হাশিয়া ও কিতাবাত টীকা
সাপোর্ট করুন
হোম জুমার বয়ান পূজার মৌসুমে একজন মুসলিমের করণীয় ও শরঈ বিধান: একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা

পূজার মৌসুমে একজন মুসলিমের করণীয় ও শরঈ বিধান: একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা

১৭ অক্টোবর, ২০২৬ পড়তে ১ মিনিট লাগতে পারে
লেখা:
পড়তে ভালো লাগছে না? শুনে নিন

প্রতি বছর শরৎকালে শারদীয় দুর্গা পূজার আগমন ঘটলেই আমাদের সমাজ, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বহুল চর্চিত বিষয়ের অবতারণা হয়। একদল মানুষ তথাকথিত আধুনিকতা ও উদারতার নামে ইসলামের মৌলিক আক্বীদা বিসর্জন দিয়ে শিরকি উৎসবে গা ভাসিয়ে দেয়, আবার আরেকদল বিভ্রান্ত হয়ে বাড়াবাড়ি বা অবিবেচকের মতো আচরণে লিপ্ত হয়।

'ধর্ম যার যার, উৎসব সবার'—এই স্লোগানের আড়ালে একজন মুসলিমের ধর্মীয় সীমারেখা কোথায়? সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা এবং আক্বীদা রক্ষার মাঝে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখতে হবে? পূজামণ্ডপ দর্শন, পূজার চাঁদা দেওয়া, মেলার আয়োজন, মিষ্টি বা প্রসাদ খাওয়া এবং অমুসলিমদের শুভেচ্ছা জানানোর শরঈ হুকুম কী? পবিত্র কুরআন, সহীহ হাদিস এবং ফিক্বহে ইসলামীর আলোকে বিষয়গুলোর বিশদ পর্যালোচনা নিচে তুলে ধরা হলো।

[toc]

১. অমুসলিমদের সাথে সামাজিক সম্পর্ক বনাম ধর্মীয় উৎসবের সীমারেখা

ইসলামে অমুসলিমদের সাথে সুন্দর আচরণ, নাগরিক অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং তাদের জান-মাল-ইজ্জতের নিরাপত্তা বিধানের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসলাম কখনোই অমুসলিমদের ওপর অন্যায় আক্রমণ বা অবিচার সমর্থন করে না।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:

لَّا يَنْهَىٰكُمُ ٱللَّهُ عَنِ ٱلَّذِينَ لَمْ يُقَـٰتِلُوكُمْ فِى ٱلدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَـٰرِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوٓا۟ إِلَيْهِمْ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُقْسِطِينَ

অনুবাদ: "দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ করতে ও সুবিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন।" (সূরা আল-মুমতাহিনা: ৮)

উসূল ও মূলনীতি (মুদারাত বনাম মুওয়ালাত):
ইসলামী শরিয়তে অমুসলিমদের সাথে আচরণের দুটি সুস্পষ্ট স্তর রয়েছে:
  1. মুদারাত (المُدَارَاة): বাহ্যিক সদাচরণ, বিপদ-আপদে মানবিক সহায়তা, আর্থিক লেনদেনে ইনসাফ এবং সামাজিক প্রতিবেশীসুলভ দায়িত্ব পালন করা। এটি শুধু জায়েজই নয়, বরং প্রশংসনীয় ও সুন্নাহসম্মত।
  2. মুওয়ালাত বা মুদাহানাত (المُوَالَاة / المُدَاهَنَة): দ্বীন ও আক্বীদার ক্ষেত্রে আপস করা, তাদের ধর্মীয় উপাসনা-উৎসবে সমর্থন দেওয়া বা তাদের ধর্মীয় আচারে একাত্ম হয়ে অংশ নেওয়া। এটি ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও কুফরি।

অতএব, অমুসলিম প্রতিবেশীর জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া বা তার অসুস্থতায় পাশে দাঁড়ানো ঈমানের দাবি; কিন্তু তাদের ধর্মীয় উপাসনা ও উৎসবে শরিক হওয়া সরাসরি শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

২. 'ধর্ম যার যার, উৎসব সবার'—একটি আত্মঘাতী ও বিভ্রান্তিকর স্লোগান

আমাদের সমাজে সেক্যুলার ও তথাকথিত প্রগতিশীল মহলে বহু প্রচলিত একটি স্লোগান হলো—"ধর্ম যার যার, উৎসব সবার"। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্মীয় উৎসব কেবল নিছক বিনোদন বা সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন নয়; বরং উৎসব হলো ধর্মের অবিচ্ছেদ্য আনুষ্ঠানিক ইবাদত ও প্রতীক (الشعائر)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:

إِنَّ لِكُلِّ قَوْمٍ عِيدًا، وَهَذَا عِيدُنَا

অনুবাদ: "নিশ্চয়ই প্রত্যেক জাতির নিজস্ব উৎসব রয়েছে, আর এটি (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আদ্বহা) হলো আমাদের উৎসব।" (সহীহ বুখারী: ৯৫২; সহীহ মুসলিম: ৮৯২)

পূজা একটি খাঁটি ধর্মীয় আচার, যার মূল ভিত্তি হলো প্রতিমা ও দেবদেবীর বন্দনা এবং তাদের কাছে পার্থিব বা অপার্থিব কল্যাণ প্রার্থনা করা। আর আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে উপাস্য মানা হলো 'শিরক'—যা সৃষ্টির সবচেয়ে বড় পাপ ও জুলুম।

আল্লাহ তাআলা শিরকের পরিণতি সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন:

إِنَّهُۥ مَن يُشْرِكْ بِٱللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيْهِ ٱلْجَنَّةَ وَمَأْوَىٰهُ ٱلنَّارُ ۖ وَمَا لِلظَّـٰلِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ

অনুবাদ: "নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরিক করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। আর জালিমদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না।" (সূরা আল-মায়িদা: ৭২)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে:

لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ ٱلْخَاسِرِينَ

অনুবাদ: "যদি তুমি শিরক করো, তবে তোমার আমল অবশ্যই বরবাদ হয়ে যাবে এবং তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।" (সূরা আজ-যুমার: ৬৫)

যেখানে আল্লাহর একত্ববাদের ওপর কুঠারাঘাত করা হয় এবং প্রতিমার উপাসনা করা হয়, একজন তাওহীদে বিশ্বাসী মুসলিম কখনোই বলতে পারে না—"সেটি আমারও উৎসব।" এ ধরনের বক্তব্য সরাসরি ঈমান ও তাওহীদের পরিপন্থী।

৩. পূজামণ্ডপ পরিদর্শন, মেলা ও অর্থায়নের শরঈ বিধান

ক. পূজামণ্ডপ দেখতে যাওয়া বা ঘুরতে যাওয়া

অনেকে বলেন—"আমি তো পূজা করতে যাইনি, শুধু লাইটিং দেখতে বা বন্ধুদের সাথে আনন্দ করতে গিয়েছি।" শরিয়তের দৃষ্টিতে এটিও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কারণ মুশরিকদের উপাসনালয়ে উৎসবের মুহূর্তে আল্লাহর গজব নাজিল হতে থাকে।

সাইয়্যিদুনা উমর ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

لَا تَدْخُلُوا عَلَى الْمُشْرِكِينَ فِي كَنَائِسِهِمْ وَبِيَعِهِمْ يَوْمَ عِيدِهِمْ، فَإِنَّ السَّخْطَةَ تَنْزِلُ عَلَيْهِمْ

অনুবাদ: "তোমরা মুশরিকদের উৎসবের দিনে তাদের উপাসনালয়ে প্রবেশ কোরো না; কেননা তখন তাদের ওপর আল্লাহর গজব নাজিল হতে থাকে।" (আস-সুনানুল কুবরা লিল-বায়হাকী: ১৮৮৬১; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ১৬০৯)

যেখানে আল্লাহর সাথে শিরক হওয়ার কারণে আসমান থেকে লানত ও গজব বর্ষিত হয়, সেখানে একজন মুমিন কীভাবে কৌতূহল বা বিনোদনের উদ্দেশ্যে উপস্থিত হতে পারে? তাছাড়া এতে কাফের ও মুশরিকদের সংখ্যাধিক্য বাড়ানো হয় (تكثير سواد المشركين), যা হাদিস অনুযায়ী স্পষ্ট বর্জনীয়।

খ. পূজার চাঁদা বা অনুদান দেওয়া

পূজার প্যান্ডেল নির্মাণ, প্রতিমা তৈরি বা আয়োজনের জন্য আর্থিক বা কায়িক সাহায্য করা সরাসরি শিরকি কাজে সহযোগিতা করার শামিল।

আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:

وَتَعَاوَنُوا۟ عَلَى ٱلْبِرِّ وَٱلتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا۟ عَلَى ٱلْإِثْمِ وَٱلْعُدْوَٰنِ

অনুবাদ: "তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো; আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা কোরো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)

হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য ফিক্বহগ্রন্থ 'আল-বাহরুর রায়েক' এবং 'ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়া'-তে উল্লেখ রয়েছে:

"যদি কোনো মুসলিম কাফেরদের উৎসবের দিনে তাদের সম্মানার্থে সামান্য একটি ডিমও উপহার দেয়, তবে সে কুফরি কাজে লিপ্ত হলো এবং তার ঈমান বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।" (আল-বাহরুর রায়েক: ৮/৫৫৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৬/৪৪৬)

অতএব, পূজার জন্য চাঁদা দেওয়া, স্পন্সর করা বা ডেকোরেশনের কাজে মুসলিমদের সহায়তা করা সম্পূর্ণরূপে হারাম।

গ. মণ্ডপকেন্দ্রিক মেলা ও বেচাকেনা

পূজামণ্ডপকে কেন্দ্র করে যে মেলা বসে, সেখানে অযথা ঘোরাঘুরি করা, আড্ডা দেওয়া বা দোকানপাট বসিয়ে মেলার জৌলুস বৃদ্ধি করা অনুচিত। তবে যদি মেলাটি সম্পূর্ণ পৃথক কোনো উন্মুক্ত স্থানে সাধারণ বাণিজ্যিক মেলা হয় এবং তাতে কোনো ধর্মীয় প্রতিমা বা অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড না থাকে, তবে সাধারণ নিত্যপণ্য ক্রয়-বিক্রয় করা নাজায়েজ নয়। তবে পূজার সামগ্রী (যেমন: প্রতিমার পোশাক, ফুল, ধূপ ইত্যাদি) বিক্রি করা কোনো অবস্থাতেই জায়েজ নেই।

৪. পূজার প্রসাদ ও অমুসলিমদের তৈরিকৃত খাবার গ্রহণের হুকুম

ক. দেবদেবীর নামে নিবেদিত প্রসাদ

পূজার সময় প্রতিমার সামনে যে মিষ্টি, ফলমূল বা খাদ্য নিবেদন করা হয়—তা গ্রহণ করা মুসলিমদের জন্য সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েজ।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:

إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ ٱلْمَيْتَةَ وَٱلدَّمَ وَلَحْمَ ٱلْخِنزِيرِ وَمَآ أُهِلَّ بِهِۦ لِغَيْرِ ٱللَّهِ

অনুবাদ: "নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের ওপর হারাম করেছেন মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের গোশত এবং এমন বস্তু—যার ওপর আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারণ করা হয়েছে (বা অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে)।" (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৭৩)

প্রসাদ হলো সরাসরি গায়রুল্লাহর সন্তুষ্টি ও পূজার উদ্দেশ্যে নিবেদিত বস্তু। অনেক সময় অমুসলিম প্রতিবেশীরা প্রসাদকে সাধারণ 'মিষ্টি' বলে মুসলিমদের বাসায় পাঠায়। এমন খাবার গ্রহণ করা জায়েজ নেই। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে খাবার ফিরিয়ে দিতে হবে অথবা তা বিনষ্ট করে ফেলতে হবে।

খ. সাধারণ খাবার গ্রহণ

অমুসলিমদের ঘরে তৈরি সাধারণ হালাল খাবার (যা পূজায় দেবদেবীর সামনে পেশ করা হয়নি) খাওয়া মূলত জায়েজ। তবে বর্তমান সময়ে সতর্কতা কাম্য; কারণ পূজার মৌসুমে হিন্দু বাড়িগুলোতে প্রায় সব মিষ্টি ও খাবারের বড় অংশই প্রতিমার কাছে ছুঁইয়ে আনা হয়। যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি তাদের পারিবারিক সাধারণ খাবার এবং তাতে কোনো অপবিত্র বা হারাম উপাদান নেই, তবে তা খাওয়া জায়েজ।

৫. প্রতিবেশী অধিকার, সামাজিক শুভকামনা ও বিভিন্ন অফার

বিশেষ সতর্কতা (শারদীয় শুভেচ্ছা জানানো প্রসঙ্গ):
পূজা উপলক্ষে কোনো অমুসলিমকে "শুভ পূজা", "শারদীয় শুভেচ্ছা" বা "শুভ বিজয়া" বলা জায়েজ নেই। কারণ কোনো পৌত্তলিক উৎসবে শুভেচ্ছা জানানোর অর্থ হলো তাদের উপাসনা ও শিরকের বৈধতা স্বীকার করে নেওয়া।

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ 'আহকামু আহলিয যিম্মাহ'-তে লিখেছেন: "কাফেরদের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও উৎসব উপলক্ষে মোবারকবাদ জানানো সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। কারণ তা তাদের কুফরি প্রতীককে অভিবাদন জানানোর শামিল।"

ক. ব্যক্তিগত ও সামাজিক শুভকামনা

কোনো অমুসলিম প্রতিবেশীর ব্যক্তিগত জীবনে সুখবর—যেমন: বিবাহ, সন্তান জন্মলাভ, অসুস্থতা থেকে আরোগ্য, ব্যবসায়িক সাফল্য বা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মতো সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক বিষয়ে তাদেরকে শুভেচ্ছা জানানো, উপহার দেওয়া বা তাদের বাড়ি যাওয়া সম্পূর্ণ জায়েজ।

খ. করপোরেট ও বাণিজ্যিক পূজা অফার গ্রহণ

মোবাইল অপারেটর, ব্যাংক বা বিভিন্ন শপিংমল পূজা উপলক্ষে ডিসকাউন্ট, বিশেষ ডাটা অফার বা ক্যাশব্যাক দিয়ে থাকে। এটি নিছক একটি বাণিজ্যিক প্রচার ও ব্যবসায়িক সুবিধা। যদি এই সুবিধা গ্রহণের মধ্যে কোনো শিরকি কাজ বা সরাসরি প্রতিমা পূজার সমর্থন না থাকে, তবে একজন গ্রাহক হিসেবে ছাড়কৃত মূল্যে পণ্য বা অফার গ্রহণ করা জায়েজ।

গ. প্রতিষ্ঠান বা অফিস বন্ধ রাখা

পূজার প্রতি ধর্মীয় সম্মান প্রদর্শন বা পূজার ছুটি উদযাপনের উদ্দেশ্যে কোনো মুসলিমের জন্য নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা নাজায়েজ। তবে যদি এলাকার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ক্রেতা না থাকা বা সম্ভাব্য লোকসান ও নিরাপত্তার কারণে দোকান বন্ধ রাখা হয়, তবে তা গুনাহ হবে না।

৬. মানব ইতিহাসের প্রথম শিরকের ইতিহাস ও আমাদের শিক্ষা

মানুষ সৃষ্টিগতভাবে একত্ববাদী (মুওয়াহহিদ) ছিল। হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে পরবর্তী দশ প্রজন্ম পর্যন্ত পৃথিবীতে কোনো মূর্তিপূজা ছিল না। তাহলে মানুষ কীভাবে শিরকে জড়িয়ে পড়ল?

সহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে:

সূরা নূহের ২৩ নম্বর আয়াতে উল্লেখিত পাঁচজন ব্যক্তিত্ব—ওদ্দ (وَدّ), সুওয়া (سُوَاع), ইয়াগূস (يَغُوث), ইয়াঊক্ব (يَعُوق) এবং নাসর (نَسْر) মূলত হযরত নূহ আলাইহিস সালামের কওমের অত্যন্ত পরহেজগার ও আল্লাহর অলি ছিলেন। যখন তাঁরা ইন্তেকাল করলেন, তখন শয়তান তাদের অনুসারীদের অন্তরে কুমন্ত্রণা দিল যে:

"তোমরা তাঁদের বসার স্থানগুলোতে তাঁদের স্মরণে কিছু ভাস্কর্য বা স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করো এবং তাঁদের নামেই সেগুলোর নামকরণ করো, যাতে তাঁদের দেখে তোমাদের ইবাদতের উদ্দীপনা বাড়ে।"

লোকেরা আবেগের বশবর্তী হয়ে তাই করল। যতদিন সেই প্রজন্মের আলেমরা জীবিত ছিলেন, ততদিন সেগুলোর উপাসনা করা হয়নি। কিন্তু যখন সেই প্রজন্ম মারা গেল এবং সঠিক জ্ঞান বিলুপ্ত হলো, তখন পরবর্তী প্রজন্ম ভাবল—আমাদের পূর্বপুরুষরা এদেরই পূজা করত এবং এদের মাধ্যমেই বৃষ্টি প্রার্থনা করত। ফলে তারা সরাসরি সেই মূর্তিগুলোর পূজা শুরু করে দিল। (সহীহ বুখারী: ৪৯২০)

ঐতিহাসিক শিক্ষা:
শয়তান কখনোই মানুষকে এক লাফে শিরকে লিপ্ত করে না। সে প্রথমে মানুষের ভেতর 'অতিরিক্ত ভক্তি', 'উদারতা' এবং 'শিল্প-সংস্কৃতির ছদ্মবেশে' শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটায়। যে ব্যক্তি আজ 'ধর্ম যার যার উৎসব সবার' বলে পূজামণ্ডপের লাইটিং দেখতে যায়, তার সন্তান কাল অবলীলায় প্রতিমার সামনে অঞ্জলি দিতে দ্বিধাবোধ করবে না।

[support-banner]

উপসংহার ও সমকালীন প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয়

ইসলাম সাম্য, ন্যায়বিচার এবং শান্তির ধর্ম। অমুসলিম নাগরিকদের অধিকারের ক্ষেত্রে ইসলাম পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সংবিধান উপহার দিয়েছে। কিন্তু এই সহনশীলতার অর্থ কখনোই নিজের ঈমান ও তাওহীদকে বিসর্জন দেওয়া নয়।

বর্তমান ফেতনার যুগে পূজার মৌসুমে আমাদের প্রধান করণীয় হলো:

  • তাওহীদের শিক্ষা পরিবারের মাঝে জাগ্রত রাখা: আমাদের সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের শিরকের ভয়াবহতা এবং ইসলামের সৌন্দর্য সম্পর্কে সচেতন করতে হবে, যেন তারা কোনো মেকি সাংস্কৃতিক ফাঁদে পা না দেয়।
  • আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়া: কোনো মণ্ডপ বা অমুসলিমদের ওপর কোনো ধরনের আক্রমণ, ভাঙচুর বা অবমাননাকর আচরণ করা সম্পূর্ণ হারাম ও অপরাধ। ইসলাম সংখ্যালঘু নাগরিকদের পূর্ণ জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
  • উদারতার ভুল সংজ্ঞা বর্জন করা: অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি নাগরিক সহানুভূতি বজায় রাখতে হবে, তবে তাদের ধর্মীয় আচারে একাত্মতা প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • হিকমতের সাথে সুন্দর দাওয়াত পেশ করা: কাদা-ছোড়াছুড়ি না করে সুন্দর আচরণ ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে তাওহীদের সুমহান বাণী অমুসলিম বন্ধুদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সকলকে যাবতীয় প্রকাশ্য ও গোপন শিরক থেকে হিফাজত করুন, সহীহ দ্বীনি বুঝ দান করুন এবং দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।

সম্পর্কিত ট্যাগসমূহ:
লেখাটি ভালো লাগলে আপনার দোয়া বা অনুভূতি জানান
নিচের যেকোনো বোতামে ক্লিক করলে সরাসরি মন্তব্যের ঘরে প্রকাশ করার ব্যবস্থা হবে:
মন্তব্যসমূহ
দোয়াটি সফলভাবে কপি হয়েছে! নিচের কমেন্ট বক্সে পেস্ট (Paste) করে মন্তব্যটি সবার সাথে শেয়ার করুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন