খুলে যাক জীবনের বদ্ধ দুয়ার

 এক.

একবার এক ভাই আমার অফিসে এসে বললেন, ‘আরিফ ভাই, একটা কথা ভাবছি।' আমি বেশ আগ্রহের সাথেই বললাম, “কী কথা?

‘ভাই, ভাবছি বিয়ে করবো।”



বিয়ের কথাটা শুনে আমি খানিকটা চমকালাম। আমার সামনে বসা মানুষটা তিন সন্তানের জনক। এমনও নয় যে, তার বিয়ের ব্যাপারটা আমার কাছে অজানা কিছু। সুতরাং, তার মুখে নতুন করে বিয়ের কথা শোনাটা হালকা চমকে ওঠার মতোই ব্যাপার। আর আজকাল হয়েছে কী, মানুষজন দ্বিতীয়-তৃতীয় বিয়ে নিয়ে এত মজা-মশকরা করেন যে, বিয়ের মতো গুরুতর ব্যাপারও আজকাল হাসি-তামাশার ব্যাপারে পরিণত হয়েছে! আমাদের এই অধঃপতনের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার দায়টাও অবশ্য কোনো অংশে কম নয়।

যা-হোক, উৎসাহের সাথেই ভাইটাকে বললাম, ‘মাশা আল্লাহ, বিয়ের চিন্তা তো বেশ ভালো, কিন্তু হঠাৎ করে দ্বিতীয় বিয়ের চিন্তা এলো কেন মাথায়?”

আমি খেয়াল করলাম তার মুখ বেশ ফ্যাকাশে ও মলিন। চোখে-মুখে বিষণ্নতার ছাপ গাঢ় হয়ে ধরা পড়ছে। চেহারার এমন দুর্দশা নিয়ে আর যাই হোক, মজা করার জন্য যে তিনি আমার কাছে বিয়ের ব্যাপারটা উত্থাপন করেননি—সে ব্যাপারে আমি ঘোরতর নিশ্চিত।

‘আসলে ভাই, জীবনে কেমন যেন ছন্দহারা হয়ে পড়েছি। যেদিকেই যাচ্ছি কোনো গতি পাচ্ছি না। কত দিন ধরে চেষ্টা চালাচ্ছি একটা ব্যবসা দাঁড় করানোর জন্য, কোনোভাবেই কূল-কিনারা হচ্ছে না। যেখানেই হাত দিচ্ছি মনে হচ্ছে, ক্ষতি ছাড়া আর কোনোকিছুই উঠে আসছে না। জীবন থেকে বারাকাহ একেবারে উঠে গেলো মনে হয়। তাই ভাবছি আরেকটা বিয়ে করবো। বিয়ে করলে আয়-রোজগারে বারাকাহ আসে, তা তো জানেন?’–একনিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলেন ওই ভাই।

বুঝতে পারলাম, জীবন থেকে হারানো বারাকাহ ফিরে পেতে তিনি পুনরায় বিয়ের কথা ভাবছেন। ছন্দহীন যে জীবনের জাঁতাকলে পিষ্ট তিনি, তা থেকে মুক্তি লাভ করতে এবং জীবন থেকে হারানো বারাকাহ পুনরুদ্ধারে নতুন করে বিয়ে করাকেই তার কাছে এই মুহূর্তে সঠিক কাজ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

এটা ঠিক যে—বিয়ে করলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা জীবনে বারাকাহ দেন, আয়-রোজগারে বারাকাহ দেন, তবে বিয়েই যে বারাকাহ লাভের একমাত্র পন্থা— তা কিন্তু নয়। বারাকাহ লাভের অনেকগুলো পথ ও পন্থা আছে।

তাকে অনেকটা মজা করেই বললাম, “বিয়ে তো একটা করেই আছেন ভাই, তারপরও যখন বারাকাহ পাচ্ছেন না, তখন বারাকাহ লাভের নতুন দরোজার সন্ধান করার চাইতে বারাকাহ আসার যে দরোজাগুলো বন্ধ হয়ে আছে, তা উন্মুক্ত করবার চেষ্টা করাই ঢের উত্তম নয় কি?

বলাই বাহুল্য, তিনি আমার গভীর দার্শনিকসুলভ কথাটা বুঝতে বেমালুম ব্যর্থ হলেন! কপালের কুঞ্চিত রেখাকে আরো দীর্ঘ করে তিনি বললেন, ‘কী-সব জটিল-কঠিন কথা বলেন ভাইজান। সহজ করে না বললে বুঝি কীভাবে বলেন??

আমি স্মিত হাসলাম। লিখতে দিলে খানিকটা সহজ করে হয়তো লিখতে পারি,

কিন্তু বলতে দিলে যে আমি একেবারে তালগোল পাকিয়ে বসি—হাতেনাতে তার প্রমাণ পেয়ে একটু শরমিন্দা হলাম বটে।

না, আসলে বলতে চাইলাম যে, বিয়ে করলে বারাকাহ পাওয়া যায় এটা ঠিক, তবে বারাকাহ লাভের জন্য নতুন করে বিয়ে করার আগে, জীবন থেকে বারাকাহ চলে গেলো কেন, সেই কারণ উদ্ঘাটন করাটাই বেশি জরুরি। হতে পারে এমন কোনো কাজ আপনি করে যাচ্ছেন, যা হয়তো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পছন্দ করছেন না। এমন কোনো কাজ যা আল্লাহকে আপনার ব্যাপারে ক্রোধান্বিত করে তুলছে। ফলস্বরূপ, আপনার জীবন থেকে তিনি বারাকাহ উঠিয়ে নিলেন। হতে পারে না এমন?

তিনি সোৎসাহে বললেন, 'ভালো কথা বলেছেন তো! এভাবে ভাবা হয়নি আগে। আমার তো নিজেকেই আগে প্রশ্ন করা দরকার যে, বারাকাহ আসার পথগুলো আমি আদৌ ঠিক রাখতে পেরেছি কি না।'

‘একদম ঠিক। নিজেকে মনের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে একবার চিন্তা করুন তো—জীবনের কোনো এক পর্যায়ে আপনার এমন কোনো কাজ আছে বা হচ্ছে কি না, যার দরুন আপনি জীবনে ছন্দ হারাচ্ছেন? এমন কোনো ভুল যা আপনি প্রতিদিনই করছেন, কিন্তু তা যে ভুল, সে ব্যাপারে আপনি বেমালুম ও বেখবর। যদি সেরকম কোনোকিছুর দেখা মেলে, সবার আগে সেটা সংশোধন করে ফেলুন। বারাকাহ লাভের যে পথগুলো রুদ্ধ হয়ে আছে, সেগুলোকে প্রবল ধাক্কায় উন্মুক্ত করে দেন। এরপরও যদি জীবনে বারাকাহ না পান, তখন বারাকাহ লাভের নতুন কোনো দরোজার কথা ভাবতে পারেন।

দুই.

আমার এক কলিগ একদিন বেশ মন খারাপ করে তার পরিবারের কথা বললেন। সংসারে ঝামেলা যাচ্ছে, স্ত্রীর সাথে নিত্য-নৈমিত্তিক ঝগড়া-ঝাটি হচ্ছে। সংসারের টানাপোড়েনের দরুন ঘরে ঢুকলে অস্থির অস্থির লাগছে তার। কাজে মন বসে না, ইবাদতে মনোযোগ নেই ইত্যাদি ইত্যাদি।

কারো জীবনের করুণ এবং হাপিত্যেশের গল্প শুনলে বিমর্ষ হয়ে পড়ি। জীবনের জানা-পথে যখন অজানা শঙ্কা এসে ভর করে, তার ভার তখন হিমালয়ের ভারত্বকেও ছাড়িয়ে যায়। সব ঠিকঠাক চলার পরেও কেবল সংসারে যদি দহন লাগে, সেই আগুন-স্পর্শ তখন সব ভালো চলাকেই ভস্ম করে ছাড়ে।

এক বন্ধুর কাছে বেশ অনেকদিন হলো কিছু টাকা পাই। কয়েকদিন আগে তাকে বললাম, সম্ভব হলে টাকাগুলো দেওয়ার জন্য। সে বেশ আফসোস নিয়ে লজ্জিত মুখেই বললো, “এখন যদি আমাকে কেটে দুই ভাগও করিস, তারপরও একটা টাকা আমি তোকে দিতে পারবো না। বউ আর শিশুকে অনেকদিন হয় তার বাপের বাড়ি রেখে এসেছি। যে কাজেই হাত দিচ্ছি, মনে হচ্ছে সব ছাই হয়ে যাচ্ছে। জীবনের ওপর বিতৃয়া জন্মে যাচ্ছে আমার। মনে হচ্ছে, এর পরের ধাপে আমাকে আত্মহত্যাই করতে হবে।”

তিন.

আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এই পর্যায়গুলো আসতে পারে—জীবনে বারাকাহ না পাওয়া, সংসার থেকে সুখ-শান্তি উবে যাওয়া, জীবনের কোথাও নিদারুণ ছন্দপতন ঘটা। সময়ে, আয়-রোজগারে, ব্যবসাপাতিতে, কাজে-কর্মে, এমনকি আমল-ইবাদত থেকে শুরু করে জ্ঞানার্জনেও আমরা বারাকাহ হারাতে পারি। মনে হতে পারে— প্রবল প্রচেষ্টার পরেও প্রাপ্তির খাতাটা কেমন যেন শূন্যতায় ঠাসা! কোথাও যেন সুঃস্তি নেই, যেন কোথাও নেই একটু আনন্দ আর আয়েশের ঘনঘটা।

জীবনে যখনই এ ধরনের মুহূর্তের মুখোমুখি হবো, সবার আগে আমাদেরকে মনের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যেতে হবে। যে আয়নায় চেহারা দেখা যায়, তাতে মনের রোগ ধরা পড়ে না, কিন্তু মনের আয়নায় সুন্দর মুখাবয়বের দেখা না মিললেও, মনের রোগগুলো তাতে একে একে ভেসে উঠতে থাকে; অবশ্য যদি সে ইচ্ছে ও আন্তরিকতা নিয়ে আমরা মনের আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারি তবেই তো!

আকাশে মেঘ জমলে আদিগন্ত নীলাকাশ মেঘের আড়ালে লুপ্ত হয়ে যায়, প্রবল প্রতাপের সূর্য-রশ্মি মিলিয়ে যায় অন্ধকারের গহ্বরে। এমন মুহূর্তে ঝকঝকে নীলাকাশ দেখতে হলে শর্ত কী? শর্ত হলো—আকাশ থেকে মেঘ কেটে যাওয়া। মেঘ কেটে গেলেই আবার আমরা দূরদ্বিগলয়লীন নীল আকাশ দেখতে পাই, সূর্য-কিরণে আবারও গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে প্রকৃতি।

জীবনে বারাকাহ লাভের এবং বারাকাহ হারানোর ব্যাপারগুলোও একইরকম। জীবন হলো সেই সীমানা-বিহীন আকাশের মতোই, আর তার নীল রঙ এবং অবারিত সূর্য-কিরণ হলো বারাকাহ-র প্রতিচ্ছবি। জীবনের আকাশে যখন মেঘের আস্তরণ পড়বে, যখন তাতে দলে দলে ঘনীভূত হবে কালো মেঘ, তখন বারাকাহ হিশেবে পাওয়া অবারিত নীল আর সূর্য-কিরণ জীবনাকাশ থেকে লুপ্ত হবে—এই তো স্বাভাবিক।

তবে সেই মেঘ কেন জমে, কোথায় তার উৎসস্থল, সেটা নির্ণয় করা গেলে, তা সংশোধন করা গেলে ঘনায়মান মেঘের অন্ধকার গহর থেকে জীবনের নীল আর প্রভাতের সূর্য-কিরণ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

চার.

পুনরুদ্ধার? কিন্তু কীভাবে?

জীবনে যে পথে বারাকাহ আসে, কিংবা যে পথে রুদ্ধ হয়ে যায় বারাকাহ লাভের দুয়ার, সেই পথগুলোতে অনুসন্ধান চালিয়ে।

আপনার সেই গুনাহটার কথা ভাবুন তো, যা আপনি নিয়মিতভাবে করে যাচ্ছেন। যা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আপনার রাজ্যের অনীহা! আছে এমন কোনো গুনাহ আপনার? সেটা হতে পারে দৃষ্টির হিফাযত না করা, পরনারী বা পরপুরুষের দিকে নিজেকে আকৃষ্ট করে রাখা, চোখের যিনায় নিজেকে মগ্ন করে। রাখা, নেট দুনিয়ায় অশ্লীল-অশালীন ভিডিও দেখে বেড়ানো।

অথবা কখনো কি কারো আমানত নষ্ট করেছেন? কেউ বিশ্বাস করে আপনার কাছে কোনো আমানত গচ্ছিত রেখেছে, কিন্তু আপনি তা ভোগ করে বসে আছেন? সেই আমানত হতে পারে তার অর্থকড়ি, যা আপনি যথেচ্ছ খরচ করে ফেলেছেন; হতে পারে তার গোপন কোনো কথা, যা আপনি অন্যদের বলে বেড়িয়েছেন; হতে পারে অর্পিত কোনো দায়িত্ব, যা আপনি পালন করেননি। আছে এমন কিছু?

কিংবা কারো হক কি নষ্ট করেছেন কোনোদিন? কোনো ইয়াতিমের সম্পদ ভোগ করা কিংবা কারো ন্যায্য পাওনা না দেওয়া? ক্ষমতা দেখিয়ে কোনোদিন কি কারো জমি-জমা দখল করেছেন বা হাতিয়ে নিয়েছেন কোনো ব্যক্তির জমানো অর্থ-সম্পদ?

আল্লাহর সাথেই-বা আপনার সম্পর্কটা কেমন? তিনি যে কাজগুলো আপনার জন্য ফরয করেছেন, সেগুলোর ব্যাপারে আপনি কতখানি যত্নবান? আযান শুনে আপনি কি মসজিদে যাওয়ার জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন নাকি বুঁদ হয়ে থাকেন নিজের কাজে? আপনার ওপর যাকাত ফরয হওয়ার পরেও কি কৃপণতা করে তা আদায় করেন। না? আপনার কুরবানিগুলো কি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর জন্যই হয় নাকি সমাজে আপনি কত বড়লোক তা প্রমাণের উপলক্ষ হয়ে ওঠে? রামাদানের সিয়াম পালনে আপনার আন্তরিকতা কেমন? নাকি তা কেবলই উপোস থাকার প্রাণান্তকর চেষ্টা হয়েই থাকে?

এসব হলো ‘মনের আয়না'র কয়েকটা উদাহরণ। সত্যিকার অর্থে কোন গোপন গুনাহে আপনি নিমজ্জিত, তা আপনার রব আর আপনিই সবচেয়ে ভালো জানেন। জীবনে হারানো বারাকাহ পুনরুদ্ধারে তাই মনের সেই আয়নার সামনে আজকেই দাঁড়িয়ে যান। যে নিরন্তর পাপ কাজে নিমজ্জিত আছেন, তা থেকে নিজেকে অতি-শীঘ্রই টেনে তুলুন। যেখানে যার সাথে যা অন্যায় করেছেন, সম্ভব হলে সেগুলো মিটিয়ে নিন। যার পাওনা অপরিশোধিত আছে, তা পরিশোধ করে দেন। যদি তা না-ও পারেন, অন্তত তার কাছে গিয়ে করজোড়ে ‘দুঃখিত' বলে ক্ষমা চান। আল্লাহর যে হকগুলো আদায়ে আপনি উদাসীন হয়ে আছেন, সেগুলোতেও তৎপর হতে হবে আপনাকে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আজ থেকে আর কোনোদিন এক ওয়াক্তও সালাত কাযা করা যাবে না। মিথ্যা কথা বলা যাবে না। খারাপ কাজ করা, খারাপ কথা শোনা, খারাপ কিছু দেখা যাবে না। রামাদান মাসে নিজেকে নিবিড়ভাবে সঁপে দিতে হবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে। যাকাত আদায়ে আর কোনো কৃপণতা নয়। এবার থেকে কুরবানিগুলো হবে সত্যিকার অর্থে আল্লাহর জন্যই।

মনের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যদি খুঁজে বের করে আনতে পারেন জীবন থেকে বারাকাহ কমে যাওয়ার সত্যিকার কারণ, তবে সেটাই আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হয়ে দাঁড়াবে।

পাঁচ.

জীবনে বারাকাহ লাভের কিংবা হারানো বারাকাহ পুনরুদ্ধারের কার্যকরী একটা পন্থা হলো ইস্তিগফার।

জনপদে বহুদিন ধরে বৃষ্টি হয় না। মাঠ ফেঁটে চৌচির। পানির জলাশয়গুলো শুকিয়ে আস্তে আস্তে বিলীন হতে চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে মানুষের জীবন মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এমন করুণ অবস্থার কথা বর্ণনা করে এক লোক হাসান আল বাসরি রাহিমাহুল্লাহর কাছে এসে বললো, “ইয়া শাইখ, বহুদিন বৃষ্টির দেখা নেই। জীবনধারণ দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। আমাদের এই বিপদ থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দেন।

তখন হাসান আল বাসরি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করো। বেশি বেশি আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ো।”

অন্যদিন আরেকজন এলো হাসান আল বাসরি রাহিমাহুল্লাহর কাছে এসে বললো, ‘শাইখ, দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছি। আয়-রোজগার নেই কোনো। সন্তান সম্ভতি নিয়ে উপোসে কাটছে দিন। এই সমস্যা থেকে বাঁচবার পথ বাতলে দেন, দয়া করে।

হাসান আল বাসরি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, ‘অধিক পরিমাণে আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করো। বেশি বেশি আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ো।”

তৃতীয় একজন এসে বললো, “শাইখ, বিয়ের এতগুলো বছর পার হলো, কিন্তু কোলজুড়ে কোনো সন্তানাদি এলো না এখনো। আপনি কি আমাদের সন্তানাদি লাভের কোনো আমল শিখিয়ে দিতে পারেন?

হাসান আল বাসরি রাহিমাহুল্লাহ তাকেও বললেন, ‘অত্যধিক পরিমাণে

‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়ো।

প্রত্যেককে একই উপদেশ আর পরামর্শ দিতে দেখে, তখন একজন জিগ্যেশ করে বসল, ‘ইয়া শাইখ, কেউ কোনো সমস্যা নিয়ে এলেই আপনি তাকে একই সমাধান দিচ্ছেন। ইস্তিগফার করতে বলছেন। এমনটা কেন?”

লোকটার প্রশ্নের জবাবে তখন হাসান আল বাসরি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'তোমরা কি আল্লাহর কিতাবের ওই কথাগুলো পড়োনি?' এরপর তিনি সুরা নুহের আয়াতটা তিলাওয়াত করলেন

‘আর আমি তাদেরকে বলেছি, তোমাদের রবের কাছে ইস্তিগফার করো; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল। (তোমরা ইস্তিগফার করলে) তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টিবর্ষণ করবেন। আর তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি দিয়ে। তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত নদীমালা। (সুরা নূহ, আয়াত : ১০-১২)

(আল-জামি লি আহকামিল কুরআন (তাফসিরুল কুরতুবি), ইমাম কুরতুবি, খণ্ড : ১৮; পৃষ্ঠা : ৩০২,)

নুহ আলাইহিস সালাম তার অবাধ্য জাতিকে বলছেন, যেন তারা আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার তথা ক্ষমাপ্রার্থনা করে। আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করলে কী হবে? নুহ আলাইহিস সালাম বলে দিচ্ছেন তারা যদি ক্ষমাপ্রার্থনা করে তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাদের জন্য মুষলধারে বৃষ্টিবর্ষণ করবেন, তাদের ধন-সম্পদ এবং সন্তানাদি দিয়ে ভরিয়ে তুলবেন এবং সাথে আছে জান্নাতের চির সবুজ উদ্যান আর প্রবাহিত নদীমালার নিশ্চয়তা। এটা নুহ আলাইহিস সালাম কর্তৃক দেওয়া আল্লাহর একটা ওয়াদা। সবকিছুর জন্য শর্ত কী? ইস্তিগফার তথা আল্লাহর কাছে অবারিত ক্ষমাপ্রার্থনা করা।

ক্ষমাপ্রার্থনা করলে কুরআনুল কারিমে দুনিয়ায় তিনটা জিনিস দেওয়ার কথা আছে এক. মুষলধারে বৃষ্টি। দুই. সম্পদ। তিন. সন্তানাদি।

তবে অবারিত ক্ষমাপ্রার্থনার ফলাফল কি কেবল এই তিনটা বিষয়েই সীমাবদ্ধ? এর বাইরে আল্লাহ কি আর কিছুই দেবেন না বান্দাদের? দেবেন তো অবশ্যই। এই আয়াতে যে তিনটা বিষয়ের কথা এসেছে, ওই তিনটা জিনিসের প্রকট ঘাটতি ছিলো নূহ আলাইহিস সালামের জাতির মাঝে। প্রচণ্ড খরায় তাদের জীবন দুর্বিষহ ছিলো, দরিদ্রতায় তারা নাস্তানাবুদ হচ্ছিলো তখন। আর তাদের অধিকাংশই ছিলো নিঃসন্তান। কোনো সন্তানাদি হচ্ছিলো না। এজন্যই এই আয়াতে তাদের সমস্যাগুলোকে ধরে কথা বলা হয়েছে মূলত। কিন্তু আয়াতটার গূঢ় অর্থ হচ্ছে এই–বান্দার যদি কোনোকিছুর দরকার হয়, যদি তার জীবনে কোনোকিছুর ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়, যদি তার কোনোকিছু পেতে ইচ্ছে করে, তবে সে যেন আল্লাহর কাছে অবারিতভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করে। তবেই আল্লাহ তার মনোবাঞ্ছা পূরণ করে দেবেন।

ইস্তিগফার নিয়ে চমৎকার একটা ঘটনা পাওয়া যায় ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহর জীবনীতে। একবার ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ শামের একটা শহর হয়ে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে ইশার সালাতের ওয়াক্ত হয়ে গেলে তিনি কাছের এক মসজিদে ঢুকলেন সালাত আদায়ের জন্য।

যেহেতু রাত হয়ে গেছে এবং তাকে যেতেও হবে অনেকদূর, তাই ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ রাতটা ওই মসজিদে কাটানোর ব্যাপারে মনস্থির করলেন। যাতে ফজর সালাত পড়ে ভোরে ভোরেই তিনি পুনরায় যাত্রা শুরু করতে পারেন।

তল্পিতল্পা নিয়ে ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ মসজিদে ঢুকলেন এবং যথারীতি ইশার সালাত আদায় করলেন। কিন্তু বিপত্তিটা বাঁধলো তার পরে। ইমাম আহমাদকে সালাত শেষ করার পরেও মসজিদে বসে থাকতে দেখে মসজিদের দ্বাররক্ষী বললো, ‘মসজিদ বন্ধ করা হবে। আপনার সালাত কি শেষ হয়েছে?'

দ্বাররক্ষীর প্রশ্নের জবাবে ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ বললেন, জি, আমার সালাত শেষ হয়েছে; কিন্তু আমার ইচ্ছা যে, আজ রাতটা আমি এই মসজিদেই কাটাবো। আসলে আমি একজন মুসাফির। আমার গন্তব্য এখান থেকে বহুদূরে। রাতের অন্ধকার আর সফরের ক্লান্তির কথা ভেবে আমি রাতের বিশ্রামটা এখানে করতে চাই।”

চারদিকে তখন যদিও ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহর অনেক সুনাম আর খ্যাতি, তবু শামের ওই অঞ্চলের মানুষ যেহেতু ইতোপূর্বে ইমাম আহমাদকে স্ব-শরীরে কখনো দেখেনি, তাই ব্যক্তি হিশেবে তাকে কেউ চেনে না। মসজিদের ওই দ্বাররক্ষী ও ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহকে চিনতে পারেনি।

ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ মসজিদে থাকতে চাচ্ছেন শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো দ্বাররক্ষী। সে বললো, “না না। মসজিদে থাকা যাবে না। আমাকে এক্ষুনি মসজিদে তালা দিতে হবে। দয়া করে আপনি থাকবার জন্য অন্য ব্যবস্থা দেখুন।'

নিজের মুসাফির পরিচয় এবং সফরের ক্লান্তির কথা শুনিয়েও দ্বাররক্ষীর মন গলাতে ব্যর্থ হলেন ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ। শেষ পর্যন্ত সফরের তল্পিতল্পা নিয়ে তাকে মসজিদের বাইরে বের হয়ে আসতে হলো।

মসজিদের বাইরেই ছিলো একটা রুটির দোকান। রুটিওয়ালা মসজিদের দ্বাররক্ষী ও ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলের মধ্যকার কথাবার্তা কিছুটা আঁচ করতে পেরে ইমাম আহমাদকে বললেন, ‘জনাব, যদি কিছু মনে না করেন, আমার রুটির দোকানে আপনি রাতটা পার করতে পারেন। আপনি মুসাফির মানুষ। সফরের ক্লান্তি নিয়ে এই দীর্ঘ রাতে দূরের পানে যাত্রা করা আপনার উচিত হবে না। আমার এখানে থাকতে আশা করছি আপনার কোনো অসুবিধে হবে না।'

রুটিওয়ালার আতিথ্য গ্রহণ করলেন ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ। তিনি তার তল্পিতল্পা নিয়ে রাতের বিশ্রামের জন্য রুটির দোকানটায় ঢুকে পড়লেন।

বুটির দোকানে বেশ কিছুক্ষণ অবস্থানের পর ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ বেশ অভিনব একটা ব্যাপার খেয়াল করলেন। তিনি দেখলেন, যে রুটির দোকানদার তাকে এই বিজন রাতে তার দোকানে থাকবার ঠাঁই দিয়েছেন, সেই রুটিওয়ালার মুখে গুনগুন শব্দে সর্বদা ইস্তিগফার উচ্চারিত হচ্ছে। তিনি ঠোঁট নেড়ে নেড়ে এক-ধ্যানে আওড়াচ্ছেন— 'আসতাগফিরুল্লাহ... আসতাগফিরুল্লাহ... আসতাগফিরুল্লাহ।'

ব্যাপারটা বেশ ভালো লাগে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহর। এমন চমৎকার আমলের ব্যাপারে কৌতূহল আটকে রাখতে না পেরে তিনি রুটিওয়ালাকে বললেন, আচ্ছা ভাই, যদি কিছু মনে না করেন, একটা কথা জানতে পারি??

রুটিওয়ালা বিনীত গলায় বললেন, ‘অবশ্যই! অবশ্যই!’

এখানে আসার পর থেকে দেখছি আপনার মুখে সর্বদা ইস্তিগফার লেগে আছে। নিবিষ্ট মনে আপনি সারাটা সময় ইস্তিগফারে মজে থাকছেন। নিঃসন্দেহে এটা অতি উত্তম একটা আমল। আমার খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছে—এই আমলের কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আপনার জীবনে কোনো রহমত নাযিল করেছেন কি না?'

রুটিওয়ালা স্মিত হেসে বললেন, ‘জি। এই আমলটার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাকে তাঁর অপার অনুগ্রহে সিক্ত করেছেন।'

‘কীরকম?’–ইমাম আহমাদের জিজ্ঞাসা।

এবার রুটিওয়ালা বললেন, ‘আজ পর্যন্ত আমার এমন কোনো দুআ নেই, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কবুল করেননি।”

রুটিওয়ালার কথা শুনে বিস্মিত হয়ে যান ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ! আল্লাহর যমিনে এমন বান্দাও আছে, যার কোনো দুআ ব্যর্থ হয় না? সে যা চায়, আল্লাহ তা দিয়ে দেন? সুবহানাল্লাহ!

বিশ্বয়ের রেশ গলায় ধরে রেখেই তিনি রুটিওয়ালাকে বললেন, ‘তার মানে, আপনার সব দুআই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়??

জি, কেবল একটা দুআ আমার বাকি আছে, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এখনো কবুল করেননি।'

‘কোন দুআ?’—জানতে চাইলেন ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল।

‘আল্লাহর এক মুখলিস বান্দা, ইমাম আহমাদকে দেখার আমার বড় শখ! আল্লাহর কাছে করজোড়ে ফরিয়াদ করে যাচ্ছি, যাতে জীবনে অন্তত একবার তাকে আমি চোখের দেখা দেখতে পারি।'

রুটিওয়ালার কথা শুনে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ। বান্দার দুআ দয়াময় আল্লাহ কতভাবে যে কবুল করেন, তা ভেবে অশ্রুজলে সিক্ত হতে লাগলো তার দু-চোখ। তাকে এভাবে কাঁদতে দেখে রুটিওয়ালা বললেন, 'আপনার চোখে পানি কেন? আমি কি কোনোভাবে আপনাকে কষ্ট দিয়েছি?

ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ তার কান্না বিজড়িত গলায় বললেন, 'আপনার কবুল না হওয়া দুআটাও আজ কবুল হলো, ভাই। আপনার সম্মুখে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তিনিই আহমাদ ইবনু হাম্বল। নিশ্চয় আপনার দুআর কারণেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তার বান্দা আহমাদকে আপনার দোরগোড়ায় টেনে এনেছেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৩২১-৩২২; মানাকিবুল ইমাম আহমাদ, পৃষ্ঠা : ৫১২)

ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ এবং রুটিওয়ালার গল্পের সবচেয়ে মুখ্য বিষয়টা হলো—অবিরত ইস্তিগফার! রুটিওয়ালা সর্বদা, তার কাজের ফাঁকে ফাঁকে বলতেন—আসতাগফিরুল্লাহ! আসতাগফিরুল্লাহ! এই আমলটা তার জীবনের একটা নিত্য-নৈমিত্তিক রুটিন হয়ে দাঁড়ালো। যখনই সময় পান, তখনই ইস্তিগফারে মশগুল থাকার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তার জীবনের সমস্ত দুআ কবুল করতেন। তার ইস্তিগফার অবশ্যই লোক দেখানো ছিলো না এবং তাতে ছিলো না। কোনো খেয়ালিপনাও। হৃদয়ের গভীর থেকে সত্যিকারভাবে তিনি আল্লাহর কাছে এই ইস্তিগফারের মাধ্যমে তাওবা করতেন বলেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পুরস্কার হিশেবে তার দুআগুলো কবুল করে নিতেন। এমনকি ইমাম আহমাদকে দেখার যে বাসনা তার ছিলো, সেটাও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পূরণ করে দিলেন একদিন। তার সেই বাসনা পূরণ করার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাকে ইমাম আহমাদের কাছে টেনে নেননি, বরং ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহকেই টেনে এনেছিলেন তার কাছে।

ইস্তিগফারের এই হলো শক্তি।

আপনি কি সংসার জীবনে ভীষণ অসুখী? স্ত্রীর সাথে, বাবা-মা, ভাই-বোনের সাথে নিত্য-নিয়মিত মনোমালিন্য হচ্ছে? মনে হচ্ছে সংসার জীবন থেকে বারাকাহ হারিয়েছেন? তাহলে আজ থেকে অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার পাঠ শুরু করুন।

আপনার কি চাকরি হচ্ছে না? বেকারত্বের অভিশাপ মাথায় নিয়ে ঘুরছেন? অর্থকষ্টে আপনার জীবনটাই নাজেহাল? জীবন-সমুদ্রে খুঁজে পাচ্ছেন না পথের দিশা? আপনার জন্য কুরআনের সমাধান—অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার।

আপনার ভালো ক্যারিয়ার চাই, ভালো জীবনসঙ্গী চাই, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল চাই—ইস্তিগফার! ইস্তিগফার! ইস্তিগফার!

আপনি যা হন্যে হয়ে খুঁজছেন, তার সামনে একটা দেওয়াল তৈরি হয়ে আছে। সেই দেওয়াল ভেদ করে কাঙ্ক্ষিত বস্তু আপনার কাছে আসতে পারছে না। তাহলে আপনার কাজটা কী? আপনার কাজ হলো বাধার সেই দেওয়ালটা ভেঙে দেওয়া, যাতে আপনি পৌঁছাতে পারেন আপনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। সেই দেওয়াল ভাঙার কাজে আপনার হাতে সবচাইতে যে মজবুত শাবলটি আছে তার নাম হলো ইস্তিগফার! ইস্তিগফারের এত ক্ষমতা যে জীবনে যদি একবার তার ফল পান, তাহলে বিস্ময়াবিভূত হয়ে যাবেন।

ইস্তিগফার বদলে দিতে পারে আপনার জীবন। আপনার জীবনে যা এতদিন কেবল স্বপ্ন ছিলো, আপনার অবারিত ইস্তিগফার সেগুলোকে রূপ দিতে পারে বাস্তবতায়। কল্পনাতেও যা আপনার কাছে ছিলো অসম্ভব, ইস্তিগফার আপনাকে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে সেই সম্ভাবনার দুয়ারে।

মদিনায় একবার ভীষণরকম খরা দেখা দিলে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকজনকে নিয়ে বৃষ্টির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেন। সেদিন কেবল ইস্তিগফার পাঠ করেই উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু থেমে গেলে অন্যরা তাকে প্রশ্ন করলো, “ইয়া আমিরুল মুমিনিন, আপনি তো কেবল ইস্তিগফার পাঠ করেই থেমে গেলেন। অন্য কোনো দুআ তো আল্লাহর কাছে করলেন না।

তাদের জবাবে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘ইস্তিগফার দুআ কবুলের এমন এক জায়গায় আঘাত হানে, যেখানে কোনো দুআ ব্যর্থ হয় না। (তাফসিরুল কুরতুবি, খণ্ড : ১৮; পৃষ্ঠা : ৩০২; জামিউল আহাদিস : ২৯৮৮৪; আল-লুবাব ফি উলুমিল কিতাব, খণ্ড : ১৯; পৃষ্ঠা : ৩৮৫)

উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথাগুলো আপনার জীবনের জন্যও ভীষণরকম সত্যি। দুআ কবুলের সেই দরোজাটা আপনার জন্যও খোলা আছে, যেভাবে খোলা ছিলো উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য, মদিনাবাসীদের জন্য। সেই দরোজাটা উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু চিনেছেন বলেই নিশ্চিন্তে বলতে পেরেছেন—‘ইস্তিগফার দুআ কবুলের এমন এক জায়গায় আঘাত হানে, যেখানে কোনো দুআ ব্যর্থ হয় না।'

ইস্তিগফারের শক্তি তারা চিনেছেন, আমরা চিনবো কবে?

ছয়.

কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দুটো ওয়াদা আছে। দুটো অবস্থায় তিনি আমাদের ওপর আযাব নাযিল করবেন না বলে জানিয়েছেন। একটা হলো যতক্ষণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে জীবিত আছেন, আর অন্যটা হচ্ছে—যতক্ষণ আমরা আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার তথা ক্ষমাপ্রার্থনা করতে থাকবো।

যতক্ষণ আপনি তাদের মাঝে আছেন (ইয়া মুহাম্মাদ), ততক্ষণ আল্লাহ তাদের ওপর কোনো আযাব নাযিল করবেন না, এবং যতক্ষণ তারা ইস্তিগফার করতে থাকবে, ততক্ষণ আল্লাহ তাদের আযাব দেবেন না (সুরা আনফাল, আয়াত : ৩৩)

দুটো সুযোগের একটা আমরা হারিয়েছি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর মাধ্যমে। যেহেতু তিনি আমাদের মাঝে নেই, সুতরাং প্রথম শর্তটাও আর বলবৎ থাকবে না, কিন্তু দ্বিতীয় সুযোগটা আমাদের জন্য মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত খোলা। আল্লাহ বলছেন যে, আমরা যদি তাঁর কাছে অবারিত ইস্তিগফার তথা ক্ষমাপ্রার্থনার মধ্যে থাকি, তাহলে আমাদের জীবনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কোনো আযাব নেমে আসবে না।

আল্লাহর আযাব বড় কঠিন জিনিস! আল্লাহর ক্রোধে আপনার জীবন লন্ডভন্ড হয়ে যেতে পারে মুহূর্তেই। যে পাপের দরিয়ায় আপনি হাবুডুবু খাচ্ছেন, তার বিনিময়ে আল্লাহ যদি আপনাকে শাস্তি দিতে চান, তাহলে চোখের পলকে তিনি আপনার জীবনকে বিধ্বস্ত করে দিতে পারেন। আপনার জীবনে থাকা সুখ ছিনিয়ে নিতে পারেন, আপনার সম্পদ কেড়ে নিতে পারেন, ধূলিসাৎ করে দিতে পারেন আপনার মান-মর্যাদা। আপনার জীবনটাকে বিষিয়ে তুলতে আল্লাহর একটু অসন্তুষ্টিই যথেষ্ট।

তবে আপনি যদি ফিরে আসেন, যদি যাবতীয় ভুলের জন্য করজোড়ে আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করেন, যদি অনুতপ্ত হোন, অনুশোচনায় যদি আপনি নত হতে পারেন, তিনি বলছেন—তাঁর আযাব তিনি আপনার ওপর আরোপিত করবেন না।

জীবনের বন্ধ দুয়ারগুলো খোলার জন্য আপনার হাতে একটা চাবি আছে। সেই চাবির নাম ইস্তিগফার। চাবিটা ব্যবহার করে নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়ার জন্য আজ থেকেই তৎপর হয়ে পড়ুন। ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ শব্দটাকে বানিয়ে নিন জীবনের নিত্য সঙ্গী।

Getting Info...

About the Author

ছোট বেলা থেকেই টেকনোলজির নিজের ভিতর অন্যরকম একটা টান অনুভব করি। যদিও কওমি মাদরাসার চার দেয়ালের ভিতরেই ছিল বসবাস। তারপরও অধম্য আগ্রহের কারনে যতটুকু শিখেছি ততটুকু ছড়িয়ে দিতে চাই সকলের মাঝে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.