Subscribe Us

header ads

সীরাতে ঈসা আ: (পর্ব: - ০১) কুরআন ও হাদীসে হযরত ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালাম

কুরআন ও হাদীসে হযরত ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালাম


باسمه تعالى

হযরত ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালাম ছিলেন উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন পয়গাম্বর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন সর্বশেষ নবী ও রাসূল, তেমনি হযরত ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালাম বনী ইসরাইলের মধ্যে সর্বশেষ নবী।

হযরত ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালামের আলোচনা কুরআনে কারীমের সর্বমোট তেরটি সূরায় করা হয়েছে। এগুলোর কোথাও তাকে ‘ঈসা নামে, কোথাও মাসীহ বা আবদুল্লাহ উপাধিতে, আবার কোথাও মারিয়াম-তনয় উপনামে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘ঈসা ‘আলাইহিস সালামের পর হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত কোন নবী বা রাসূল দুনিয়াতে আগমন করেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

اَنَا اَوْلَى النَّاسِ بِعِيْسَى بْنِ مَرْيَمَ لِاَنَّه لَمْ يَكُنْ بَيْنِىْ وَبَيْنَه نَبِىٌّ وَاِنَّه نَازِلٌ

আমি মারিয়াম তনয় ‘ঈসার অতি ঘনিষ্ট। কেননা, আমার ও তার মধ্যবর্তী সময়ে কোন নবীর আগমন ঘটেনি এবং তিনি (পরবর্তীকালে) পুনরায় দুনিয়াতে আগমন করবেন। (বুখারী, ৪:৩৪৩; মুসলিম, ২:১৮৯) 

হযরত ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালামের উচ্চমর্যাদা ও সুমহান ব্যক্তিত্বের নিদর্শন হলো, হযরত মুসা ‘আলাইহিস সালাম যেমন বনী ইসরাইলের মধ্য থেকে নবুওয়্যাত ও রিসালাতের ইমামতের মাকামে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তেমনি ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালাম ছিলেন নবুওয়্যাত ও রিসালাতের ক্ষেত্রে মুজাদ্দিদের ভূমিকায়। কেননা, তাওরাতের পর ইঞ্জিলের তুলনায় অধিক মর্যাদাসম্পন্ন কোন কিতাব অবতীর্ণ হয়নি। আর এটা বাস্তব সত্য যে, ইনজিল নাযিল হয়ে তাওরাতের বিধানাবলিকে পূর্ণতা দান করেছে। অর্থাৎ তাওরাত নাযিল হওয়ার পর ইহুদীরা দীনের মধ্যে যেসব গোমরাহী ও কুসংস্কারের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছিল, ইনজিল অবতীর্ণ হয়ে তাদের সেসব ভ্রান্তি হতে বেঁচে থাকার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এবং তাওরাতের পরিপূরক হিসেবে দায়িত্ব আনজাম দিয়েছে। আর মুসা ‘আলাইহিস সালামের হেদায়েতের বাণী, যা ইহুদীরা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল, ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালাম আগমন করে তাদের সেগুলোর ব্যাপারে সজাগ করেছিলেন।

তা ছাড়া হযরত ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালাম ছিলেন হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে সর্বশ্রেষ্ঠ ঘোষক ও সুসংবাদ প্রদানকারী। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, 

وَاِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِىْ اِسْرَائِٓيْلَ اِنِّىْ رَسُوْلُ اللّٰهِ اِلَيْكُمْ مُّصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَىَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُوْلٍ يَاْتِىْ مِن بَعْدِ اسْمُه اَحْمَدُ

(হে নবী, স্মরণ করুন,) যখন মারিয়াম তনয় ‘ঈসা বলেছিলেন, হে বনী ইসরাইল, আমি অবশ্যই তোমাদের নিকট প্রেরিত আল্লাহর রাসূল আর আমার পূর্ব থেকে তোমাদের নিকট যে তাওরাত রয়েছে তার প্রত্যায়নকারী এবং একজন রাসুলের আগমনের সুসংবাদদাতা, যিনি আমার পরে আসবেন, যার নাম হবে ‘আহমাদ’। (সূরা সফ, আয়াত:৬)

কুরআনে কারীমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীনের সাদৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে যেসকল মর্যাদাবান ব্যক্তির ‘আদর্শের আলোচনা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে হযরত ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম, হযরত মুসা ‘আলাইহিস সালাম এবং হযরত ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালাম উল্লেখযোগ্য। হযরত ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালামের ‘আদর্শের বর্ণনা এজন্য গুরুত্বপূর্ণ, হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ধর্মের প্রচার ও প্রসারের কেন্দ্রবিন্দু, তা ‘মিল্লাতে ইবরাহীম’ নামে অভিহিত। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,

مِّلَّةَ اَبِيْكُمْ اِبْرَاهِيْمَ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِميْنَ

ইসলাম তোমাদের পিতা ইবরাহীমের ধর্ম এবং তিনি তোমাদের মুসলমান নাম প্রদান করেছেন। (সূরা হজ্জ, আয়াত:৭৮)

তেমনি ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম হলেন সেই বয়োজ্যেষ্ঠ পয়গাম্বর, যিনি শিরকের মোকাবেলায় তাওহিদে ইলাহীকে হানিফী ধর্ম উপাধিতে ভূষিত করেছেন এবং পরবর্তীকালে যারা সত্যের অনুসারী হবে, তাদের জন্য মিল্লাতে হানীফা নামে বৈশিষ্ট্য কায়েম করেছেন। অর্থাৎ তিনি আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের ক্ষেত্রে এমন আদর্শ উপস্থাপন করেছেন, ভবিষ্যতে সত্য ধর্মের জন্য তার অনুসরণ মাপকাঠিরূপে গণ্য হয়ে গিয়েছে। আর আল্লাহ তা‘আলা তাকে এ পরিমাণ কবুল করেছিলেন যে, তিনি হেদায়েতের ইমাম হয়ে গিয়েছেন। এসম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, 

فَاتَّبِعُوْا مِلَّةَ اِبْرَاهِيْمَ حَنِيْفًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ

সুতরাং তোমরা একনিষ্ঠভাবে মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণ কর আর তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত:৯৫)
অনুরূপ হযরত মুসা ‘আলাইহিস সালামের আলোচনা এজন্য গুরুত্ব রাখে যে, স্বীয় জাতির মূর্খতা, নাফরমানী, আল্লাহর দুশমনদের পক্ষ হতে অগ্নিপরীক্ষা ও অবিরত দুঃখ-কষ্টের বিপরীতে তাঁর ধৈর্যধারণ উম্মতের জন্য আদর্শ হয়ে রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে মুসা ‘আলাইহিস সালাম ও নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে সামঞ্জস্য পাওয়া যায়।

উল্লিখিত বৈশিষ্টের কারণেই হযরত ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালামের জীবনীর আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যই পবিত্র কুরআনে তার জীবনী বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। আর এর ভূমিকাস্বরূপ তার মা হযরত মারিয়াম ও তার প্রতিপালনকারী হযরত যাকারিয়া এবং ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালামের আগমনের সুসংবাদদাতারূপে আগমনকারী হযরত ইয়াহইয়া ‘আলাইহিস সালামের কথা আলোচিত হয়েছে।

হযরত ইয়াহইয়া ‘আলাইহিস সালাম যে ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালামের আগমনের সুসংবাদদাতা ছিলেন, তার বর্ণনা কুরআনে এভাবে এসেছে, 

فَنَادَتْهُ الْمَلٰٓئِكَةُ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّىْ فِى الْمِحْرَابِ اَنَّ اللّٰهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحْيٰى مُصَدِّقًا بِكَلِمَةٍ مِّنَ اللّٰهِ وَسَيِّدًا وَحَصُوْرًا وَنَبِيًّا مِّنَ الصَّالِحِيْنَ○

ফেরেশতারা হযরত যাকারিয়া ‘আলাইহিস সালামকে সেসময় আহ্বান করলো যখন তিনি কুঠুরিতে নামাযরত ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে ইয়াহইয়ার সুসংবাদ দিচ্ছেন, যিনি আল্লাহর কালেমা ‘ঈসা সম্পর্কে সত্যায়ন করবেন। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত:৩৯)

উক্ত আয়াতে كلمة (কালেমা) শব্দ দ্বারা হযরত ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালাম উদ্দেশ্য। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহ. তার তাফসীরগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, জমহুর আলেমের মত অনুসারে كلمة (কালেমা) দ্বারা হযরত ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালাম উদ্দেশ্য। (তাফসীরে কাবীর, ৮:৩৫)  

হযরত ইয়াহইয়া ‘আলাইহিস সালামের জন্ম হযরত ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালামের আগেই হয়েছিলো। তবে তিনি ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালাম থেকে কতটুকু  বড় ছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।

পরবর্তীকালে ‘ঈসা ‘আলাইহিস সালামকে উঠিয়ে নেওয়ার আগে হযরত ইয়াহইয়া ‘আলাইহিস সালামকে অস্বীকারকারীরা শহীদ করে দেয়।

সূত্র:

قال ابن كثير: وهذا إسناد صحيح إلى سعيد بن المسيب وهو يقتضي أنه قتل بدمشق وأن قصة بخت نصر كانت بعد المسيح (2) كما قاله عطاء والحسن البصري فالله أعلم. البداية والنهاية ط إحياء التراث( 2/65)

তবে ইয়াহইয়া ‘আলাইহিস সালাম ও তার পিতা যাকারিয়া আলইহিস সালামের শাহাদাতের ব্যাপারে ভিত্তিহীন একটি ঘটনা প্রসিদ্ধ আছে, এ বিষয়ে তাঁদের জীবনীতে পাঠক অবগত হয়েছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

//