আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতিকে একা বাঁচার জন্য সৃষ্টি করেননি; বরং পরস্পর মিলেমিশে এক শান্তিময় ও সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনের বিধান দিয়েছেন। ইসলাম কেবল নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের মতো আনুষ্ঠানিক ইবাদতের নাম নয়; বরং বান্দার হক বা ‘হুকুকুল ইবাদ’ আদায় করা ঈমানের অন্যতম মৌলিক শর্ত। আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা চাইলে ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু বান্দার হক এমন এক স্পর্শকাতর বিষয়—যতক্ষণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ক্ষমা না করবে, ততক্ষণ স্বয়ং আল্লাহ তাআলাও তা মাফ করবেন না। আর এই বান্দার হকের তালিকায় পিতা-মাতার পরেই পবিত্র কুরআনে সবচেয়ে বেশি তাগিদ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেশীর অধিকার বা হকের ব্যাপারে।
[toc]১. পবিত্র কুরআনে প্রতিবেশীর অধিকার ও গুরুত্ব
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নিজের তাওহিদ ও একক ইবাদতের নির্দেশের পরপরই পিতা-মাতার হক এবং এর ঠিক পরেই প্রতিবেশীর অধিকারের কথা ঘোষণা করেছেন।
সরল অনুবাদ: "আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সাথে কাউকে শরিক কোরো না। পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো এবং নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকিন, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী এবং তোমাদের সহযাত্রী-সঙ্গীদের সাথেও ভালো ব্যবহার করো।" (সূরা আন-নিসা: ৩৬)
আম্মাজান আয়েশা (রা.) ও আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
অর্থ: "জিবরাইল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ ও তাগিদ দিচ্ছিলেন যে, আমার মনে হচ্ছিল তিনি হয়তো প্রতিবেশীকে আমার সম্পত্তির ওয়ারিশ [টীকা ১] বানিয়ে দেবেন!" (সহিহ বুখারি: ৬০১৪, সহিহ মুসলিম: ২৬২৪)
২. প্রতিবেশীর পরিচয় ও এর সীমানা কত দূর?
আমরা অনেকেই মনে করি, কেবল দেওয়াল ঘেরা পাশের বাড়িটিই বুঝি প্রতিবেশী। কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রতিবেশীর পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী:
- চারপাশের ৪০ ঘর: সাহাবি ও তাবেঈনদের বিশুদ্ধ অভিমত অনুযায়ী, নিজের ঘরের চারপাশের—সামনে ৪০ ঘর, পেছনে ৪০ ঘর, ডানে ৪০ ঘর এবং বাঁয়ে ৪০ ঘর—মোট ১৬০ ঘরের সবাই প্রতিবেশীর অন্তর্ভুক্ত। (শুআবুল ঈমান: ৯১১১)
- আযানের আওয়াজের পরিধি: আমিরুল মুমিনিন হজরত আলী (রা.)-এর মতে, যে ব্যক্তি মহল্লার স্বাভাবিক কণ্ঠের আযান বা মানুষের সাধারণ আওয়াজ শুনতে পায়, সে-ও প্রতিবেশী।
- ফজরের জামাতে উপস্থিতি: জুমার ও মহল্লার মুসল্লিদের মধ্যে যারা নিয়মিত মসজিদে আপনার সাথে ফজরের নামাজে শরিক হয়, তারা আপনার নিকটতম প্রতিবেশী।
- সাময়িক প্রতিবেশী (الصاحب بالجنب): আপনি যখন বাস, ট্রেন বা বিমানে সফর করেন, তখন পাশের সিটে বসা যাত্রী আপনার সাময়িক প্রতিবেশী। এছাড়া কর্মক্ষেত্রের সহকর্মী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহপাঠী কিংবা বাজারের পাশের দোকানদারও প্রতিবেশীর অন্তর্ভুক্ত।
৩. ইসলামে প্রতিবেশীর ৩টি শ্রেণিবিভাগ
রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রতিবেশীকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন, যাদের দায়িত্ব ও অধিকার কমবেশি রয়েছে:
- ১. তিন হক বিশিষ্ট প্রতিবেশী: যে ব্যক্তি একাধারে মুসলিম, আত্মীয় এবং প্রতিবেশী। তার হক ৩টি—ইসলামের হক, আত্মীয়তার হক এবং প্রতিবেশীর সামাজিক হক।
- ২. দুই হক বিশিষ্ট প্রতিবেশী: যে ব্যক্তি মুসলিম এবং প্রতিবেশী (কিন্তু আত্মীয় নয়)। তার হক ২টি—ইসলামের হক এবং প্রতিবেশীর হক।
- ৩. এক হক বিশিষ্ট প্রতিবেশী: যে অমুসলিম প্রতিবেশী—সে হিন্দু হোক, বৌদ্ধ হোক, খ্রিস্টান হোক বা অন্য কোনো ধর্মাবলম্বী হোক। তারও ইসলামে সুনির্দিষ্ট হক রয়েছে—সেটি হলো মানবিক অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও সদাচরণের হক।
৪. প্রতিবেশীর পূর্ণাঙ্গ অধিকার সংক্রান্ত جامع (ব্যাপক) হাদিস
ইমাম খারায়েতী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব ‘মাকারিমুল আখলাক’-এ প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে একটি হৃদয়স্পর্শী দীর্ঘ হাদিস সংকলন করেছেন। এখানে প্রতিটি বাক্যে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ লুকিয়ে রয়েছে:
হাদিসের প্রতি বাক্যের অর্থ ও শিক্ষা:
- «مَنْ أَغْلَقَ بَابَهُ دُونَ جَارِهِ مَخَافَةً عَلَى أَهْلِهِ وَمَالِهِ فَلَيْسَ ذَلِكَ بِمُؤْمِنٍ» — যে ব্যক্তি পরিবার বা সম্পদের ক্ষতির আশঙ্কায় (কৃপণতা বা অনাস্থাবশত) প্রতিবেশীর জন্য নিজের দরজা বন্ধ করে দেয়, সে পরিপূর্ণ মুমিন নয়।
- «وَلَيْسَ بِمُؤْمِنٍ مَنْ لَمْ يَأْمَنْ جَارُهُ بَوَائِقَهُ» — এবং সে-ও মুমিন নয়, যার অনিষ্ট ও অত্যাচার থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না।
- «إِذَا اسْتَعَانَكَ أَعَنْتَهُ» — সে কোনো প্রয়োজনে সাহায্য চাইলে তাকে সাহায্য করা।
- «وَإِذَا اسْتَقْرَضَكَ أَقْرَضْتَهُ» — সে ঋণ চাইলে তাকে সুদমুক্ত করজে হাসানা দেওয়া।
- «وَإِذَا افْتَقَرَ عُدْتَ عَلَيْهِ» — সে অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়লে তাকে আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে পাশে দাঁড়ানো।
- «وَإِذَا مَرِضَ عُدْتَهُ» — সে অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া এবং খোঁজখবর নেওয়া।
- «وَإِذَا أَصَابَهُ خَيْرٌ هَنَّأْتَهُ» — তার কোনো উন্নতি বা শুভ সংবাদে (বিয়ে, পরীক্ষা বা রিজিক) নিজ থেকেই দ্রুত গিয়ে মোবারকবাদ ও শুভেচ্ছা জানানো।
- «وَإِذَا أَصَابَتْهُ مُصِيبَةٌ عَزَّيْتَهُ» — সে কোনো বিপদে বা সংকটে পড়লে সবার আগে গিয়ে সমবেদনা ও সান্ত্বনা দেওয়া।
- «وَإِذَا مَاتَ اتَّبَعْتَ جَنَازَتَهُ» — সে মারা গেলে জানাজা ও কাফন-দাফনে শরিক হওয়া।
- «وَإِنْ أَعْوَزَ سَتَرْتَهُ» — (তাবারানীর বর্ণনা) সে অপ্রস্তুত হলে বা কোনো দোষ-ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে তা সমাজে ছড়িয়ে না দিয়ে পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখা।
৫. বাস্তব জীবনের সূক্ষ্ম শিষ্টাচার (যা আমরা অনেকেই অবহেলা করি)
১. বাড়ি উঁচু করে আলো-বাতাস বন্ধ না করা:
হাদিসে স্পষ্ট এসেছে: «وَلَا تَسْتَطِلْ عَلَيْهِ بِالْبُنْيَانِ فَتَحْجُبَ عَنْهُ الرِّيحَ إِلَّا بِإِذْنِهِ» — অর্থাৎ, "প্রতিবেশীর অনুমতি ছাড়া নিজের ভবন বা দেওয়ালকে এত উঁচু কোরো না, যাতে তার আলো-বাতাস বন্ধ হয়ে যায়।"
আমাদের সমাজে দেওয়াল তোলা নিয়ে ঝগড়া, প্রতিবেশীর সীমানা চেপে দেওয়া কিংবা গ্রামের জমিতে কোদাল দিয়ে আইল কেটে নিজের জমি বড় করার যে রোগ রয়েছে—তা মারাত্মক কবিরা গুনাহ ও জুলুম।
২. রান্নার সুঘ্রাণ ও খাবারের ভাগ:
হাদিসে বলা হয়েছে: «وَلَا تُؤْذِهِ بِقُتَارِ رِيحِ قِدْرِكَ إِلَّا أَنْ تَغْرِفَ لَهُ مِنْهَا» — অর্থাৎ, "তোমার রান্নার সুঘ্রাণ দিয়ে তাকে কষ্ট দিও না, যদি না তুমি সেখান থেকে এক চামচ তার ঘরে পাঠাও।"
রাসুলুল্লাহ ﷺ হজরত আবু যর (রা.)-কে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন: "যখন তুমি ঝোলযুক্ত সালুন রান্না করো, তখন তাতে পানির পরিমাণ বাড়িয়ে দাও এবং প্রতিবেশীর ঘরে কিছু পৌঁছে দাও।" (সহিহ মুসলিম: ২৬২৫)
৩. ফলমূলের শিষ্টাচার ও প্রতিবেশীর শিশুর অনুভূতি রক্ষা:
হাদিসের শেষ ভাগে বলা হয়েছে: বাজার থেকে ফলমূল কিনে আনলে প্রতিবেশীর ঘরে কিছু হাদিয়া পাঠাও। যদি সামর্থ্য না থাকে, তবে তা গোপনে ঘরে নিয়ে যাও। আর তোমার সন্তান যেন তা হাতে নিয়ে বাইরে না যায়, যাতে তা দেখে প্রতিবেশীর দরিদ্র সন্তানের মনে ক্ষোভ বা কান্নার সৃষ্টি হয়। ইসলাম প্রতিবেশীর মনস্তত্ত্বের কতটা নিখুঁত খেয়াল রেখেছে, ভাবা যায়!
৬. প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার ভয়াবহ পরিণতি
প্রতিবেশীর অধিকার নষ্ট করা বা তাদের মুখে বা কর্মে কষ্ট দেওয়ার পরিণাম অত্যন্ত মারাত্মক:
- ঈমান হারানোর তীব্র ঘোষণা: রাসুলুল্লাহ ﷺ তিনবার কসম খেয়ে বলেছেন: "আল্লাহর কসম সে মুমিন নয়! যার অনিষ্ট ও অত্যাচার থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না।" (সহিহ বুখারি: ৬০১৬)
- জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়া: নবীজী ﷺ ইরশাদ করেন: "সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যার অনিষ্ট ও ক্ষতি থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না।" (সহিহ মুসলিম: ৪৬)
- নফল ইবাদত সত্ত্বেও জাহান্নামি হওয়া: এক নারী সম্পর্কে নবীজী ﷺ-কে বলা হলো যে সে প্রচুর নফল নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এবং দান-সদকা করে; কিন্তু সে মুখের ভাষা দিয়ে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ পরিষ্কার বললেন: «لَا خَيْرَ فِيهَا، هِيَ فِي النَّارِ» — "তার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, সে জাহান্নামি।" (মুসনাদে আহমাদ: ৯৬৭৫)
- শিংবিহীন ছাগলের বদলা (হকের পাই পাই হিসাব): সহিহ মুসলিমের ২৫৮২ নং হাদিসে এসেছে—কেয়ামতের দিন শিংবিহীন ছাগলকে গুঁতো মারার অপরাধে শিংওয়ালা ছাগল থেকেও বদলা নেওয়া হবে। যেখানে অবলা পশুর হিসাব ছাড় দেওয়া হবে না, সেখানে প্রতিবেশীর হক নষ্টকারী কীভাবে পার পাবে?
৭. সাহাবায়ে কেরামের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত (আত্মত্যাগ বা ঈসার)
সাহাবায়ে কেরাম ক্ষুধার্ত প্রতিবেশীর হক আদায়ে নিজেদের সন্তানদের চেয়েও অন্যকে প্রাধান্য দিতেন। একবার এক ক্ষুধার্ত ব্যক্তি নবীজীর দরবারে এলে ঘরে পানি ছাড়া কিছু ছিল না। এক আনসার সাহাবি তাকে নিজ ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরে গিয়ে দেখেন কেবল বাচ্চাদের জন্য সামান্য খাবার রয়েছে। তিনি স্ত্রীকে বললেন: "বাচ্চাদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। মেহমানের সামনে খাবার দিয়ে বাতি ঠিক করার বাহানায় নিভিয়ে দাও, যাতে সে পেট পুরে খেতে পারে আর মনে করে আমরাও খাচ্ছি।"
সকালে রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিকে দেখে হেসে বললেন—তোমাদের রাতের এই আত্মত্যাগে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা আরশ থেকে অত্যন্ত খুশি হয়েছেন এবং কুরআনের এই আয়াত নাজিল করেছেন:
"তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত থাকে।" (সূরা আল-হাশর: ৯)
উপসংহার ও আমাদের আমলি অঙ্গীকার
আসুন, আজকের এই আলোচনা থেকে আমরা বাস্তব জীবনে কয়েকটি সংকল্প করি:
- অতীতে আমার কোনো কথা বা কাজে কোনো প্রতিবেশী কষ্ট পেয়ে থাকলে আজই ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেব।
- ঘরে ভালো খাবার রান্না হলে সাধ্যমতো এক বাটি প্রতিবেশীর ঘরে হাদিয়া পাঠানোর অভ্যাস গড়ে তুলব।
- প্রতিবেশীর বাড়ির সামনে ময়লা ফেলে, উচ্চশব্দে কিছু বাজিয়ে কিংবা দেওয়াল-সীমানা নিয়ে কোনোভাবেই প্রতিবেশীকে হয়রানি করব না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সবাইকে প্রতিবেশীর হক যথাযথভাবে আদায় করে খাঁটি মুমিন হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন