রাসূল সা. এর জীবনি (পর্ব - ১৩) বিজয়াভিযানের প্রস্তুতি

বিজয়াভিযানের প্রস্তুতি

আবু সুফিয়ান চলে যাওয়ার পর নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যান্ত গোপনীয়তার সাথে অভিযানের প্রস্তুতির জন্য সাহাবায়ে কেরামকে নির্দেশ দিলেন । এবং আম্মাজান আয়েশা রা. কে বললেন,
جَهِّزِينِي وَلَا تُعْلِمِنَّ بِذَلِكَ اَحَدًا

‘আমার সফরের সরঞ্জাম প্রস্তুত করো। আর কাউকে এ ব্যাপারে কিছু জানিও না’।
কন্যা আয়েশা রা. এর প্রস্তুতি দেখে পিতা হযরত আবু বকর রা. নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অভিযানের কারণ জিজ্ঞেস করলে নবীজী বললেন,
اِنَّهُمْ اَوَّلُ مَنْ غَدَرَ
নিশ্চয় কাফেররা [হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করে] সর্বপ্রথম গাদ্দারী করেছে! (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হা. নং ৩৮০৫৫)
 

হাতেব ইবনে আবী বালতাআ রা. -এর চিঠি

ইবনে ইসহাক রহ. বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন অভিযানের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেললেন, তখন সাহাবী হযরত হাতেব ইবনে আবী বালতাআ রা. এ অভিযানের সংবাদ সম্বলিত একটি চিঠি ‘সারা’ নাম্মী এক মহিলার মারফতে মক্কাবাসীর নিকট প্রেরণ করেন। মূসা ইবনে উকবা রহ. এর মতে এ মহিলাকে দশ দীনারের পারিশ্রমিক প্রদান করা হয়েছিল।
চিঠির ভাষা ছিল,
اما بعد: يَا معشر قُرَيْش، فَان رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم، جَاءَكُم بِجَيْش كالليل، يسير كالسيل، فوَاللَّه لَو جَاءَكُم وَحده نَصره الله عَلَيْكُم، وانجز لَهُ وعده، فانظروا لانفسكم وَالسَّلَام.
হে কুরাইশগণ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের নিকট এমন এক বাহিনী নিয়ে ধেয়ে আসছেন, যারা নিকষ রাতের মত [চারিদিক ছেয়ে ফেলবে], যাদের গতি হবে প্লাবনের স্রোতের ন্যায়। আল্লাহর কসম! যদি নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাই তোমাদের মোকাবেলায় অবতীর্ণ হন, তবুও আল্লাহ তা‘আলা নিজ প্রতিশ্রুতি পূরণার্থে তাকে তোমাদের উপর বিজয়ী করবেন। সুতরাং তোমরা নিজেদের বাঁচানোর চিন্তা করো। সালাম। (ফাতহুল বারী, ৭:৬৩৫-৬৩৬)

বুখারী শরীফের বর্ণনায় এসেছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহীর মাধ্যমে হাতেব রা. এর চিঠির ব্যাপারে অবগত হয়ে হযরত আলী রা., হযরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা., হযরত আবু মারছাদ রা. ও হযরত মিকদাদ রা. এ চারজন সাহাবীকে নির্দেশ প্রদান করলেন যে,
«انْطَلِقُوا حَتَّى تَاْتُوا رَوْضَةَ خَاخٍ، فَاِنَّ بِهَا امْرَاَةً مِنَ المُشْرِكِينَ، مَعَهَا كِتَابٌ مِنْ حَاطِبِ بْنِ اَبِي بَلْتَعَةَ اِلَى المُشْرِكِينَ»
তোমরা বেরিয়ে পড়। “রওজায়ে খাখ” নামক স্থানে তোমরা মুশরিকদের প্রতি প্রেরিত হাতেবের চিঠি বহণকারিণী এক মুশরিক নারী কে পাবে...!

নবীজীর কথার সত্যতার উপর সাহাবায়ে কেরামের ঈমান!

নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ মত চার সাহাবী “রওজায়ে খাখ” নামক স্থানে গিয়ে সে মহিলাকে দেখতে পেয়ে ধরে ফেললো। এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলো। মহিলা চিঠির কথা পুরোপুরি অস্বীকার করে বসলো। চার সাহাবী মহিলার প্রাথমিক তল্লাশী করে কোনো চিঠি খুঁজে পেলেন না। কিন্তু সাহাবায়ে কেরামের ঈমান তো ছিলো এমন যে, চোখের দেখা ভুল হতে পারে, কিন্তু নবীজীর কথা কখনোই অসত্য হতে পারে না। এ কারণেই তাঁরা মহিলাকে হুমকি দিয়ে বললেন,
مَا كَذَبَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، لَتُخْرِجِنَّ الكِتَابَ اوْ لَنُجَرِّدَنَّكِ
‘নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনোই অসত্য বলেননি। তুমি হয়তো চিঠি বের করে দেবে। আর না হয়তো আমরা তোমাকে বিবস্ত্র করে তল্লাশী নিতে বাধ্য হবো’!
মহিলা বাধ্য হয়ে তার শরীরের পেছন দিকে [দেহের নিম্মাংশের পরিধেয় বস্ত্র] ইযার -এর মধ্যে গুজে রাখা মাথা হতে প্রলম্বিত চুলের বেণীর অগ্রভাগ থেকে চিঠি বের করে দিলো। 
চার সাহাবী যখন চিঠি নিয়ে নবীজীর দরবারে পৌছলেন, তখন নবীজী হাতেবকে ডেকে চিঠির কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। 
হাতেব রা. বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমার ব্যপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করবেন না। (আমি যা করেছি তার কারণ হলো) আমি কুরাইশের সাথে মৈত্রি চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলাম। আপনার সঙ্গী অন্যান্য মুহাজিরগণের হিজরতকালীন মক্কায় রেখে আসা ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজনের হেফাজতের জন্য আত্মীয়-স্বজন সেখানে রয়েছে। কিন্তু আমার ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজন হেফাজতের জন্য কোনো অবলম্বন সেখানে নেই। যদ্দরুণ আমি চেয়েছিলাম, এ চিঠির মাধ্যমে কুরাইশরা যেন আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়। এবং কৃতজ্ঞতার অনুভূতি থেকে মক্কায় রেখে আসা আমার পরিবার-পরিজনদের কোনো ক্ষতি করা থেকে তারা বিরত থাকে। আমি এ কাজ এ জন্য করিনি যে, আমি মুরতাদ হয়ে গেছি, কিংবা এ জন্যও করিনি যে, আমি কুফরের উপর সন্তুষ্ট আছি..!”
নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতেব রা. এর আত্মপক্ষ সমর্থনকে সত্যায়ন করে বললেন, “নিশ্চয় সে [হাতেব] সত্য কথা বলেছে। ”
এতদ্বসত্ত্বেও হাতেব রা. এর এ কর্মকান্ড যেহেতু বাহ্যদৃষ্টিতে ভিন্নরকম মনে হচ্ছিল, তাই বীর সাহাবী হযরত উমর রা. তা বরদাশত করতে না পেরে বলে ফেললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি প্রদান করুন, আমি এই মুনাফেকের গর্দান উড়িয়ে দিই!’
নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
انَّهُ قَدْ شَهِدَ بَدْرًا، وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّ اللهَ اطَّلَعَ عَلَى مَنْ شَهِدَ بَدْرًا فَقَالَ: اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ
 ‘হে উমর! হাতেব তো বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। তুমি কি জানো না যে, আল্লাহ তা‘আলা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের পূর্বাপর সর্ব বিষয়ে অবগত হয়েই বলেছেন যে,
[হে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ!], তোমরা যা ইচ্ছা করো! আমি তোমাদের আগে-পরের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছি!’
নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা শুনে উমর রা. কেঁদে ফেললেন এবং নিজের ভুল বুঝতে পেরে বললেন, “আল্লাহ এবং  তাঁর রাসূলই সম্যক অবগত!”
এর পরপরই সূরা মুমতাহিনার এ আয়াত নাযিল হলো,
یٰۤایُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوْا عَدُوِّیْ وَ عَدُوَّكُمْ اوْلِیَآءَ تُلْقُوْنَ الَیْهِمْ بِالْمَوَدَّۃِ وَ قَدْ کَفَرُوْا بِمَا جَآءَكُمْ مِّنَ الْحَقِّ ۚ یُخْرِجُوْنَ الرَّسُوْلَ وَ ایَّاكُمْ انْ تُؤْمِنُوْا بِاللهِ رَبِّكُمْ ؕ انْ كُنْتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِیْ سَبِیْلِیْ وَابْتِغَآءَ مَرْضَاتِیْ  تُسِرُّوْنَ الَیْهِمْ بِالْمَوَدَّۃِ  وَ انَا اعْلَمُ بِمَاۤ اخْفَیْتُمْ وَمَاۤ اعْلَنْتُمْ ؕ وَ مَنْ یَّفْعَلْهُ مِنْكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَآءَ السَّبِیْلِ ○
‘হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমার পথে জিহাদের জন্য (ঘর থেকে) বের হয়ে থাকো, তবে আমার শত্রু ও তোমাদের নিজেদের শত্রুকে এমন বন্ধু বানিও না যে, তাদের কাছে ভালোবাসার বার্তা পৌঁছাতে শুরু করবে, অথচ তোমাদের কাছে যে সত্য এসেছে, তাঁরা তা এমনই প্রত্যাখ্যান করেছে যে, রাসূলকে এবং তোমাদেরকেও কেবল এ কারণে (মক্কা হতে) বের করে দিচ্ছে যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলার উপর ঈমান এনেছো। তোমরা গোপনে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো, অথচ তোমরা যা কিছু গোপনে করো ও যা কিছু প্রাকাশ্যে করো আমি তা ভালোভাবে জানি। তোমাদের মধ্যে কেউ  এমন করলে সে সরল পথ থেকে বিচ্যুত হলো। (সূরা মুমতাহিনা, আয়াত:১; বুখারী শরীফ, হা. নং ৩০৮১,৩৯৮৩, ৪২৭৪)

বিজয়ের পথে রওনা

এরপর নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সাহাবায়েকেরামকে নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওনা হন। মক্কা অভিমুখে নবীজীর এ অভিযান সম্পর্কে কুরাইশরা সম্পূর্ণ বে-খবর ছিলো। (মুসতাদরাকে হাকীম, হা.নং ৪৩৫৯)
হিজরী ৮ম সনের তৃতীয় রমযানে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনা থেকে মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্য বের হন। আর ১৩তম রমযানে মক্কায় প্রবেশ করেন। মাঝে বার দিন পথে কেটে যায়।
রওয়ানার প্রাক্কালে নবীজী হযরত আবু রূহম গিফারী রা. কে মদীনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত নির্বাচন করে যান। এ সময়ে নবীজীর সফরসঙ্গী মুহাজির ও আনসার সাহাবায়ে কেরামের সংখ্যা ছিলো দশ হাজার। (ফাতহুল বারী, ৭:৬৩৮; উমদাতুল কারী, ১২:২৬৩)

রোযা ভেঙে ফেলা...

ফাতহে মক্কার এ সফরে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম সকলেই রোযাদার ছিলেন। ‘কুদাইদ’ ও ‘উসফান’ এলাকাদ্বয়ের মধ্যবর্তী “কাদীদ” নামক একটি জলাশয়ের নিকটে পৌছে নবীজী রোযা ভেঙে ফেলেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও ভেঙে ফেলতে নির্দেশ দেন। (বুখারী শরীফ, হা. নং ৪২৭৯; মুসনাদে আহমাদ, হা. নং ১১৮২৫)
আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. বলেন, ‘মুসাফিরের জন্য সফর অবস্থায় রোযা না রাখার অনুমতি রয়েছে। তবে ফাতহে মক্কার এ সফরে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসাফির হওয়ার কারণে রোযা ভাঙ্গেন নি, বরং রোযা ভাঙার উদ্দেশ্য ছিলো উম্মাতকে এ কথা বুঝানো যে, রণাঙ্গনে কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদরত মুজাহিদদের জন্য শারীরিক দূর্বলতা দূরীকরণের নিমিত্তে রোযা ভেঙে ফেলারও অবকাশ রয়েছে’। (ফাতহুল বারী, ৬:১১৩)

ক্ষমা ও উদারতার নবী!

মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী “সানিয়্যায়ে ইকাব” নামক স্থানে পৌঁছানোর পর নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাচাতো ভাই আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস এবং ফুফাতো ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে আবী উমাইয়াহ যারা এ যাবত কাফের ছিলেন নবীজীর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আগমন করলেন। উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রা. তাদেরকে সাক্ষাত দানের ব্যাপারে নবীজীর কাছে সুপারিশ করলেন। যেহেতু তারা নবীজীকে ইতোপূর্বে নানাভাবে কষ্ট দিয়েছিলো, কাজেই নবীজী তাদের সাথে সাক্ষাতে সম্মত হলেন না, কিন্তু তারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করতঃ ক্ষমা চেয়ে ইসলাম গ্রহণের আর্তি জানিয়ে অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় কিছু কবিতা আবৃত্তি করলেন। ফলে দয়ার নবী তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন, তারা ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হলেন। (মুসতাদরাকে হাকেম, হা. নং ৪৩৫৯)
নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাচা হযরত আব্বাস রা. যিনি ইসলাম গ্রহণ করত নবীজীর হুকুমে মক্কায় রয়ে গিয়েছিলেন, পরিবারসহ হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন, পথিমধ্যে তিনিও ‘জুহফা’ নামক স্থানে নবীজীর সাথে মিলিত হন। (সীরাতে ইবনে হিশাম, ৪:৪২; যাদুল মা‘আদ)

মক্কার উপকণ্ঠে...

সফররত অবস্থায় নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সাহাবায়েকেরামকে নিয়ে “মাররুয্যাহরান” নামক স্থানে পৌছলেন, তখন নবীজী সঙ্গী সাহাবায়ে কেরামের প্রত্যেককে নিজ নিজ তাবুর সামনে আগুন জালানোর আদেশ দিলেন। নির্দেশ মতো আগুন জালানো হলো। সে রাতে সাহাবায়ে কেরামের প্রজ্জ্বলিত মশাল ছিলো দশ হাজার। 
নবীজী যেহেতু ইতোপূর্বে কুরাইশদের সন্ধি নবায়ন আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, ফলে কুরাইশরা নিশ্চিতভাবে না জানলেও মক্কা আক্রমণের ব্যাপারে তাদের দৃঢ় আশঙ্কা ছিলো । 
এ আশঙ্কা থেকেই মক্কার কাফেররা সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আবু সুফিয়ান, হাকীম ইবনে হিযাম ও বুদাইল ইবনে ওরকা এ তিনজনকে প্রেরণ করলো। “মাররুয্যাহরান” পৌছে তারা যখন দেখতে পেলো যে, হজ্জের সময় আরাফার ময়দানে অসংখ্য হাজীরা রাত্রিযাপনকালে যেভাবে আগুন জালায়, সেভাবে অসংখ্য পরিমাণে আগুন জলছে, তখন তারা অবাক হয়ে গেলো। এবং একে অন্যকে এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো। 
রাতের বেলা দুশমনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উমর রা. এর নেতৃত্বে আনসারী সাহাবাদের এক জামা‘আতকে নিয়োগ করেছিলেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হা. নং ৩৮০৫৫)
তারা আবু সুফিয়ান ও তার সাথীদ্বয়ের অস্তিত্ব টের পেয়ে তাদের পাকড়াও করে ফেললো। (বুখারী শরীফ, হা.নং ৪২৮০) 
ইতোমধ্যে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের খচ্চরে চড়ে নবীজীর চাচা আব্বাস রা. এসে উপস্থিত হলেন। আসন্ন বিপদ টের পেয়ে পূর্ব বন্ধুত্বের সূত্রতায় আবু সুফিয়ান হযরত আব্বাস রা. এর কাছে মুক্তির পন্থা কামনা করলো! আব্বাস রা. তাকে খচ্চরের পিঠে বসিয়ে দ্রুত নবীজীর দরবারের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। কারণ প্রবল আশঙ্কা ছিলো যে, আল্লাহর এ দুশমনকে দেখে মুসলমানদের তরবারী কোষবদ্ধ থাকবে না। পথে হযরত উমর রা. আবু সুফিয়ানকে দেখে ফেললেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চরম দুশমন আবু সুফিয়ানকে দেখে উমর রা. এর মতো আশেকে রাসূলের পক্ষে নিবৃত থাকা কোন ক্রমেই সম্ভব ছিল না! কাজেই তাকে হত্যার অনুমতি নেওয়ার উদ্দেশে ওমর রা. তৎক্ষণাৎ নবীজীর দরবারের উদ্দেশে ছুটলেন। ইতোমধ্যে আব্বাস রা. ও দরবারে রিসালাতে পৌছে গেলেন। (শরহু মা‘আনিল আসর, হা.নং ৫৪৫০)

ক্ষমা মহানুভবতার দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত!

ওমর রা. নবীজীর কাছে আবু সুফিয়ানকে হত্যার অনুমতি চেয়ে বললেন,
هَذَا ابُو سُفْيَانَ , قَدْ امْكَنَ اللهُ مِنْهُ بِلَا عَقْدٍ وَلَا عَهْدٍ , فَدَعْنِي فَاضْرِبُ عُنُقَهُ
“হে আল্লাহর রাসূল! এই যে, আবু সুফিয়ান, আমাদের কোনো প্রচেষ্টা ছাড়াই আল্লাহ তা‘আলা তাকে আমাদের হস্তগত করে দিয়েছেন। সুতরাং আমাকে অনুমতি দান করুন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই!”
আব্বাস রা. বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে নিরাপত্তা দান করেছি।”
নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যার অনুমতি দিলেন না। বরং আব্বাস রা. কে বললেন,
اذْهَبْ بِهِ الَى رَحْلِكَ فَاذَا اصْبَحْتَ فَاتِنَا بِهِ
 “তাকে তোমার তাবুতে নিয়ে যাও, সকাল বেলা নিয়ে এসো”।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য