষাত করতে প্রেরণ করে। সে আবরাহার সাথে সাক্ষাত করে বললো, আপনার সাথে আমাদের কোন শত্রুতা নেই। সেজন্য আমাদের এ বিশ্বাস আছে, আপনি আমাদের উপাস্য ‘লাত’-এর মন্দিরের কোন ক্ষয়-ক্ষতি করবেন না। বিনিময়ে আমরা আপনার সহযোগিতা ও পথপ্রদর্শনের জন্য আমাদের এক সরদার আবু রিগালকে প্রেরণ করছি, তিনি আপনাকে মক্কা পর্যন্ত পৌঁছে দিবেন। আবরাহা এই প্রস্তাব গ্রহণ করে আবু রিগালকে সাথে নিয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হলো।

পথিমধ্যে ‘মাগমাস’ নামক উপত্যকায় আবু রিগাল মারা গেলো। বর্ণিত আছে, আবরাহাকে পথ দেখানো ছিল আবু রিগালের বিশ্বাস ঘাতকতামূলক অপরাধ। তাই তার মৃত্যুর পর সে যুগে আরবের লোকেরা দীর্ঘদিন পর্যন্ত তার কবরের উপর পাথর নিক্ষেপ করে।

এই ‘মাগমাস’ নামক স্থানে মক্কার কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রের ভেড়া-বকরি ও উটের চারণভূমি ছিল। আবরাহার সৈন্যবাহিনী এখানে পৌঁছে সর্বপ্রথম এসব পশুপালের উপর আক্রমণ করে তা থেকে অনেক ভেড়া-বকরি ও উট লুট করে নিয়ে গেল। এ গুলোর মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিত পিতামহ কুরাইশ-নেতা আবদুল মুত্তালিবেরও দুইশ উট ছিল।

অতঃপর এই স্থানে অবস্থান নিয়ে আবরাহা তার হানাতা হামিরী নামক দূতকে মক্কা মুকাররমায় প্রেরণ করলো, যেন সে মক্কায় গিয়ে কুরাইশ সরদারের নিকট এই পয়গাম পৌঁছায় যে, আমরা তোমাদের সাথে লড়াই করতে আসিনি। বরং কাবাঘর বিধ্বস্ত করাই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। সুতরাং এ ব্যাপারে যদি তোমরা আমাদের বাধা না দাও, তা হলে আমরা তোমাদের কোন ক্ষতি সাধন করবো না।

আবরাহার পয়গাম নিয়ে হানাতা হামিরী যখন মক্কা মুয়াজ্জমায় প্রবেশ করলো, তখন সকলেই আবদুল মুত্তালিব-এর দিকে ইঙ্গিত করে বললো, ইনিই হলেন মক্কার প্রধান সরদার। তখন হানাতা আবদুল মুত্তালিব-এর সাথে সাক্ষাত করে আবরাহার উক্ত পয়গাম পৌঁছালো।

ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী, আবদুল মুত্তালিব জবাব দিলেন, আমরা কখনোই আবরাহার সাথে লড়াই করতে চাই না। আর না আমাদের তার সাথে লড়াই করার মতো শক্তি আছে। তবে হ্যাঁ, আমি নির্দ্বিধায় এতটুকু বলতে পারি, কাবা আল্লাহর ঘর, যা তার খলীল ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নির্মাণ করেছেন। তিনি নিজেই এর হেফাজত করবেন। আর যে আল্লাহর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে, সে দেখতে পাবে, আল্লাহ তার সাথে কিরূপ আচরণ করেন।

অতঃপর হানাতা আবদুল মুত্তালিবের কাছে প্রস্তাব পেশ করলো, আপনি আমার সাথে চলুন। আমি আপনাকে আবরাহার সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিব। তিনি এই প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে আবরাহার সাথে দেখা করতে গেলেন।

আবদুল মুত্তালিব অতিশয় সুশ্রী, বলিষ্ঠ ও ব্যক্তিত্ববান লোক ছিলেন। আবরাহা তাকে দেখে খুবই প্রভাবিত হলো এবং নিজের সিংহাসন থেকে উঠে এসে তার পাশে বসলো। অতঃপর আবরাহা জিজ্ঞেস করলো, আপনি কী উদ্দেশ্যে এসেছেন? তিনি বললেন, আমার প্রয়োজন শুধু এতটুকু যে, আমার যে সমস্ত উট লুণ্ঠন করে আনা হয়েছে, সেগুলো ফেরত দেওয়া হোক। আবরাহা বললো, আমি আপনাকে দেখে খুবই উচ্চ মনের অধিকারী ও বিচক্ষণ নেতা মনে করেছিলাম। কিন্তু আপনার এই কথার দ্বারা আমার সেই ধারণার পরিবর্তন ঘটলো। কেননা, আপনি কেবল আপনার দুইশ উট ফেরত নেওয়ার ব্যাপারেই আমার সাথে কথা বললেন, অথচ আপনি জানেন যে, আমি আপনার পিতৃধর্মের কেন্দ্রস্থল কাবাঘর ধ্বংস করার জন্য মক্কায় এসেছি। কিন্তু আপনি সে ব্যাপারে কোন কথাই বললেন না। আবদুল মুত্তালিব জবাব দিলেন, এই উটগুলোর মালিক আমি, তাই সে গুলোর ব্যাপারে আমাকেই চিন্তা করতে হবে। আর বায়তুল্লাহর ব্যাপারে কথা হচ্ছে, তারও একজন মহান মালিক আছেন। তিনি নিজেই এর হেফাজত করবেন।

তখন আবরাহা বললো, আপনার প্রভু তাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবেন না। তা শুনে আব্দুল মুত্তালিব বললেন, আমার বলার দরকার বললাম, এবার আপনার ইচ্ছা। আপনি যা চান, করতে পারেন।

কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, আবদুল মুত্তালিবের সাথে আরো কয়েকজন কুরাইশ সরদার আবরাহার সাথে সাক্ষাত করতে গিয়েছিলেন এবং তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, আপনি যদি বায়তুল্লাহর উপর হস্তক্ষেপ না করে ফিরে যান, তবে আমরা প্রতি বছর আমাদের উৎপাদিত শস্যের এক-তৃতীয়াংশ আপনাকে কর হিসেবে প্রদান করবো। কিন্তু আবরাহা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলো।

আলোচনার পরে আবরাহা আবদুল মুত্তালিব-এর উটগুলো ফিরিয়ে দিল। তিনি তার উট নিয়ে চলে এলেন।

অতঃপর আবদুল মুত্তালিব কুরাইশদের বিশাল একদল সাথে নিয়ে বায়তুল্লাহ শরীফের দরজার কড়া ধরে সকলে মিলে আল্লাহর দরবারে দু‘আ করতে লাগলেন, আয় আল্লাহ, আবরাহার এত বড় শক্তিশালী বাহিনীর মোকাবেলা করার সামর্থ আমাদের নেই। তাই আপনি নিজেই আপনার ঘরের হেফাজত করার ব্যবস্থা করুন।

খুব কাকুতি-মিনতির সাথে দু‘আ করার পর আবদুল মুত্তালিব মক্কা মুকাররমার লোকদের নিয়ে আশপাশের পর্বতমালায় আশ্রয় গ্রহণ করলেন। কারণ, তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আবরাহার সৈন্যবাহিনীর উপর আল্লাহর গজব নাযিল হওয়া অবধারিত। এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই আবদুল মুত্তালিব আবরাহার কাছে শুধু তার উট ফেরত চেয়েছিলেন। তখন বায়তুল্লাহ সম্পর্কে আলোচনা করা এ জন্য পছন্দ করেননি যে, একে তো তাদের মোকাবেলা করার মতো শক্তি-সামর্থ ছিল না, অপরদিকে এই বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর রহম করে স্বীয় কুদরতে কাবার দুশমনদের নাস্তানাবুদ করে দিবেন।

পরের দিন সকালে আবরাহা তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করার জন্য অগ্রসর হলো। সে তার ‘মাহমুদ’ নামীয় হাতিটি সামনে চালানোর জন্য প্রস্তুত করলো। তখন নুফায়েল ইবনে হাবিব, যাকে আবরাহা রাস্তা থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছিল, সে এই সময় সামনে অগ্রসর হয়ে উক্ত হাতির কান ধরে বললো, তুমি যেখান থেকে এসেছো, সেখানেই সহীহ-সালামতে ফিরে যাও। কেননা, তুমি আল্লাহ তা‘আলার নিরাপদ শহরে (بَلَد اَمِيْن) অবস্থান করছো। এই বলে সে হাতির কান ছেড়ে দিল। এটা শোনামাত্র উক্ত হাতি বসে পড়লো।

হাতির মাহুতরা অনেক চেষ্টা করে তাকে উঠিয়ে সামনে অগ্রসর করাতে চাইলো। কিন্তু কি আশ্চর্য, সে উঠলো না। এমনকি হাতিটিকে খুব প্রহার হলো, বড় বড় চাবুক দিয়ে আঘাত করা হলো এবং আঘাত করতে করতে তাকে আহত করা হলো। আবার হস্তিটির নাকে লোহার আংটা লাগিয়ে তাকে উঠানোর চেষ্টা করা হলো। কিন্তু এতো কিছু সত্ত্বেও সে এক বিন্দুও সামনে বাড়লো না।

আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সেই হাতিটি যখন বিপরীত দিকে অর্থাৎ উত্তর, দক্ষিণ বা পূর্ব দিকে চালানোর চেষ্টা করা হতো, তখন সে দৌড় শুরু করতো। পক্ষান্তরে মক্কার দিকে ফিরিয়ে চালানোর চেষ্টা করা হলে, সাথে সাথে বসে পড়তো। তখন কোনক্রমেই সম্মুখের দিকে চালানো সম্ভব হতো না।

চলবে...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

//