ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একটি বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। একটি গাড়ি উল্টে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। সৌভাগ্যবশত গাড়ির আরোহীদের কেউ মারা যাননি, তবে অনেকেই গুরুতর আহত হয়েছেন। হাইওয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছে এবং দুর্ঘতনাকবলিত গাড়ির ধ্বংসাবশেষটি রাস্তার পাশে সরিয়ে রেখেছে।
এখন রাস্তায় চলাচলের জন্য আর কোনো দৃশ্যমান বাধা নেই। কিন্তু একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে—সেখান দিয়ে যতগুলো গাড়ি যাচ্ছে, প্রত্যেকটি গাড়িই দুর্ঘতনাকবলিত এলাকার কাছাকাছি এসে গতি কমিয়ে দিচ্ছে। কোনো বাধা না থাকা সত্ত্বেও গাড়িগুলোর এই স্লো হয়ে যাওয়ার পেছনের মনস্তাত্ত্বিক কারণটি কী?
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই বিশেষ প্রবণতাকে বলা হয় ‘রাবারনেকিং’ (Rubbernecking)। মহাসড়কে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে চালকেরা কৌতুহলী হয়ে নিজেদের ঘাড় রবারের মতো বাঁকিয়ে দেখার চেষ্টা করেন যে ঠিক কী ঘটেছে। এটি মানুষের একটি আদিম মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু কেন আমরা নেতিবাচক বা খারাপ ঘটনার প্রতি এত বেশি আকর্ষিত হই? কেন আমরা ভালো খবরের চেয়ে খারাপ খবরের দিকে বেশি মনোযোগ দিই?
এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের জীবনের যাবতীয় সংগ্রামের মূল কারণ এবং তার চমৎকার সমাধান। আপনি কি এই মুহূর্তে আপনার জীবনে কোনো কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন? হতে পারে তা ওজন কমানো বা বাড়ানোর মতো শারীরিক স্বাস্থ্য নিয়ে সংগ্রাম, কিংবা হতাশা, দুশ্চিন্তা, ও ওসিডি (OCD)-র মতো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যুদ্ধ, অথবা আমাদের সমাজের প্রায় অধিকাংশ মানুষের চিরন্তন সমস্যা—আর্থিক সংকট?
একটিমাত্র শব্দ দিয়ে আপনার এই সমস্ত জীবন-সংগ্রামের পেছনের কারণ এবং তার থেকে মুক্তির উপায় ব্যাখ্যা করা সম্ভব। শব্দটি আমরা আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তায় খুব সাধারণ একটি অব্যয় হিসেবে ব্যবহার করি—‘ইয়ে’ (I.E.A.)!
আপাতদৃষ্টিতে একে হাস্যকর মনে হলেও, আসলে এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক অ্যাক্রোনিম। I.E.A. মূলত তিনটি গভীর জীবন-পরিবর্তনকারী ধারণাকে নির্দেশ করে:
এই নিবন্ধে আমরা বৈজ্ঞানিক গবেষণা, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং বাস্তব জীবনের উদাহরণের মাধ্যমে এই ৩টি স্তম্ভের গভীরতা এবং এগুলো আমাদের জীবনকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।
১. ‘I’ - Inputs: আপনার মনকে আপনি কী খাওয়াচ্ছেন?
আমরা আমাদের শরীরের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে বেশ সচেতন। আমরা জানি যে জাঙ্ক ফুড খেলে শরীর অসুস্থ হবে, আর পুষ্টিকর খাবার খেলে শরীর সুস্থ থাকবে। কিন্তু আমরা আমাদের মনের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এই নিয়মটি প্রায়ই ভুলে যাই। আমাদের মন প্রতিটি মুহূর্তে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে যে তথ্য গ্রহণ করছে, তাকে বলা হয় ইনপুট (Input)।
কেন সংবাদমাধ্যমের ৯৮% খবরই নেতিবাচক?
আপনি যদি টেলিভিশন নিউজ বা খবরের কাগজ ঘাঁটেন, তবে দেখতে পাবেন সেখানকার প্রায় ৯০% থেকে ৯৮% খবরই খুন, ধর্ষণ, যুদ্ধ, দুর্ঘটনা বা নানাবিধ কেলেঙ্কারির। কোনো ভালো খবর সাধারণত মিডিয়ার প্রধান শিরোনাম হয় না। কেন এমন নিয়ম তৈরি হলো?
এর পেছনে রয়েছে আমাদের আদিম মনস্তত্ত্ব (Evolutionary Psychology)। আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে যখন মানুষ বনে-জঙ্গলে বাস করত, তখন তাদের বেঁচে থাকার জন্য দুটি বিষয়ে সর্বদা সচেতন থাকতে হতো:
- 🎯 অভাব বা ক্ষুধা দূর করার উপায়: কোথায় শিকার বা ফলমূল পাওয়া যাবে।
- 🎯 আক্রমণ থেকে বাঁচার উপায়: কোনো হিংস্র পশু বা শত্রু আক্রমণ করছে কি না।
আদিম যুগে সামান্যতম অসতর্কতার অর্থ ছিল তাৎক্ষণিক মৃত্যু। তাই মানুষের মস্তিষ্ক নেতিবাচক বা আশঙ্কাজনক সংকেতগুলোর প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে গড়ে উঠেছে। আমাদের মস্তিষ্ক সর্বদা এটি নিশ্চিত করতে চায় যে চারপাশের কোনো বিপদ আমাদের ক্ষতি করতে পারে কি না।
সংবাদমাধ্যমগুলো আমাদের এই আদিম মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা খুব ভালো করেই জানে। তারা জানে যে একটি ভালো খবরের চেয়ে একটি ভয়ঙ্কর বা নেতিবাচক খবর মানুষের মনোযোগ অনেক বেশি আকর্ষণ করবে। তাই তারা আমাদের প্রতিনিয়ত নেতিবাচক তথ্য পরিবেশন করে। আর এই ক্রমাগত নেতিবাচক তথ্য গ্রহণ করতে করতে আমরা নিজের অজান্তেই এক প্রকার মানসিক পক্ষাঘাতগ্রস্ততায় আক্রান্ত হই, যা আমাদের অগ্রগতির গতিকে স্লো করে দেয়।
ইলুসিভ ট্রুথ ইফেক্ট (The Illusory Truth Effect)
Vanderbilt University এবং Duke University-র বিজ্ঞানীদের করা একটি বিখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় ‘ইলুসিভ ট্রুথ ইফেক্ট’ (Illusory Truth Effect) সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো একটি অসত্য বা নেতিবাচক তথ্য যদি আমাদের মস্তিষ্কে বারবার প্রবেশ করানো হয়, তবে এক সময় আমাদের অবচ্ছেদ মন সেই মিথ্যাকেই পরম সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে।
আপনি যদি প্রতিদিন সকালে উঠে খবরের কাগজে কেবল মানুষের প্রতারণা, বিচ্ছেদ এবং কষ্টের খবর পড়তে থাকেন, তবে আপনার মস্তিষ্ক বিশ্বাস করতে শুরু করবে যে এই পৃথিবীটি একটি অত্যন্ত অনিরাপদ জায়গা এবং এখানকার সব মানুষই খারাপ। এই অমূলক বিশ্বাসের কারণে আপনি মানুষের সাথে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভয় পাবেন এবং সর্বদা হতাশায় ভুগবেন।
বিষণ্ণ গান এবং ডিপ্রেশনের চক্র (Listening to Sad Music)
নেতিবাচক ইনপুটের আরেকটি বড় উৎস হলো আমাদের প্লেলিস্টের দুঃখের গানগুলো। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ইতিমধ্যেই ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতায় ভুগছেন, তারা যখন বারবার দুঃখের বা একাকিত্বের গান শোনেন, তখন তাদের ভেতরের নেতিবাচক অনুভূতিগুলো বহুগুণ তীব্র হয়ে ওঠে। একে বলা হয় Rumination বা একই দুঃখের চিন্তার ক্ষতিকর পুনরাবৃত্তি।
গানের চমৎকার সুর বা মিউজিক হয়তো আমাদের সাময়িক ভালো লাগা দেয়, কিন্তু তার লিরিক্স বা কথাগুলো আমাদের অবচেতন মনে বিষাদ ও হতাশার বিষাক্ত বীজ বুনে দেয়। আপনি যদি প্রতিনিয়ত অবহেলা, বিচ্ছেদ বা যন্ত্রণার গান শুনতে থাকেন, তবে আপনার মস্তিষ্ক বাস্তব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কেবল শূন্যতাই খুঁজে পাবে।
নোংরা পানির গ্লাস এবং তাওবা (The Dirty Glass Analogy)
ধরে নিন আপনার টেবিলে একটি গ্লাস রাখা আছে যা নোংরা বা ঘোলা পানিতে ভর্তি। এই গ্লাসটিকে পরিষ্কার করার দুটি উপায় আছে:
- ❌ প্রথম উপায়: আপনি গ্লাসের নোংরা পানি চামচ দিয়ে সেঁচে ফেলার চেষ্টা করতে পারেন (যা অত্যন্ত কঠিন এবং প্রায় অসম্ভব)।
- ✔ দ্বিতীয় উপায়: অথবা আপনি গ্লাসটিকে একটি পানির কলের নিচে ধরে রাখতে পারেন যেখান থেকে অবিরাম পরিষ্কার পানি পড়ছে। পরিষ্কার পানির তীব্র চাপে গ্লাসের নোংরা পানি উপচে বাইরে পড়ে যাবে এবং এক সময় পুরো গ্লাসটি স্বচ্ছ পানিতে ভরে উঠবে।
আমাদের মনও ঠিক এই গ্লাসের মতো। আপনার ভেতরের নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে জোর করে দূর করার চেষ্টা না করে, আপনার মনের কলটি খুলে দিন এমন কিছু সোর্সের নিচে যা প্রতিনিয়ত ইতিবাচক ইনপুট দেয়। ভালো বই পড়া, তথ্যবহুল পডকাস্ট শোনা, সফল ও বিনয়ী মানুষদের জীবনী জানা—এই ইতিবাচক ইনপুটগুলো আপনার অবচেতন মনের সমস্ত নোংরা চিন্তা উপচে বের করে দেবে।
তবে গ্লাসের নিচের দিকে কিছু ময়লা বা গাদ অনেক সময় জমে থাকে, যা সাধারণ পরিষ্কার পানিতে সহজে যায় না। আমাদের অবচেতন মনের এই গভীর ময়লাগুলো পরিষ্কার করার জন্য প্রয়োজন আত্মশুদ্ধি বা গভীর অনুশোচনা, যাকে ধর্মীয় পরিভাষায় বলা হয় তাওবা (Tawbah)। তাওবা এবং গভীর আত্ম-পরামর্শের (Auto-suggestion) মাধ্যমে আমরা আমাদের মনের অবচেতন স্তরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের নেতিবাচক বিশ্বাসগুলোকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করতে পারি।
২. ‘E’ - Environment: আপনার চারপাশের অদৃশ্য প্রভাবক
আমরা অনেকেই মনে করি যে আমরা আমাদের ইনপুটগুলো খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। কিন্তু আসলে তা নয়। এর কারণ হলো আমাদের পরিবেশ (Environment)।
আমরা মুখ দিয়ে যা খাই, তা আমরা চিবিয়ে খাই এবং বেছে নিতে পারি। কিন্তু আমাদের মন খাবার গ্রহণ করে আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের (স্পর্শ, গন্ধ, দেখা, শোনা, স্বাদ) মাধ্যমে। আপনার পরিবেশের প্রভাবকগুলো আপনার অজান্তেই আপনার ইন্দ্রিয় দিয়ে মস্তিস্কে প্রবেশ করে। আপনি হয়তো খারাপ গান শুনতে চান না, কিন্তু আপনি যখন বাজারে বা বাসে যান, তখন সেই নেতিবাচক গানটি আপনার কানে ঢুকবেই। তাই ইনপুট নিয়ন্ত্রণ করার আগে আমাদের পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ বা পরিষ্কার করা জরুরি।
চয়েস আর্কিটেকচার এবং নুডগিং (Choice Architecture & Nudging)
ডেনমার্কের কিছু ইউনিভার্সিটিতে একটি চমৎকার আচরণগত পরীক্ষা চালানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ার ফ্রিজগুলোতে যেখানে আগে কোক বা কোমল পানীয় সাজিয়ে রাখা হতো, সেখানে কেবল ফলের জুস দিয়ে পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। ফলাফলে দেখা গেল, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফলের জুস খাওয়ার পরিমাণ প্রায় ১১% বৃদ্ধি পেয়েছে!
শিক্ষার্থীদের জোর করে বা নির্দেশ দিয়ে জুস খাওয়ানো হয়নি। কেবল তাদের চোখের সামনের পরিবেশের চয়েসগুলো বদলে দেওয়া হয়েছিল। একেই বলা হয় চয়েস আর্কিটেকচার বা নুডগিং।
আপনি যদি আপনার পড়ার টেবিলে সবসময় চিপস, চকলেট বা কুকিজ সাজিয়ে রাখেন, তবে পড়তে পড়তে আপনার হাত অবচেতনভাবেই সেগুলোর দিকে চলে যাবে। অন্যদিকে, আপনি যদি টেবিল থেকে জাঙ্ক ফুড সরিয়ে সেখানে বাদাম, খেজুর, কিসমিস বা ফলমূল রাখেন, তবে আপনার শরীর পুষ্টিকর খাবারই গ্রহণ করবে। আপনার চারপাশের পরিবেশ আপনার সিদ্ধান্তের ওপর এক বিশাল প্রভাব বিস্তার করে।
মোবাইল ফোন এবং ‘ল্যান্ডফোন জোন’ চ্যালেঞ্জ (The Phone Zone)
আমাদের যুগের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক ইনপুটের জানালা হলো আমাদের স্মার্টফোন। আমরা ফোন স্ক্রল করার সময় অনেক নেতিবাচক নিউজ বা অন্য মানুষের সফলতার ছবি দেখে নিজেদের ভেতরে হীনম্মন্যতা তৈরি করি।
এর থেকে বাঁচার জন্য আপনি আপনার বাসায় একটি ‘ফোন জোন’ (Phone Zone) তৈরি করতে পারেন। আপনার বাসার যেকোনো একটি নির্দিষ্ট রুম বা টেবিলকে কেবল ফোন ব্যবহারের জন্য নির্ধারণ করুন। আপনার ফোনটি সবসময় সেখানেই থাকবে (ঠিক আগের যুগের ল্যান্ডফোনের মতো)। আপনার যদি ফোন ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়, তবে আপনি সেই টেবিলে গিয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে ফোন ব্যবহার করবেন। কিন্তু আপনার বেডরুম বা স্টাডি রুমে ফোন নিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই সামান্য পরিবেশগত পরিবর্তন আপনার স্ক্রিন টাইম এবং মানসিক দুশ্চিন্তা বহুণ কমিয়ে দেবে।
৩. ‘A’ - Association: আপনি যাদের সাথে সময় কাটাচ্ছেন
একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে: “লোহা যেমন চুম্বকের টানে চলে, মানুষও তেমনি তার সঙ্গীর প্রভাবে গড়ে ওঠে।” ড্যারেন হার্ডির বইয়ে জিম রনের একটি বিখ্যাত উক্তি উল্লেখ করা হয়েছে:
"আপনি যে পাঁচজন মানুষের সাথে সবচেয়ে বেশি সময় কাটান, আপনি আসলে তাদেরই গড় (Average)।"
ক্রিসটাকিস এবং ফাওলারের ৩২ বছরের গবেষণা
২০০৭ সালে New England Journal of Medicine-এ প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ১২,০০০ মানুষের ওপর দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে গবেষণা চালান। এই গবেষণার ফলাফল ছিল চমকে দেওয়ার মতো:
আপনার সোশ্যাল নেটওয়ার্কে থাকা কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু যদি স্থূল বা মোটা (Obese) হয়ে যায়, তবে আপনারও মোটা হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৫৭% বেড়ে যায়!
এই প্রভাব কিন্তু কেবল শারীরিক ওজনের ক্ষেত্রে নয়। আপনার বন্ধুরা যদি ধূমপায়ী হয়, মদ্যপায়ী হয় কিংবা প্রতিনিয়ত হতাশা বা একাকিত্বের কথা বলে, তবে আপনার মধ্যেও সেই অভ্যাস বা মানসিক অবস্থা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। এমনকি আপনার উপার্জনও সাধারণত আপনার মেলামেশা করা ওই ৫ জন বন্ধুর উপার্জনের গড়ের কাছাকাছি হবে।
অ্যাসোসিয়েশন বা সঙ্গের এই অদৃশ্য শক্তি আমাদের জীবনের স্রোতের মতো কাজ করে। সমুদ্রে সাঁতার কাটার সময় আপনি যদি শান্ত হয়ে দাঁড়িয়েও থাকেন, তবুও স্রোত আপনাকে ধীরে ধীরে কোনো এক দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবেই। ঠিক তেমনি, আপনার সঙ্গীরা যদি অলস বা লক্ষ্যহীন হয়, তবে আপনি যত কঠোর চেষ্টাই করুন না কেন, তাদের অলসতার স্রোত আপনাকেও অলস ও লক্ষ্যহীন করে তুলবে।
সঙ্গ সংস্কারের ৩টি সমাধান (The 3 Solutions of Association)
ড্যারেন হার্ডি আমাদের এই সামাজিক বলয়কে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ৩টি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত উপায়ের কথা বলেছেন:
- 🚫 ১. সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়া (Dissociation): আপনার পরিচিতদের মধ্যে যারা ড্রাগস বা অন্য কোনো মারাত্মক আসক্তিতে লিপ্ত, যারা প্রতিনিয়ত কেবল মানুষের গীবত বা পরচর্চা করে এবং আপনার যেকোনো ভালো উদ্যোগে অহেতুক বাধা দেয়—তাদের সাথে সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে কেটে দিন। এটি হয়তো কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু আপনার ভবিষ্যতের স্বার্থে এই বিষাক্ত মানুষগুলো থেকে দূরে সরে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।
- ⏳ ২. সীমিত মেলামেশা (Limited Association): কিছু মানুষ থাকেন যাদের জীবন থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয় (যেমন: নিকটাত্মীয় বা অফিসের সহকর্মী)। তাদের ক্ষেত্রে সময় সীমিত করুন। যে আত্মীয়ের সাথে আপনি আগে ৩ দিন সময় কাটাতেন, তাঁর সাথে মেলামেশা ৩ ঘণ্টায় নামিয়ে আনুন। যাঁর সাথে ৩ ঘণ্টা আড্ডা দিতেন, তাঁর সাথে কথা বলা ৩ মিনিটে নামিয়ে আনুন। সম্পর্ক বজায় রাখুন কিন্তু তাদের নেতিবাচক কথার প্রভাব নিজের মনের ভেতর ঢুকতে দেবেন না।
- 📈 ৩. ইতিবাচক সঙ্গের বিস্তার ঘটানো (Expanded Association): আপনি যেমন মানুষ হতে চান, ঠিক তেমন মানুষদের সাথে মেলামেশা ও বন্ধুত্ব গড়ে তুলুন।
কিন্তু আপনার চারপাশে যদি এমন কোনো ভালো মানুষ না থাকে, তবে আপনি কী করবেন? এর চমৎকার সমাধান হলো পডকাস্ট এবং বই। আপনি যখন একটি ভালো বই পড়েন, তখন আপনি মূলত সেই লেখকের সাথে চমৎকার একটি আড্ডায় অংশ নেন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মনীষীরা তাদের জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা বইয়ের পাতায় লিখে রেখে গেছেন। নিয়মিত বই পড়ার মাধ্যমে আপনি সহজেই আপনার অ্যাসোসিয়েশনকে বিশ্বের সেরা মানুষের সাথে কানেক্ট করতে পারেন।
সর্বোত্তম সঙ্গের ইসলামিক মাপকাঠি:
মুসনাদে আহমাদ-এর একটি হাদিসে এসেছে, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, "আল্লাহর প্রিয় বান্দা তো তারা, যাদের দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়।" (হাদিসটি হাসান লিগায়রিহি, আহমাদ: ১৭৯৯৮)।
আপনি যাদের সাথে মেলামেশা করছেন, তারা কি আপনাকে আরও ভালো মানুষ হতে অনুপ্রাণিত করছে? যদি না করে, তবে বুঝে নিন আপনি ভুল অ্যাসোসিয়েশনে আছেন এবং এখনই তা পরিবর্তন করা জরুরি।
৪. আপনার জীবনের অগ্রগতির গাইড
এই সম্পূর্ণ গভীর ধারণাটিকে একটি সহজ চমৎকার বাক্যে সংক্ষেপ করা যায়:
আপনার ক্যারিয়ার, পড়াশোনা বা সম্পর্কে যখনই কোনো বড় সমস্যা দেখা দেবে, তখন নিজেকে এই তিনটি প্রশ্ন করুন:
- 🔑 ইনপুট (Input): আমি আমার মনে প্রতিদিন কেমন তথ্য ঢোকাচ্ছি?
- 🔑 এনভায়রনমেন্ট (Environment): আমার চারপাশের দৈনন্দিন পরিবেশ কেমন?
- 🔑 অ্যাসোসিয়েশন (Association): আমি কাদের সাথে নিয়মিত সময় কাটাচ্ছি বা আড্ডা দিচ্ছি?
নিচের মন্তব্য (Comment Box) বক্সে আমাদের সাথে শেয়ার করুন—আপনার জীবনে এই মুহূর্তে সবচেয়ে ক্ষতিকর ইনপুট, এনভায়রনমেন্ট বা অ্যাসোসিয়েশন কোনটি, যা আপনি আজ থেকে পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আপনার একটি ছোট সঠিক সিদ্ধান্তই আপনার ভবিষ্যতের অসাধারণ সাফল্যের প্রথম কদম হতে পারে। সুস্থ থাকুন, ইতিবাচক থাকুন। আসসালামু আলাইকুম।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন