যারা পাঠকের সামনে নিজের কথাগুলো সাজিয়ে লিখতে চান তারা বইটি ডাউনলোড করে নিন।

বই: এসো কলম মেরামত করি
লেখক: আবু তাহের মিছবাহ
প্রকাশনী: দারুল কলম
(বইটি প্রথম পড়েছিলাম চৌদ্দ সালে। বলা যায় এই বইটি আমার জীবনের মোড় পাল্টিয়ে দিয়েছে! অথচ বইটির প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ কখনো কিছু লেখা হয় নি। সেই অপরাধবোধ থেকেই এই রিভিউটির জন্ম।)
================


- এসো কলম মেরামত করি। ডাউনলোড

পর্যালোচনা:
এই যে কিছু অক্ষর নিয়ে আমার শব্দগঠন, কয়েকটি শব্দ নিয়ে বাক্যবয়ন, অনেকগুলো বাক্য নিয়ে রিভিউলিখন, এটা নিঃসন্দেহে আল্লাহর দান। আর আল্লাহর এই দানে রয়েছে `এসো কলম মেরামত করি`র অমিত অবদান। কারণ…,
এই যে আমি `কারণ` লিখেছি, এটাকে আগে লিখতাম `কারন`। আর `কারণে` যে `মুর্ধন্য-ণ` বসে, অজ্ঞতাবশত এই ভুলটাকেও `ভূল` মনে করতাম! অথচ এসব `ভূল` নয়, বরং টাটকা `ভুল`! কিন্তু তখন এসব ভুল ধরিয়ে দেবার মতো আমার কেউ ছিল না।
.
তখনকার সময় এসব ভুলগুলোকে নিয়েই আমি বানানভুলের নানান আয়োজন করতাম, ব্যাকরণভুলের বিভিন্ন উত্‍সব করতাম। কিন্তু কেউ আমাকে শোধরে দেয় নি, সংশোধন করে নি, বরং উদ্ভট ধরনের `বাহবা` দিত!
তখন যে সাহিত্যের সবুজ উদ্যানে একজন দরদী মালী ছিল, `পুষ্প` নামে একটি পত্রিকা ছিল, `এসো কলম মেরামত করি` নামে একটি বিভাগ ছিল, এসব আমার অজ্ঞাতই ছিল! অথচ তখনো আমি সাহিত্যের সোনালি পথের নিভৃতচারী এক পথিক ছিলাম, সাহিত্যোদ্যানের সবুজ পুষ্পের অনুসন্ধিত্‍সু ছিলাম। তবে কোন ধরনের পাথেয় ছিল না।
.
ঠিক তখন আমি `এসো কলম মেরামত করি`র দেখা পাই। এসো কলম মেরামত করি মূলত সাহিত্যপত্রিকা মাসিক আল-কলম (পুষ্প)-এর একটি বিভাগ। পুষ্পসম্পাদক নিয়মিত ভাষাসংক্রান্ত একটি বিষয়-আষয়ের বিস্তর আলোচনা করতেন। যার দরুন তখনকার সময়ে পত্রিকাটি একদল তরুণ সাহিত্যসাধকের হৃদয়মণিকোঠায় স্থান দখল করে নিয়েছিল। অভূতপূর্ব ভালোবাসা পেয়েছিল। পত্রিকাটির সেই বিভাগের লেখাগুলো নিয়েই `এসো কলম মেরামত করি`র সংকলন।
* * *
বইটির শুরুতে লেখক কিছু প্রবন্ধ-সন্দর্ভ সন্নিবেশিত করেন। এসব প্রবন্ধে মাতৃভাষার আর্তনাদ ও কলমের আর্তচিত্‍কার বেজে ওঠে।
একদল কলমচালকের হাতে কলম কীভাবে ধর্ষিত হচ্ছে, মাতৃভাষা কীভাবে লাঞ্চিত হচ্ছে তার প্রতিচ্ছবির প্রতিফলন ঘটে প্রবন্ধগুলোতে। যা পড়লে পাঠকের ভিতর মাতৃভাষার প্রতি সঞ্চিত ভালোবাসা প্রগাঢ় হবে।
.
এরপর লেখক বইটিতে বানানভুল, ব্যাকরণভুল, শব্দের অপপ্রয়োগ, বাক্যের অপব্যবহার নিয়ে ঘরোয়াভাবে আলোচনা করেন। যা মাতৃভাষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চতর স্তর পর্যন্ত প্রতিটি ছাত্র-শিক্ষক, পাঠক-লেখক, সাহিত্যিক- সাংবাদিক উপকৃত হতে পারবে। বইটি পড়লে পাঠক মাতৃভাষার প্রতি বিমাতাসূলভ আচরণ থেকে উত্তরণ পাবে।
তাছাড়া দৈনন্দিন আমরা কতভাবে ভাষার সঙ্গে স্বৈরাচরণ করি তা পরিস্ফুট হয়ে ওঠবে।
.
আমি জানি, বাংলা ভাষায় এই ধরনের গ্রন্থ শত শত। কিন্তু লেখক বইটিতে পাঠকের সঙ্গে যেভাবে গল্পচ্ছলে প্রতিটি বিষয় তুলে ধরেছেন, অবহেলিত মাতৃভাষার জন্য এক আকাশ ব্যথা নিয়ে লিখে গেছেন, এক বুক ভালোবাসা মিশিয়ে পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন, এমন বিরল দৃষ্টান্ত কি অন্য বইয়ে পাওয়া যাবে?! তাই পাঠক যখন বইটি পড়বে নিজের অজান্তেই লেখককে ভালোবেসে ফেলবে। নিজের অজান্তেই লেখকের প্রেমে পড়ে যাবে।
.
আচ্ছা, পাঁচশত টাকার নোট তো অনেক দেখেছি। কিন্তু `পাঁচ` বানানে যে চন্দ্রবিন্দু হয়, এটা আমি ব্যবহার করতাম না। তাছাড়া চন্দ্রবিন্দুবিড়ম্বনায় খুব ভুগতাম একসময়। কিন্তু বইটিতে লেখক হাসিয়ে-মাতিয়ে গল্পচ্ছলে যেভাবে চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার শিখিয়েছেন তা কখনোই ভোলার নয়। এই বইটি পড়েই এসব বিড়ম্বনা থেকে উদ্ধার পেলাম। পুরাতন পাঁচশত টাকার নোটেও চন্দ্রবিন্দু ছিল, কিন্তু পাঁচশত টাকার বানানটা `পাঁচ শত` লিখা হত। অথচ `পাঁচশত` বানানটা একসঙ্গে হবে। কিন্তু যুগের পর যুগ মাতৃভূমির মুদ্রায় `পাঁচ শত` লেখার কলঙ্ক বহন করেছিল আমাদের মাতৃভাষা। অথচ এ দেশের কবি-সাহিত্যিকরা কোন আওয়াজ তোলে নি!
কথিত একাডেমিটেকাডেমিরাও তাদের দায়িত্বপালনে যুগ যুগ অবহেলা করল। ঠিক তখন কলম মেরামতের এই কারিগর এটা নিয়ে সর্বপ্রথম মাঠে নামলেন।
অতঃপর আমাদের মুদ্রা মাতৃভাষায় বানানভুলের কলঙ্কমুক্ত হলো।
.
লেখক বইটিতে শুধু বানান-ব্যাকরণের আলোচনা করেই ক্ষান্ত হন নি, একজন লেখক কখন, কীভাবে, কোন ধরনের লেখা তৈরি করবে তার নিয়ম-কানুন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সাহিত্যচর্চার প্রভিন্ন উপায়-উপকরণ, পথ-পাথেয় নিয়েও লিখেছেন। যা প্রতিটি সাহিত্যপ্রেমীর জন্য পাঠ অতীব জরুরি।
.
কীভাবে লেখা সম্পাদনা করতে হয়, সজ্জার প্রয়োজনে সম্পাদনার গুরুত্ব নিয়ে বইটিতে একটি অধ্যায় আছে।
রোজনামচা কী? কেন?
এবং কীভাবে লিখব, এসব প্রশ্নের সমাধান পাওয়া যাবে বইটিতে। রোজনামচা একজন মানুষের সুপ্ত লেখকসত্তাকে কীভাবে বিকচ করে তা জানা যাবে বইয়ের `তুমিও গ্রহণ করো আকাশের দান` লেখাটিতে। `সাহিত্যের উত্‍স হৃদয়, অন্য কিছু নয়` শিরোনামের লেখাটিকে যে কতবার পড়েছি তার কোন ইয়ত্তা নেই। এই লেখাটিকে আগেও পড়েছি অসংখ্যবার, এখনো পড়ছি, এবং যতদিন বেঁচে থাকব পড়েই যাব!
এই লেখাটিতে কখনো খুঁজে পাওয়া যায় রবি ঠাকুরকে, কখনো পাওয়া যায় আমাদের দুখু মিয়াকে।
আপনি সাধারণ একজন?
লেখাটি পড়ে জানতে পারবেন অসাধারণ কিছু।
আপনি লেখক? লেখাটি পড়ে পেয়ে যাবেন হাজারো লেখার উপকরণ।
আপনি সাহিত্যিক?
আপনাকে সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে লেখাটি
বারবার পড়ুন।
শুধু এই লেখাটি নয়, পুরো বইটিই বাংলাভাষাভাষিদের পাঠ এবং সংগ্রহে রাখা আবশ্যক বলে আমি
মনে করি।
* * *
প্রতিক্রিয়া:
এটিই একমাত্র বই যে বইটি আমার জীবনের মোড়ই পাল্টিয়ে দিয়েছে।
সাহিত্যের কণ্টকাকীর্ণ পথকে কুসুমাস্তীর্ণ করেছে। তাই বইটির প্রতি যতই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি কম হবে!
শুধু এতটুকুই বলি, এই বইয়ের প্রতিটি রেখা-লেখা, প্রত্যেকটি শব্দ-বাক্য আমাকে ঋদ্ধ করেছে। তাই বইটির প্রতি আমি আমরণ কৃতজ্ঞ।
* * *
লেখক সম্পর্কে:
সাহিত্যের কিংবদন্তি,
সাহিত্যপত্রিকা `পুষ্পে`র সম্পাদক মাওলানা আবু তাহের মিছবাহ (দা.বা.)।
`বাইতুল্লাহর মুসাফির`, `তোমাকে ভালোবাসি হে নবী!` লেখকের সাড়াজাগানো অনবদ্যগ্রন্থ।
বাংলাদেশে আরবিভাষাচর্চায় লেখকের প্রভূত ভূমিকা সর্বজনবিদিত। তাছাড়া লেখকের সবচে’ বড় পরিচয় পাওয়া যাবে তাঁর প্রতিটি লেখার রেখায় রেখায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য