Subscribe Us

header ads

রাসূল সা. এর জীবনি (পর্ব - ১২) ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়

ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়
x

পবিত্র কুরআনে কারীমে সূরা ফাতহে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
اِنَّا فَتَحْنَا لَکَ فَتْحًا مُّبِیْنًا 
 ‘হে রাসূল! নিশ্চয়ই আমি আপনাকে প্রকাশ্য বিজয় দান করেছি।’(সূরা  ফাতহ, আয়াত:১)

সূরা ফাতহের এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা সাহাবায়ে কেরামকে ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের পূর্বসুসংবাদ প্রদান করেছেন। যে বিজয়ের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দীনকে, তার রাসূলকে এবং মুমিন বান্দাদেরকে সম্মানিত করেছেন। যে বিজয়ের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা বিশ্ব মানবতার হেদায়াতের প্রাণকেন্দ্র বাইতুল্লাহকে কুফর ও শিরক থেকে মুক্ত করেছেন। তাই ইসলামী ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিজয় ছিল একটি “ঐতিহাসিক বিজয়”!

মক্কা বিজয়ের প্রেক্ষাপট

ষষ্ঠ হিজরী জিলক্বদ মাসে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে উমরা আদায়ের উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। কিন্তু হুদাইবিয়া নামক স্থানে পৌছার পর মক্কার কাফেররা তাতে বাঁধা প্রদান করে। পরিশেষে দু’পক্ষের মাঝে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ইতিহাসে যাকে “হুদাইবিয়ার সন্ধি” নামে আখ্যায়িত করা হয়। (ফাতহুল বারী, ৭:৫৪৩)

হুদাইবিয়ার এই সন্ধি চুক্তির ধারাগুলো বাহ্যিকভাবে ছিল সম্পূর্ণরূপে ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থবিরোধী। কিন্তু প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তা‘আলা আপাত দৃষ্টিতে নীতিগত এই পরাজয়কেই ভবিষ্যতের সুস্পষ্ট বিজয় আখ্যায়িত করেছিলেন। এবং এ হুদাইবিয়ার সন্ধি থেকেই রচিত হয়েছিল মক্কা বিজয়ের মূল প্রেক্ষাপট।
ইমাম ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন,

كَانَتْ صُلْحُ الْحُدَيْبِيَةِ مُقَدِّمَةً وَتَوْطِئَةً بَيْنَ يَدَيْ هَذَا الْفَتْحِ الْعَظِيمِ، اَمِنَ النَّاسُ بِهِ وَكَلَّمَ بَعْضُهُمْ بَعْضًا وَنَاظَرَهُ فِي الْاِسْلَامِ وَتَمَكَّنَ مَنِ اخْتَفَى مِنَ الْمُسْلِمِينَ بِمَكَّةَ مِنْ اِظْهَارِ دِينِهِ، وَالدَّعْوَةِ اِلَيْهِ، وَالْمُنَاظَرَةِ عَلَيْهِ، وَدَخَلَ بِسَبَبِهِ بَشَرٌ كَثِيرٌ فِي الْاِسْلَامِ، وَلِهَذَا سَمَّاهُ اللهُ فَتْحًا فِي قَوْلِهِ: {اِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُبِينًا} 

হুদাইবিয়ার সন্ধি মূলতঃ ছিল মহান মক্কা বিজয়ের ভূমিকা। এ সন্ধির মাধ্যমে মানুষের জান-মালে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়। কাফের-মুসলমান পারস্পরিক মতবিনিময় ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি হয়। মক্কায় আত্মগোপনে থাকা মুসলমানরা পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা লাভ করে। ব্যাপকভাবে মানুষ ইসলামে প্রবেশ করতে থাকে। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা এ সন্ধি চুক্তিকে ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ আখ্যায়িত করেছেন’। (যাদুল মা‘আদ, ৩:৩৬৯)

তবে হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর প্রাথমিক পর্যায়ে বাহ্য দৃষ্টিতে তা নীতিগত পরাজয় মনে হওয়ায় সাহাবায়ে কেরামের জন্যও তা মেনে নেওয়া কষ্টকর ছিলো। 

বীর সাহাবী হযরত উমর ফারুক রা. নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে অনুযোগ করে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমরা সত্যের উপর আর কাফেররা মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত, এ কথা কি সঠিক নয়? নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই সঠিক! হযরত উমর রা. পুনরায় জিজ্ঞাস করলেন, আমাদের শহীদরা জান্নাতী আর তাদের মৃতরা জাহান্নামী, এ বিশ্বাসও কি নির্ভুল নয়? নবীজী বললেন, হ্যাঁ অবশ্যই! এরপর উমর রা. বললেন, তবে কেন আমরা আমাদের  দ্বীনের ক্ষেত্রে এমন পরাজয়মূলক শর্ত মেনে নেব? নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 

«يَا ابْنَ الْخَطَّابِ، اِنِّي رَسُولُ اللهِ وَلَنْ يُضَيِّعَنِي اللهُ اَبَدًا»،

‘হে খাত্তাবের পুত্র! নিশ্চয় আমি আল্লাহর রাসূল! কাজেই আল্লাহ তা‘আলা কখনোই আমাকে ধ্বংস করবেন না!...

এরপর যখন উপরোক্ত আয়াত সহ সূরা ফাত্হ অবতীর্ণ হলো, তখন উমর রা. তা শুনে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, ‘সত্যিই কি এ পরাজয় বিজয়ে রূপান্তরিত হবে? নবীজী বললেন, “হ্যাঁ”। উমর রা. সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন।’ (মুসলিম শরীফ, হা. নং ১৭৮৫)

পরবর্তীতে সকল সাহাবায়ে কেরামই বুঝতে পেরেছিলেন যে, মক্কা বিজয়ের পটভূমি রচিত হয়েছে এই হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তি থেকেই। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা. বলেন,

اِنَّكُمْ تَعُدُّونَ الْفَتْحَ فَتْحَ مَكَّةَ، وَنَحْنُ نَعُدُّ الْفَتْحَ صُلْحَ الْحُدَيْبِيَةِ.

‘তোমরা ফাতহে মক্কাকে ফাত্হ (বিজয়) মনে কর, অথচ আমরা (সাহাবায়ে কেরাম) তো হুদাইবিয়ার সন্ধিকেই ফাত্হ মনে করতাম। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা ফাতহ, আয়াত:১)

পরাজয় যেভাবে বিজয়ে রূপান্তরিত হলো

হুদাইবিয়ার সন্ধি মুসলমানদের জন্য বাহ্যিকভাবে যদিও পরাজয়মূলক ছিল, কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে তাতে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য চূড়ান্ত বিজয় তথা মক্কা বিজয়ের প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল। মুফাক্কিরে ইসলাম সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. তার “আস সীরাতুন্নববিয়্যাহ” গ্রন্থে হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তির মাধ্যমে ইসলামের চূড়ান্ত বিজয়ের প্রেক্ষাপট রচনার বিশদ বিবরণ উদ্ধৃত করেছেন। যার কয়েকটি নিম্নরুপ:

১. নবশক্তির উত্থান:

এ চুক্তির মাধ্যমে ইসলাম ‘জাযীরাতুল আরবে’ এক নবশক্তিরূপে এমনভাবে আবির্ভূত হলো যে, সমগ্র আরব তাদের শক্তির স্বীকৃতি দিয়ে সন্ধি করতে বাধ্য হয়েছিল। 
২. যুদ্ধবিরতী:

এ চুক্তির মাধ্যমে সশস্ত্র দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ধারা বন্ধ হয়ে গেলো। মুসলমানরা নিশ্চিন্তে-নির্বিঘ্নে ইসলামের প্রচার প্রসারে আত্ননিয়োগের উন্মুক্ত সুযোগ পেয়ে গেলো। 

৩. বিশ্ব দরবারে ইসলাম:

হুদাইবিয়া সন্ধি চুক্তির পরই নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পারস্য, রোম সহ বিভিন্ন সম্রাজ্যের বাদশাহর নিকট ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত পত্র প্রেরণ করেন। 

৪. মক্কার দূর্বল মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা লাভ:

মক্কার যে সকল মুসলমান কোন অপারগতা বশত হিজরত করতে না পারার দরুণ অসহায়ত্বের জীবন অতিবাহিত করছিলো, এই সন্ধি চুক্তির মাধ্যমে তারা পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা লাভ করলো।

৫. ইসলামের সৌন্দর্যের প্রচার-প্রসার:

সন্ধি চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেলে কাফেররা ইসলামের সৌন্দর্য কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়ে গেলো। ফলে ইসলামের নির্মল আলোয় তাদের হৃদয়াকাশ থেকে কুফর-শিরকের অন্ধকার দূর হয়ে যেতে লাগলো। এভাবে মক্কা বিজয়ের আগেই তারা ব্যাপকভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে লাগলো। 

ইমাম যুহরী রহ. বলেন, “হুদাইবিয়ার সন্ধি পরবর্তী দু’বছরে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা পূর্ববর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যার তুলনায় বেশি ছিল!” ইবনে হিশাম রহ. বলেন, “ইমাম যুহরীর এ কথার প্রমাণ হলো, হুদাইবিয়া সন্ধির সময় মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪০০। আর মাত্র দু’বছরের ব্যবধানে মক্কা বিজয়ের সময় মুসলমানদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১০,০০০ (দশ হাজার)!”

৬. খালেদ ইবনে ওলীদ রা. এর ইসলাম গ্রহণ:

হুদাইবিয়ার সন্ধির ফলে ইসলাম গ্রহণকারী এ সকল নও মুসলিমের মধ্যে ‘আল্লাহর তরবারী’ খ্যাত হযরত খালেদ ইবনুল ওয়ালীদ রা. ও ছিলেন। যে তরবারী ইসলামের পক্ষে কখনো কোনো ময়দানে পরাজিত হয়নি! (আল ইসাবাহ, ২:২১৫; সীরাতে ইবনে হিশাম, ৩:৩৩৭)

মক্কা বিজয়ের বাহ্যিক প্রেক্ষাপট: কুরাইশ কর্তৃক হুদাইবিয়া সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ

মক্কা বিজয়ের মূল প্রেক্ষাপট হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে রচিত হলেও মক্কা অভিমুখে সশস্ত্র অভিযান পরিচালনার জন্য একটি তাৎক্ষণিক উপলক্ষের প্রয়োজন ছিল। কুরাইশ কর্তৃক সন্ধি চুক্তি ভঙ্গের মাধ্যমে তা পূর্ণতা লাভ করে।

আল্লামা আইনী রহ. ফাতহে মক্কার এই বাহ্যিক প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে বলেন, ‘মক্কার কুরাইশরা হুদাইবিয়ায় নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের  সাথে কৃত সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করেছিলো। এ খবর নবীজীর কাছে পৌঁছলে নবীজী মক্কা অভিমূখে অভিযান পরিচালনা করেন। (উমদাতুল কারী, ১২:২৬০)

হুদাইবিয়ার যুদ্ধ বিরতির চুক্তি অনুযায়ী কুরাইশদের জন্য মুসলমানদের সাথে কিংবা তাদের কোনো মিত্র গোত্রের সাথে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়া নিষিদ্ধ ছিলো। কিন্তু কুরাইশরা এ চুক্তি লঙ্ঘন করে ফেলে...।

হযরত ইকরামা রহ. বলেন, ‘হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তির পর আরব গোত্র সমূহের মধ্য হতে বনু খুজাআ মুসলমানদের সাথে এবং বনু বকর কুরাইশদের সাথে মৈত্রি চুক্তিতে আবদ্ধ হলো। বনু বকর আর বনু খুজাআর মধ্যে জাহিলী যামানা হতে সশস্ত্র দ্বন্দ্ব-সংঘাত অব্যাহত ছিল। বনু বকর কুরাইশদের সহযোগিতায় পূর্ব শত্রুতার পরিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর হলো। কুরাইশরাও তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করলো।’

ইবনে ইসহাক রহ. বলেন, বনু বকরের সরদার নওফেল ইবনে মু‘আবিয়ার  নেতৃত্বে ‘ওতীর’ নামক এক জলাশয়ের নিকট তারা বনু খুজাআর উপর হামলা করলো। বনু খুজাআ ‘হারামের সীমানায় আশ্রয় নিলেও বনু বকর হারামের নিষিদ্ধতা উপেক্ষা করে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে গেলো।

ইবন সাদ রহ. বলেন, কুরাইশদের মধ্য হতে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়্যা, হুয়াইতিব ইবনে আব্দুল উয্যা, মিকরাজ ইবনে হাফস প্রমূখ কাফের রণাঙ্গনে বনু বকরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অবতীর্ণ হলো। ইমামে মাগাযী, মূসা ইবনে উকবা কুরাইশদের মধ্য হতে শাইবা ইবনে উসমান ও সাহল ইবনে আমর এর নামও উল্লেখ করেছেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হা. নং ৩৮০৫৭; তাবাকাতে ইবনে সা‘আদ, ২:৩১৬)

নবীজীর দরবারে বনু খুজাআর ফরিয়াদ

লড়াই শেষ হলে বনু খুজাআর একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় নবীজীর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আগমন করলো। ইবনে সা‘দ রহ. এ প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে আমর ইবনে সালেম এর নাম উল্লেখ করেছেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হা. নং ৩৮০৫৭; তাবাকাতে ইবনে সা‘আদ, ২:৩১৭)

আমর ইবনে সালেম, বনু বকরের লড়াই এবং কুরাইশদের সহযোগিতা ও তাদের সন্ধি ভঙ্গের কথা দীর্ঘ এক কবিতায় আবেগঘন ভাষায় উপস্থাপন করেন। ‘মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা’র উল্লিখিত বর্ণনায় উদ্ধৃত সে কবিতাসমূহের দুটি পংক্তি নিম্নরূপ..

يَا رَبُّ اِنِّي نَاشِدٌ مُحَمَّدًا حِلْفَ اَبِينَا وَاَبِيهِ الْاَتْلَدَا
فَانْصُرْ هَدَاكَ اللهُ نَصْرًااَيَّدَا وَادْعُ عِبَادَ اللهِ يَاْتُوا مَدَدًا

 ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সেই মৈত্রি চুক্তি স্বরণ করিয়ে দিচ্ছি, যা সম্পাদিত হয়েছিল আমাদের এবং তার পূর্ব পুরুষদের মাঝে। 

(হে আল্লাহর রাসূল!) আমাদের সাহায্য করুন। এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে আহবান করুন, যাতে তারা সাহায্যের জন্য উপস্থিত হয়।’

ইবনে ইসহাক রহ. বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ফরিয়াদ শুনে বললেন,

نصرتياعمروبنسالم

হে আমর ইবনে সালেম! তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করা হবে। (ফাতহুল বারী, ৭:৬৩৫)

সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, এরপর নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যামুরা রা. কে পত্র বাহক হিসেবে মক্কার কুরাইশদের নিকট এ মর্মে সংবাদ প্রেরণ করেন যে, তারা যেন তিনটি প্রস্তাবের কোনো একটি গ্রহণ করে নেয়,

১. বনু খুজাআর নিহত ব্যক্তিদের রক্তপণ আদায় করে দিবে।

২. অথবা বনু বকরের সাথে কৃত মৈত্রি চুক্তি ভঙ্গ করে পৃথক হয়ে যাবে।

৩. কিংবা হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তি ভঙ্গের প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে দিবে।

পত্রবাহক যখন সংবাদ নিয়ে মক্কায় পৌঁছলো, তখন কুরাইশদের পক্ষ হতে কুরতা ইবনে আমর এ জবাব পাঠালো যে, আমরা হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তি ভঙ্গের জন্য তৈরি আছি। জবাব নিয়ে দূত রওয়ান হয়ে যাওয়ার পরক্ষণেই তাদের বোধদয় হলো এবং হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তি নবায়নের জন্য তারা আবু সুফিয়ানকে মদীনায় প্রেরণ করলো। (ফাতহুল বারী, ৭:৬৪২)

কুরাইশদের সন্ধি নবায়ন প্রচেষ্টা

আবু সুফিয়ান মদীনায় এসে উপস্থিত হলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে বললেন,

قَدْ جَاءَكُمْ اَبُو سُفْيَانَ وَسَيَرْجِعُ رَاضِيًا بِغَيْرِ حَاجَتِهِ

‘তোমাদের নিকট আবু সুফিয়ান এসে উপস্থিত হচ্ছে। আর সে তাঁর উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হয়েই ফিরে যাবে’। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হা. নং ৩৮০৫৭)

নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা !

আবু সুফিয়ান মদীনায় পৌছে প্রথমত তার কন্যা নবীজীর বিবি উম্মে হাবীবা রা. এর কাছে গেলেন। 

উম্মে হাবীবা রা. এর নাম হলো ‘রমলা’। মদীনায় হিজরতের আগে যখন মুসলমানরা হাবশায় হিজরত করেছিলেন তখন তাদের মধ্যে উম্মে হাবীবাও ছিলেন। হাবশায় থাকা অবস্থায় নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিবাহের প্রস্তাব পাঠান। হাবশার বাদশাহ ‘নাজাশী’ চারশত দীনারের মহর নিজের পক্ষ হতে আদায় করে দিয়ে উম্মে হাবীবা রা.কে নবীজীর সাথে বিয়ে দেন। (যাদুল মা‘আদ, ১:১০৬)

আবু সুফিয়ান যখন উম্মে হাবীবার কাছে পৌঁছলেন, তখন উম্মে হাবীবা রা. পিতাকে দেখে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিছানা উঠিয়ে ফেললেন, যাতে পিতা নবীজীর বিছানায় বসতে না পারে। আবু সুফিয়ান কন্যার এ আচরণ দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, হে কন্যা! তুমি এ বিছানা কেন উঠিয়ে রাখলে? এ বিছানাকে আমার যোগ্য মনে করো না, নাকি আমাকে এ বিছানার যোগ্য মনে করো না? উম্মে হাবীবা রা.বললেন,

هُوَ فِرَاشِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاَنْتَ مُشْرِكٌ نَجِسٌ، فَلَمْ أُحِبَّ اَنْ تَجْلِسَ عَلَى فِرَاشِهِ،

‘এটা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিছানা। আপনি তো মুশরিক, আর মুশরিক তো নাপাক হয়ে থাকে। কাজেই নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিছানার উপর কোনো নাপাক ব্যাক্তি বসবে এটা আমি কখনোই পছন্দ করবো না।’

আবু সুফিয়ান বললো, হে আমার মেয়ে! সত্যিই আমার থেকে বিচ্ছেদের পর তোমার মাঝে অনেক বিরূপ পরিবর্তন ঘটেছে!’

এরপর আবু সুফিয়ান নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়ে সন্ধি নবায়নের দাবি জানালেন। নবীজী কোনো জবাব দিলেন না। (যাদুল মা‘আদ, ৩:৩৫০) 

আবু সুফিয়ান, দরবারে নববী থেকে ব্যর্থ হয়ে একে একে আবু বকর রা. উমর রা. এর কাছে গেলেন। কিন্তু কেউই এ ব্যপারে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সুপারিশ করতে সম্মত হলেন না। পরিশেষে হযরত আলী রা. এর পরামর্শে এককভাবে মসজিদে নববীতে সন্ধি নবায়নের ঘোষণা দিয়ে মক্কায় চলে এলেন। কুরাইশরা আবু সুফিয়ানের আগমণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলো। যখন তারা জানতে পারলো যে, আবু সুফিয়ান, নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবার থেকে সন্ধি নবায়নের কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই কেবল এককভাবে ঘোষণা দিয়ে চলে এসেছে, তখন তাকে অভিসম্পাত করে বললো,

وَاللّٰهِ مَا رَاَيْنَا كَالْيَوْمِ وَافِدَ قَوْمٍ , وَاللّٰهِ مَا اَتَيْتَنَا بِحَرْبٍ فَنَحْذَرَ , وَلَا اَتَيْتَنَا بِصُلْحٍ فَنَاْمَنَ

খোদার কসম! তোমার মত নির্বোধ কোনো প্রতিনিধি আমরা আগে কখনো দেখিনি। আল্লাহর শপথ! তুমি না যুদ্ধের সংবাদ নিয়ে এসেছো যে, আমরা তার প্রস্তুতি নিতে পারি। আর না সন্ধির সুসংবাদ নিয়ে এসেছো যে, আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারি! (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হা. নং ৩৮০৫৭)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য

//