Subscribe Us

header ads

রাসূল সা. এর জীবনি (পর্ব - ১১) খায়বার বিজয়ের পর মুসলিমদের সচ্ছলতা লাভ

খায়বার বিজয়ের পর মুসলিমদের সচ্ছলতা লাভ

খায়বার বিজয়ের পর গরিব মুসলিমদের জীবন-জীবিকায় সচ্ছলতা চলে আসে। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে সূরা ফাতহে গনীমত প্রদানের যে ওয়াদা করেছিলেন তা পূর্ণ করে দেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. বলেন,
لَمَّافُتِحَتْخَيْبَرُقُلْنَااَلْاَنَنَشْبَعُمِنَالتَّمْرِ

খায়বার বিজয়ের পর আমাদের জন্য খেজুর দ্বারা পরিতৃপ্ত হওয়ার সুযোগ হয়ে গেল। (বুখারী, হা.নং ৪২৪২)

আনসারদের প্রদত্ত বাগান ও শষ্যক্ষেত ফেরত প্রদান

হিজরতের পর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাজির ও আনসারদের ভ্রাতৃত্ব-বন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছিলেন। নিঃস্ব মুহাজির সাহাবায়েকেরামের জীবন-জীবিকার নিমিত্তে আনসাররা নিজেদের শস্যক্ষেত ও বাগানের বাৎসরিক উৎপাদিত ফসলে তাদের শরীক করে নিয়েছিলেন।
আনসারী সাহাবী হযরত আনাস রা. এর মাতা উম্মে সুলাইম রা. তার একটি খেজুর বাগান মুহাজির সাহাবীয়া হযরত উম্মে আইমান রা. কে দিয়েছিলেন। খায়বার বিজয়ের পর যখন মুহাজির সাহাবীরাও সচ্ছল হয়ে গেলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের বাগানসমূহ ফেরত দিয়ে দিলেন তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সুলাইম এর বাগানও তাকে ফেরত দিয়ে দিলেন। এবং উম্মে আইমানকে সন্তুষ্ট করার নিমিত্তে তাকে নিজের একটি বাগানও দিয়ে দিলেন। (বুখারী, হা.নং ২৬৩০; সীরাতে মুস্তফা, ২:৪২৩)

গনিমতের সম্পদ বণ্টন

হুদায়বিয়ার ঘটনায় যেসকল সাহাবা শরীক ছিলেন কেবল তাদেরই খায়বার যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি ছিল। খায়বারযুদ্ধের গনীমত কেবল তাদের মাঝেই বণ্টন করা হয়। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪:২২০)
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, জিহাদে জয় লাভের পর গনিমতের সম্পদ বণ্টনকালে আমি উপস্থিত হলে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো আমাকে বঞ্চিত করেননি। তবে খায়বার যুদ্ধ এর ব্যতিক্রম ছিল। কেননা, এ যুদ্ধের গনীমত কেবল আহলে হুদায়বিয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল। (মুসনাদে আহমাদ, হা.নং ১০৯১২)
এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবান ইবনে সায়িদ ও তার সাথীদের, যারা খায়বারযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি, তাদের চাওয়ার পরও কোন অংশ দেননি। (বুখারী, হা.নং ৪২৯৮)

বণ্টন পদ্ধতি:

নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম গনীমত হিসেবে প্রাপ্ত খায়বারের সমস্ত ফসলি জমিন মুজাহিদদের মাঝে বণ্টন করেননি; বরং এসব জমিনের অর্ধেক তিনি মুজাহিদদের মাঝে বণ্টন করেন। বাকি অর্ধেক সাধারণ মুসলিমদের নাগরিক-সুবিধা পূরণের নিমিত্তে রাষ্ট্রায়ত্ত করে রাখেন। 
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাতিবা, ওয়াতিহ ও সুলালিম নামক স্থানগুলোর জমিনসমূহ রাষ্ট্রায়ত্ত করে রাখেন। আর শাক, নিতাহ ও তার পার্শ্ববর্তী জমিনগুলো বণ্টন করে দেন। বণ্টনের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জমিনগুলো মোট আঠারো ভাগ করেন। অতঃপর প্রত্যেক অংশ একশত ভাগ করেন। (আবু দাউদ, হা.নং ৩০১০-৩০১৫)
এরপর এ আঠারোশত অংশ সকল মুজাহিদের মাঝে কীভাবে বণ্টন করা হলো, এ ব্যাপারে একাধিক মত রয়েছে।
কারো মতে, মুসলিমদের সৈন্যসংখ্যা ছিল ১৪০০। তার মধ্যে ১২০০ পদাতিক এবং ২০০ অশ্বারোহী। প্রত্যেক পদাতিককে এক অংশ এবং প্রত্যেক অশ্বারোহীকে তিন অংশ করে দেওয়া হয়। 
আর কারো মতে, মুসলিমদের সৈন্যসংখ্যা ছিল ১৫০০। তার মধ্যে ১২০০ পদাতিক আর ৩০০ আশ্বারোহী। প্রত্যেক পদাতিককে এক অংশ এবং প্রত্যেক অশ্বারোহীকে দুই অংশ করে দেওয়া হয়েছে। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪:২১৮-২২০; সীরাতে মুস্তফা, ২:৪২১-৪২২)

‘ফাদাক’ বিজয়

ফাদাক মদীনা হতে দু’দিনের দূরত্বে খায়বারের নিকটবর্তী একটি জনপদের নাম। (মুজামুল বুলদান, ২:২৭০)
ফাদাকের ইহুদীরা যখন জানতে পারলো নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার জয় করে নিয়েছেন তখন তারা কোন প্রকার যুদ্ধে না জড়িয়ে মুহায়িসাহ ইবনে মাসউদের মধ্যস্থতায় সন্ধির প্রস্তাব দিয়ে পাঠালো। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথেও খায়বারের ইহুদীদের ন্যায় বাৎসরিক অর্ধেক ফসল প্রদান করার শর্তে সন্ধি প্রস্তাব মেনে নিলেন। এবং বললেন, ‘যখন ইচ্ছা আমরা তোমাদের এবং খায়বারবাসীদের এখান থেকে বের করে দেব।’ (সীরাতে ইবনে হিশাম)
হাফেয ইবনে কাসীর রহ. বলেন, খায়বার যুদ্ধের গনীমত থেকে প্রাপ্ত নির্ধারিত অংশ, ফাদাক (সম্পূর্ণরূপে) এবং মদীনা হতে বহিষ্কৃত ইহুদী গোত্র বনু কুরাইযার রেখে যাওয়া সম্পত্তি ছিল নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের একক মালিকানা। অন্যান্য মুসলমানের তাতে কোন অংশ ছিল না। কেননা, ফাদাক ও বনু কুরাইযার সম্পদ মুসলিমরা যুদ্ধ করে জয় করেনি বরং আল্লাহ তা‘আলা বিনা যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা দিয়েছিলেন। এসব সম্পদ থেকেই নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মুল মুমিনীনকে বাৎসরিক ব্যয়ভার বহন করতেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪:২২০)

‘ওয়াদিয়ে কুরা’ বিজয়

‘ওয়াদিয়ে কুরা’ সিরিয়া ও মদীনার মধ্যবর্তী বহু জনপদ বিশিষ্ট একটি এলাকা। (মুজামুল বুলদান, ৫:৩৯৭)
হাফেয ইবনে কাসীর রহ. ইমাম ওয়াকিদী ও ইবনে ইসহাক রহ. থেকে বর্ণনা করেন, ফাদাক বিজয়ের পর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াদিয়ে কুরার দিকে যাত্রা করেন। ওয়াদিয়ে কুরার লোকেরা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা পরাজয় তাদের ভাগ্যে লিখে রেখেছিলেন। এ যুদ্ধে তাদের এগারজন লোক নিহত হলো। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারদিন ওয়াদিয়ে কুরায় অবস্থান করে গনিমতের সম্পদ সাহাবীদের মাঝে বণ্টন করেন। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় চলে আসেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪:২৩৬; সীরাতে মুস্তফা, ২:৪৩৬)

অন্যের সম্পদে খেয়ানতের মন্দ পরিণতি

হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন যে, ওয়াদিয়ে কুরায় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এক গোলাম ছিল, যার নাম ছিল ‘মিদআম’। যুবাইব গোত্রের ‘রিফাআ’ নামক এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ গোলাম হাদিয়া দিয়েছিলেন। অজানা কোন শত্রুর তীরের আঘাতে এ গোলাম নিহত হয়। সাহাবীরা তাকে শহীদ ঘোষণা করলে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা প্রত্যাখ্যান করে বললেন,
بل والذى نفسى بيده ان الشملة التى اصابها يوم خيبر من المغانم لم تصبها المقاسم لتشتعل عليه نارا
(না, সে শহীদ নয়!) বরং শপথ ঐ সত্তার, যার হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয় গনিমতের সম্পদ বণ্টনের পূর্বেই যে শামলা (আলখেল্লার মতো ঢিলা পোশাক) সে খেয়ানত করেছিল তার কারণে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে। [সূত্র: গনীমতের সম্পদ বন্টনের পূর্বে সকল মুসলমানের হক। কাজেই বন্টনের পূর্বে আমীরের অনুমতি ছাড়া তার কোন অংশ নেয়া খেয়ানত] (বুখারী শরীফ, হা.নং ৬৭০৭)

ইহুদী ষড়যন্ত্রের আরেক পর্ব

কুরআন মজীদে আল্লাহ তা‘আলা মুসলিমদের সর্বাধিক কঠিন শত্রু হিসেবে ইহুদীদের কথা উল্লেখ করেছেন। ইতিহাসও এ সত্যতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। 
খায়বারের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইহুদী সাল্লাম ইবনে মিশকামের স্ত্রী যায়নাব বিনতে হারিস কোন এক কৌশলে বিষ মিশ্রিত বকরির গোশত নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হাদিয়া হিসেবে পেশ করলো। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা মুখে দেওয়ামাত্র গোশতই তাকে বিষ মেশানোর কথা বলে দিল। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে সাথে নিবৃত্ত হলেন। ইতোমধ্যে সঙ্গী সাহাবী হযরত বিশর ইবনে বারা রা. তা গলাধঃকরণ করে ফেলেছিলেন। 
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদী মহিলাটিকে ডেকে বিষ দেওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে সে বললো, ‘আপনি সত্য নবী কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য বিষ দিয়েছিলাম। কেননা, যদি আপনি সত্য নবী হন, তবে বিষ আপনার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর যদি মিথ্যাবাদী হন তবে আমরা আপনার থেকে নাজাত পাবো!’
ইমাম যুহরী রহ. বলেন, এরপর এই ইহুদী নারী ইসলাম গ্রহণ করলো। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু কারো থেকে ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না, তাই নিজের ব্যাপারে তাকে মাফ করে দিলেন। কিন্তু সঙ্গী সাহাবী বিশর উক্ত বিষক্রিয়ায় মারা যাওয়ায় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই নারীকে কিসাসরূপে হত্যা করার নির্দেশ প্রদান করলেন। এ ঘটনায় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষক্রিয়ায় কিছুটা আক্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে চিকিৎসাস্বরূপ তিনি সিংগা লাগান। এর পরেও জীবনসায়াহ্নে যখন মৃত্যুরোগে আক্রান্ত হন, তখনও তিনি নিজের মাঝে উক্ত বিষক্রিয়া অনুভব করেছিলেন। (আবু দাউদ, ৪৫১১, ৪৫১২; আসসুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, ১৬০০৭, ১৬০১; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪:২২৭-৪২৮; সীরাতে মুস্তফা, ২:৪১৯)

খায়বারযুদ্ধের কয়েকটি শিক্ষণীয় ঘটনাঃ শহীদ নাকি জাহান্নামী

হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন যে, (খায়বারযুদ্ধে) মুসলিমরা যখন কাফেরদের মুখোমুখি হলো তখন মুসলিমদের পক্ষ হতে এক ব্যক্তি বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে চললো। যে কাফেরই তার সামনে আসছিল সেই তার তরবারির আঘাতে লুটিয়ে পড়ছিল। সাহাবীরা তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম (ওহীর মাধ্যমে অবগত হয়ে) বললেন, ‘এই ব্যক্তি জাহান্নামী।’
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হলো। আকসাম ইবনে আবুল জুন নামক এক সাহাবী উক্ত ব্যক্তিকে জখমের তীব্রতায় অস্থির হয়ে আত্মহত্যা করতে দেখতে পেলেন। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ঘটনা শুনে বললেন,
يَا بِلاَلُ، قُمْ فَاَذِّنْ : لاَ يَدْخُلُ الجَنَّةَ اِلاَ مُؤْمِنٌ، وَاِنَّ اللهَ لَيُؤَيِّدُ هَذَا الدِّينَ بِالرَّجُلِ الفَاجِرِ
হে বিলাল, দাঁড়াও! ঘোষণা করে দাও! জান্নাতে কেবল মুমিন বান্দাদেরই প্রবেশাধিকার থাকবে। নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ‘ফাজের’ (গুনাহগার) ব্যক্তির মাধ্যমেও তার দীনের সাহায্য নিয়ে থাকেন। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৬৬০৬; সহী ইবনে হিব্বান, ৪৫১৯)

হাফেয ইবনে হাজার রহ. এ হাদীসের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে তীন রহ. এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন, ‘আত্মহত্যাকারী ঈমানদারের জাহান্নামী হওয়ার অর্থ হলো, যদি আল্লাহ তা‘আলা তার আত্মহত্যার এ অপরাধ ক্ষমা না করেন তবে সে (নির্দিষ্ট সময়ের জন্য) জাহান্নামী হবে। অথবা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জাহান্নামী বলার কারণ হলো, আত্মহত্যাকে সে গুনাহ মনে করেনি; বরং বৈধ মনে করে সে এতে লিপ্ত হয়েছিল এবং (একটি হারামকে হালাল তথা বৈধ মনে করার কারণে) মৃত্যুর পূর্বে সে বেঈমান হয়ে গিয়েছিল। কাজেই সে চিরকালের জন্য জাহান্নামী হবে। (ফাতহুল বারী, ৭:৫৮৩-৫৮৬)
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদীসের পেরিপ্রেক্ষিতে আলেমগণ বলেন, দীনের কাজ করতে পারাই কারো জন্য ঈমানদার এবং জান্নাতী হওয়ার দলীল নয়। কেননা, আল্লাহ তা‘আলা তো ফাসেক এবং কাফের ব্যক্তির মাধ্যমেও দীনের কাজ নিয়ে থাকেন। ইহুদীর সহযোগিতায় দুর্গ বিজয়ের ঘটনা এর সুস্পষ্ট দলীল। কাজেই দীনের কাজ করতে পারলে শুকরিয়া আদায় করা এবং সাথে সাথে নিজের ঈমান, ইখলাস ও আমলের শুদ্ধতার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া চাই। (কাশফুল বারী; খায়বার যুদ্ধ অধ্যায়)

জান্নাতের ধনভাণ্ডার

খায়বারযুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনকালে এক উপত্যকায় পৌঁছলে সাহাবীরা উচ্চঃস্বরে আল্লাহু আকবার বলতে লাগলেন। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা শুনে বললেন,
يَا اَيُّهَا النَّاسُ ارْبَعُوا عَلَى اَنْفُسِكُمْ، فَاِنَّكُمْ لاَ تَدْعُونَ اَصَمَّ وَلاَ غَائِبًا، اِنَّهُ مَعَكُمْ اِنَّهُ سَمِيعٌ قَرِيبٌ، تَبَارَكَ اسْمُهُ وَتَعَالَى جَدُّهُ
তোমরা নিজেদের উপর রহম কর। (এত উচ্চঃস্বরে তাকবির বলো না) নিশ্চয় তোমরা যে সত্তাকে ডেকে থাকো, তিনি বধির কিংবা অনুপস্থিত নন। বরং তিনি তো তোমাদের নিকটেই আছেন। এবং তিনি সবকিছু শুনেন।
এরপর নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু মুসা আশআরী রা. কে
لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ اِلاَ بِاللهِ
পড়তে শুনে বললেন,
يَا عَبْدَ اللهِ بْنَ قَيْسٍ : اَلا اَدُلُّكَ عَلَى كَنْزٍ مِنْ كُنُوزِ الْجَنَّةِ
হে আবদুল্লাহ ইবনে কায়েস, আমি তোমাকে জান্নাতের একটি ধনভাণ্ডারের কথা বলে দিব কি?
আবু মুসা আশআরী রা. জবাবে বললেন, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল, আপনার উপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গিত হোক! নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (জান্নাতের একটি ধনভাণ্ডার হলো)
قُلْ : لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ اِلاَ بِاللهِ
তুমি বলো,
 لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ اِلاَ بِاللهِ 
(আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ ছাড়া বান্দার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকারও কোন ক্ষমতা নেই, নেকির কাজ করারও কোন শক্তি নেই।) (মুসলিম, হাদীস নং ২৭০৪; বুখারী, হা. নং ২৯৯২)

ঈমানের মূল্য

হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. এর সূত্রে এক বর্ণনায় রয়েছে, খায়বার যুদ্ধে সাহাবায়ে কেরাম এক বকরি চালক রাখালকে ধরে নিয়ে এলো। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলে লোকটা মুসলমান হয়ে গেল এবং সাহাবী হওয়ার মর্যাদা লাভ করলো! ইসলাম গ্রহণের পরমুহূর্তেই রণাঙ্গনের যুদ্ধসারিতে গিয়ে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়লো। যুদ্ধ করতে করতে একটি তীরের আঘাতে এই নবীন সাহাবী শাহাদাত বরণ করলেন। অথচ ইসলাম গ্রহণের পর তার একটি সেজদা করারও সুযোগও হয়নি! শুধু ঈমানের বদৌলতে আল্লাহ তা‘আলা তাকে এমন সম্মানিত করলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের একটি জুব্বা দ্বারা কাফন দিলেন এবং বললেন, 
لَقَدْ حَسُنَ اِسْلَامُ صَاحِبِكُمْ، لَقَدْ دَخَلْتُ عَلَيْهِ وَاِنَّ عِنْدَهُ لَزَوْجَتَيْنِ لَهُ مِنَ الْحُورِ الْعِينِ
তোমাদের এ নবীন সাথীর ইসলাম উত্তম হয়েছে। আমি তার কাছে প্রবেশ করে দেখতে পেলাম, তাকে দুজন হুর স্ত্রী দেওয়া হয়েছে। (দালায়িলুন নুবুওয়াহ লিল বায়হাকী, ২:২২০)

খায়বারযুদ্ধে নাযিলকৃত হুকুম-আহকাম

১. এ যুদ্ধে গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়ার নিষেধাজ্ঞা এবং ঘোড়ার গোশত খাওয়ার অবকাশের হুকুম অবতীর্ণ হয়। (তবে অন্যান্য হাদীসের পরিপ্রেক্ষিতে ঘোড়ার গোশত খাওয়ার বৈধতার ব্যাপারে ফকিহদের মতবিরোধ রয়েছে।) (বুখারী শরীফ, হা.নং ৪২১৯)
২. এ যুদ্ধেই “মুত‘আ বিবাহ” (নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তি করে বিবাহ) সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করা হয়। (বুখারী শরীফ, হা.নং ৫১১৫)
৩. হারাম তথা সম্মানিত মাসসমূহে (জিলকদ, জিলহজ্জ, মুহাররম ও রজব) কাফেরদের সাথে জিহাদ করার বৈধতা অবতীর্ণ হয়। কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের খায়বার অভিযান হয়েছিল ‘সফর’ মাসে। 
৪. হিংস্র জীব-জন্তু এবং পাঞ্জা দ্বারা শিকার করে আহার করে, এমন শিকারি পাখির গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। (আবু দাউদ, হা. নং ৩৮০৫)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

//