ডিজিটাল প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে স্মার্টফোনের সেন্সর, জিপিএস এবং ক্বিবলা কম্পাস অ্যাপ এখন আমাদের সবার হাতের মুঠোয়। এই প্রযুক্তিগত সুবিধা যেমন বহু ক্ষেত্রে আমাদের জন্য দিক নির্ণয় সহজ করে দিয়েছে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ মুসলিম ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির মাঝে তৈরি করেছে এক বিরাট মানসিক অস্থিরতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব (ওয়াসওয়াসা)। বিশেষ করে যখন দেখা যায়—মোবাইলের কম্পাস অনুযায়ী ক্বিবলার আসল দিক দেখাচ্ছে ২৭৭°, অথচ ঘরের দেয়াল কিংবা বহু বছর ধরে চলে আসা কোনো জামে মসজিদের দেয়াল বা মেহরাব বরাবর মোবাইল স্পর্শ করলে ডিগ্রি দেখাচ্ছে ২৬১°, ২৬৫°, ২৬৬° কিংবা ২৬৯°। অর্থাৎ ক্বিবলার আসল দিক থেকে দেয়ালটি প্রায় ৮° থেকে ১৬° বা তার কাছাকাছি বামে (দক্ষিণে) হেলে রয়েছে।
এই সামান্য পার্থক্য দেখে অনেক স্থানে সাধারণ মুসল্লিরা চরম সংশয়ে ভোগেন: “এই মসজিদে এতদিন ধরে যে নামাজ আদায় করা হলো, তা কি বাতিল হয়ে গেল? মেহরাব ও দেয়াল কি ভেঙে ক্বিবলার ডিগ্রি অনুযায়ী পুনর্নির্মাণ করতে হবে? নাকি বিদ্যমান মেহরাব সোজা রেখে কার্পেট বা কাতার বাঁকা করে আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে হবে?”
শরিয়তের দৃষ্টিতে মক্কা থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষের জন্য ক্বিবলার ঠিক কত ডিগ্রি পর্যন্ত বিচ্যুতি ক্ষমাযোগ্য, মসজিদে নববীর ঐতিহাসিক আমল কী ছিল এবং দেওবন্দ, করাচি, বিন্নুরী টাউন, দক্ষিণ আফ্রিকার আজাদভিলি ও যুক্তরাজ্যের জেকেএন (JKN) ফতোয়াসহ বিশ্বের নির্ভরযোগ্য ফতোয়া বোর্ডগুলোর কী ফয়সালা—তা এই দীর্ঘ গবেষণামূলক প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
[toc]১. মূল ফিকহী উসূল: ‘আইনুল কাবা’ বনাম ‘জিহাতুল কাবা’
ইসলামী ফিকহশাস্ত্রের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্বিবলামুখী হওয়ার দুটি মৌলিক স্তর রয়েছে। এই পার্থক্যটি স্পষ্টভাবে না বোঝার কারণেই মূলত সাধারণ মানুষের মনে সংশয় তৈরি হয়:
১. আইনুল কাবা (عین الکعبة)
সরাসরি কাবা শরিফের মূল পাথুরে অবকাঠামোর অনুবিন্দু বরাবর নিখুঁতভাবে মুখ রাখা। শরিয়তের অকাট্য নীতি অনুযায়ী—এটি কেবল এবং কেবলমাত্র তাদের জন্য ফরজ ও ওয়াজিব, যারা সরাসরি মসজিদুল হারামের ভেতরে উপস্থিত এবং নিজ চোখে কাবা শরিফ প্রত্যক্ষ করছেন।
২. জিহাতুল কাবা (جهة الکعبة)
কাবার সাধারণ ‘দিক’ বা চতুর্থাংশের অভিমুখী হওয়া। মক্কা মুকাররমা থেকে দূরবর্তী যেকোনো দেশ ও অঞ্চলের মানুষের জন্য (যেমন: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য কিংবা দূরপ্রাচ্য) কাবার সূক্ষ্ম পিনপয়েন্ট বা আইনুল কাবা মেপে দাঁড়ানো শর্ত নয়; বরং কাবার সামগ্রিক দিকের প্রতি মুখ রাখাই শরিয়তের আসল বিধান।
দূরবর্তী অঞ্চলের কোনো মানুষের ওপর জ্যামিতিক বা কম্পাসের ১ ডিগ্রির সূক্ষ্ম বিচ্যুতি ছাড়াই শতভাগ নিখুঁতভাবে কাবার কেন্দ্রবিন্দুতে মুখ করার দায়িত্ব শরিয়ত অর্পণ করেনি। কারণ শরিয়ত মানুষকে এমন কোনো সংকীর্ণতার মধ্যে ফেলে না যা দূরবর্তী স্থান থেকে পালন করা অসম্ভব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন:
“আল্লাহ কোনো ব্যক্তির ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা বা দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।” (সূরা আল-বাকারাহ: ২৮৬)
২. বাস্তব পরীক্ষা: একটি ঘরের দেয়াল ও মোবাইলের ভিন্ন ভিন্ন রিডিং
ডিজিটাল কম্পাস যে সর্বদা শতভাগ অভ্রান্ত নয় এবং ঘরের অভ্যন্তরীণ পরিবেশেই রিডিংয়ের ব্যাপক তারতম্য ঘটে, তা আমাদের বাস্তব পরীক্ষাতেই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তেলিয়া (বাংলাদেশ) থেকে একটি নির্দিষ্ট ঘরের ক্বিবলা কম্পাস ও দেয়ালের এঙ্গেল পরিমাপ করে নিচের ফলাফল পাওয়া যায়:
স্ক্রিনশটের বিশ্লেষণ:
প্রথম ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ক্বিবলা কম্পাস অ্যাপ অনুযায়ী বর্তমান লোকেশন থেকে কাবার প্রকৃত দিক হলো ২৭৭° (পশ্চিম থেকে সামান্য উত্তর দিকে)। কিন্তু একই ঘরের বিভিন্ন দেয়ালে মোবাইল স্পর্শ করলে রিডিং পাওয়া যাচ্ছে যথাক্রমে ২৬১°, ২৬৫°, ২৬৬° এবং ২৬৯°।
অর্থাৎ ক্বিবলার মূল দিক (২৭৭°) থেকে দেয়ালগুলোর পার্থক্য যথাক্রমে ১৬°, ১২°, ১১° এবং ৮°। ঘরের ভেতরে থাকা কংক্রিটের রড, বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং এবং চৌম্বক ক্ষেত্রের কারণে মোবাইল সেন্সর কয়েক ডিগ্রি ওঠানামা করছে। সুতরাং শুধুমাত্র মোবাইল স্ক্রিনের ডিগ্রি দেখে কোনো ঘরের কিবলা বা মসজিদের মেহরাব নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো শরিয়তসম্মত নয়।
৩. মসজিদে নববীর ঐতিহাসিক দলিল ও নববী সুন্নাহ
দূরবর্তী অঞ্চলের জন্য যে পিনপয়েন্ট ডিগ্রি নয় বরং সাধারণ দিকই শরিয়তের চূড়ান্ত মানদণ্ড—তার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ও বাস্তব প্রমাণ হলো মদীনা মুনাওয়ারার মসজিদে নববী।
“পূর্ব এবং পশ্চিমের মধ্যবর্তী অংশই হলো কিবলা।” (জামে তিরমিযী, হাদিস: ৩৪২; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১০১১)
যেহেতু মদীনা মুনাওয়ারা থেকে মক্কার কাবা শরিফ সরাসরি দক্ষিণ দিকে অবস্থিত, তাই নবীজি ﷺ পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী পুরো দক্ষিণ দিগন্তকে কিবলা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। বর্তমান আধুনিক স্যাটেলাইট জিপিএস পরিমাপে দেখা গেছে—মদীনার মসজিদে নববীর মূল মেহরাবের দিক এবং সরাসরি কাবার অনুবিন্দুর মধ্যে প্রায় ৪° থেকে ৬° পার্থক্য রয়েছে। শতাব্দী ধরে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও বড় বড় আইম্মায়ে মুজতাহিদিন কেউই সেই মেহরাব ভাঙেননি বা কাতার বাঁকা করেননি।
৩. মসজিদে নববীর ঐতিহাসিক দলিল ও নববী সুন্নাহ (১০ ডিগ্রি বিচ্যুতির প্রমাণ)
দূরবর্তী অঞ্চলের জন্য যে জ্যোতির্বিজ্ঞানের পিনপয়েন্ট ডিগ্রি নয় বরং সাধারণ দিকই শরিয়তের চূড়ান্ত মানদণ্ড—তার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ও বাস্তব প্রমাণ হলো মদীনা মুনাওয়ারার মসজিদে নববী।
“পূর্ব এবং পশ্চিমের মধ্যবর্তী অংশই হলো কিবলা।” (জামে তিরমিযী, হাদিস: ৩৪২; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১০১১)
আল্লামা মাকরিযীর কিতাবুল খিতাত ও দেওবন্দের ফতোয়া:
দারুল উলূম দেওবন্দের অফিসিয়াল ফতোয়ায় (Fatwa ID: 46297) আল্লামা তকীউদ্দীন আল-মাকরিযী (রহ.)-এর বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ ‘আল-মাওয়ায়িজ ওয়াল ই'তিবার বি যিকরিল খিতাত ওয়াল আসার’ (২:২৫৬) এবং মুফতি শফী (রহ.)-এর জাওয়াহিরুল ফিকহ (২:৩৮২-৩৮৩)-এর সূত্রে অত্যন্ত চমৎকার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে:
মিশরের শাসক আহমদ ইবনে তুলুন যখন কায়রোতে তার ঐতিহাসিক জামে মসজিদ নির্মাণ করতে মনস্থ করেন, তখন কিবলার সঠিক দিক জানার জন্য তিনি একদল বিশেষজ্ঞ জ্যোতির্বিদ ও প্রকৌশলীকে মানমন্দিরের যন্ত্রপাতিসহ মদীনা মুনাওয়ারায় পাঠান। সেই পর্যবেক্ষক দল তৎকালীন জ্যোতির্বিজ্ঞানের যন্ত্রপাতি দিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে পান যে—জ্যোতির্বিজ্ঞানের নিখুঁত অঙ্কের তুলনায় মদীনার মসজিদে নববীর কিবলা দক্ষিণ দিকে প্রায় ১০ ডিগ্রি (10 degree towards south) বাঁকা!
দেওবন্দের ফতোয়ায় বলা হয়েছে—জ্যোতির্বিজ্ঞানের যন্ত্রে ১০ ডিগ্রি বাঁকা দেখা গেলেও গোটা মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত ইজমা হলো মসজিদে নববীর কিবলাই শতভাগ নির্ভুল। কারণ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর ওহী ও মুজিযার মাধ্যমে কাবার সরাসরি দর্শন পেয়ে এই মেহরাব স্থাপন করেছেন। সুতরাং মানবনির্মিত কম্পাস বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের যন্ত্রের ১০ বা ২০ ডিগ্রির বিচ্যুতি আল্লাহর কাছে কোনো ধর্তব্য বিষয়ই নয়।
৪. বিচ্যুতির মাত্রা ও শরিয়তের প্রকৃত ফয়সালা
হানাফী ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, মক্কা থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে কিবলার মূল কেন্দ্রবিন্দু থেকে ডানে বা বামে সর্বোচ্চ ৪৫ ডিগ্রি পর্যন্ত (উভয় দিক মিলিয়ে মোট ৯০ ডিগ্রির দিগন্ত) কাবার ‘জিহাত’ বা অভিমুখের অন্তর্ভুক্ত। এই সীমার আলোকে ফতোয়া বোর্ডগুলোর সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিম্নরূপ:
১. বিচ্যুতি ৪৫ ডিগ্রির ভেতরে হলে (স্বাভাবিক বিচ্যুতি):
দেয়াল বা মেহরাব যদি ক্বিবলা থেকে কয়েক ডিগ্রি ডানে বা বামে থাকে (যেমন ৮°, ১০°, ১৩° ইত্যাদি), তবে তা ক্বিবলার সাধারণ দিকের ভেতরেই পড়ে। অতীতে এই অবস্থায় পড়া সকল নামাজ পূর্ণ সহীহ হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত কোনো মসজিদে এমন সামান্য তারতম্যের কারণে মেহরাব ভাঙা কিংবা কার্পেট কেটে আড়াআড়ি কাতার তৈরি করা মাকরূহ; কারণ এতে মুসল্লিদের ভেতর সংশয় ও ফিতনা সৃষ্টি হয়। এমনকি কাতারে মুসল্লিদের স্থান সংকুলান ও কার্পেট সোজা রাখার সুবিধার্থে ৪৫ ডিগ্রির ভেতর ক্বিবলা থেকে সামান্য ঘুরে দাঁড়ানোরও অবকাশ রয়েছে।
দলিল: দারুল উলূম দেওবন্দ (ফতোয়া ২০৯৫৬), অনলাইন ফতোয়া করাচি (ফতোয়া ৯১২৪) এবং JKN ফতোয়া ইউকে।
২. নিশ্চিত বড় বিচ্যুতি প্রমাণিত হলে (যেমন আজাদভিলি ফতোয়ার ৩২° কেস):
যেহেতু বিচ্যুতি ৪৫ ডিগ্রির ভেতরে ছিল, তাই পূর্বে না জেনে আদায়কৃত কোনো নামাজ দোহরাতে বা কাজা করতে হবে না। তবে সূর্য বা নির্ভুল জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাহায্যে যখন নিশ্চিত হওয়া গেছে যে মেহরাবটি ক্বিবলার মূল কেন্দ্র থেকে ৩২ ডিগ্রির মতো বড় ব্যবধানে রয়েছে, তখন বিষয়টি জানার পর ভবিষ্যতে কাতারগুলোকে সঠিক ক্বিবলামুখী করে নেওয়া আবশ্যক (لازم)। এক্ষেত্রেও মসজিদ ভবন ভাঙা হবে না; কেবল কার্পেট বা মেঝের লাইনকে ক্বিবলার সঠিক দিকে ঘুরিয়ে নিতে হবে।
দলিল: দারুল ইফতা আজাদভিলি (মুফতি সাঈদ মোতারা) ও ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৫/৫৪০)।
৩. বিচ্যুতি ৪৫ ডিগ্রির বেশি হয়ে গেলে: নামাজ বাতিল
যদি বিচ্যুতি ক্বিবলার কেন্দ্র থেকে ডানে বা বামে ৪৫ ডিগ্রির সীমা অতিক্রম করে যায়, তবে হানাফী মাযহাব অনুযায়ী ব্যক্তির বুক ক্বিবলার ‘জিহাত’ থেকে পুরোপুরি সরে যায়। ফলে নামাজ ফাসেদ (বাতিল) হয়ে যায়। এমতাবস্থায় নামাজ আদায় জায়েজ নয় এবং পেছনের নামাজও কাজা করা ওয়াজিব।
দলিল: ইসলাম সওয়াল ও জওয়াব (ফতোয়া ১০১৪৪৯) এবং আহসানুল ফাতাওয়া (২/৩১৩)।
উপরে বর্ণিত ৪৫ ডিগ্রির উদারতা ও সহনশীলতার বিধানটি মূলত হানাফী ফিকহ অনুযায়ী। কিন্তু শাফেয়ী মাযহাবে দূরবর্তীদের জন্যও ক্বিবলার সুনির্দিষ্ট বিন্দুর অনুসরণ অনেক বেশি কড়াকড়ি। তাই যে মসজিদে শাফেয়ী মাযহাবের মুসল্লি রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে শাফেয়ী ফিকহের অভিজ্ঞ মুফতিগণের সাথে পরামর্শ করে আমল করা জরুরি। (সূত্র: দারুল ইফতা আজাদভিলি ফতোয়া)।
৫. “কম্পাসের পরিমাপ শরিয়তে চূড়ান্ত নয়”—এর ব্যাখ্যা
ফিকহের কিতাবগুলোতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কম্পাস হলো একটি সহায়ক আলামত মাত্র, এটি কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ শরয়ী দলিল নয়। এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণ দুটি:
- ভৌগোলিক বনাম চৌম্বকীয় উত্তর (True North vs Magnetic North): সাধারণ কম্পাস পৃথিবীর আসল ভৌগোলিক উত্তর নির্দেশ করে না; বরং চৌম্বকীয় উত্তর নির্দেশ করে। এলাকাভেদে এই দুটির মাঝে কয়েক ডিগ্রির স্থায়ী তারতম্য থাকে।
- লোহা ও ইলেকট্রনিক্সের প্রভাব: আধুনিক মসজিদের ছাদ ও পিলারের ভেতরের রড, ফ্যান, সাউন্ড সিস্টেম এবং বৈদ্যুতিক তারের কারণে ম্যাগনেটিক সেন্সর বিভ্রান্ত হয়। তাই খোলা মাঠে কম্পাস যে ডিগ্রি দেখায়, ঘরের ভেতরে তা ৫° থেকে ৮° পর্যন্ত পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।
বছরে এমন দুটি দিন রয়েছে যখন সূর্য সরাসরি মক্কার কাবার ঠিক মাথার ওপর অবস্থান করে (সাধারণ বছরে ২৮ মে ও ১৬ জুলাই, তবে অধিবর্ষ বা লিপ-ইয়ারে তা একদিন এগিয়ে ২৭ মে ও ১৫ জুলাই হয়):
- ২৭ / ২৮ মে: বাংলাদেশ সময় দুপুর ৩:১৮ মিনিটে (মক্কা সময় দুপুর ১২:১৮)।
- ১৫ / ১৬ জুলাই: বাংলাদেশ সময় দুপুর ৩:২৭ মিনিটে (মক্কা সময় দুপুর ১২:২৭)।
৬. বিশ্বখ্যাত দারুল ইফতার ২০টি প্রামাণ্য ফতোয়া ও কিতাবের তথ্যসূত্র
পাঠকদের গভীর অধ্যয়ন এবং প্রামাণ্য অনুসন্ধানের সুবিধার্থে নিচে বিশ্ববিখ্যাত ২০টি মূল ফিকহগ্রন্থ, আধুনিক ফতোয়া সংকলন এবং নির্ভরযোগ্য দারুল ইফতার ক্লিকযোগ্য লিংক তুলে ধরা হলো:
ক. ক্ল্যাসিক্যাল আরবি ফিকহগ্রন্থ (আরবি মূল দলিল)
- রদ্দুল মুহতার আলাদ্দুররিল মুখতার (ফতোয়ায়ে শামী): আল্লামা ইবনে আবেদীন আশ-শামী (রহ.) — কিতাবুছ সালাত, বাব শুরূতিস সালাত (استقبال القبلة), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৩১। দূরবর্তী অঞ্চলের জন্য ‘জিহাতুল কাবা’ ওয়াজিব হওয়ার দলিল।
- আল-বাহরুর রায়েক শারহু কানজিদ দাকায়েক: আল্লামা ইবনে নুজাইম আল-মিশরি (রহ.) — বাবুল কিবলাহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০০। ৪৫ ডিগ্রি পর্যন্ত ইনহিরাফ গ্রহণযোগ্য হওয়ার মূলনীতি।
- বাদায়েউস সানায়ে ফী তারতীবিশ শারায়ে: ইমাম আলাউদ্দীন আল-কাসানী (রহ.) — কিতাবুছ সালাত, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৮। কাবার দিক নির্ধারণের সাধারণ নিয়ম।
- আল-মাবসূত: ইমাম শামসুল আইম্মা আস-সারাখসী (রহ.) — কিতাবুস সালাত, বাবুত তাহরি ফিল কিবলাহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫০।
- আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু: ড. ওয়াহবাহ আয-যুহাইলি (রহ.) — ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৬১ (استقبال القبلة وتحديد الجهة)।
খ. উপমহাদেশীয় মুদ্রিত ফতোয়াগ্রন্থ (উর্দু দলিল)
- আহসানুল ফাতাওয়া: মুফতি রশীদ আহমদ লুধিয়ানভী (রহ.) — ১ম ও ৩য় খণ্ড (سمت قبلہ کی شرعی و فلکی تحقیق - ক্বিবলা নির্ধারণ ও আধুনিক ডিগ্রির তুলনামূলক বিশ্লেষণ)।
- ফাতাওয়া উসমানী: মুফতি মুহাম্মাদ তাকী উসমানী (হাফি.) — ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮০ (قدیم مساجد کے محراب میں معمولی انحراف کا حکم - প্রাচীন মসজিদের মেহরাবে সামান্য বিচ্যুতি প্রসঙ্গে)।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) — ১ম খণ্ড, কিতাবুছ সালাত (محراب مسجد اور قبلہ نما کا اختلاف)।
- ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ: মুফতি আজিজুর রহমান উসমানী (রহ.) — ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯২-৩৯৫ (ক্বিবলার দিক বিচ্যুতি সংক্রান্ত ফতোয়া)।
- ফাতাওয়া রহিমিয়্যাহ: মুফতি সাইয়্যেদ আব্দুর রহীম লাজপুরী (রহ.) (গুজরাট, ভারত) — ৪র্থ খণ্ড, সালাত অধ্যায়।
- ফাতাওয়া মাহমূদিয়্যাহ: ফকীহুল মিল্লাত মুফতি মাহমূদ হাসান গাঙ্গুহী (রহ.) — ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১৫ (মসজিদে ৩২° বিচ্যুতি সংশোধন সংক্রান্ত ফতোয়া)।
- ফাতাওয়া হাক্কানিয়্যাহ: দারুল উলূম হাক্কানিয়া আকোড়া খটক — ২য় খণ্ড, কিতাবুছ সালাত (আধুনিক কম্পাস ও ক্বিবলার দিক)।
গ. আধুনিক ফতোয়া পোর্টাল ও অনলাইন রেফারেন্স (ক্লিকযোগ্য লিংক)
দারুল উলূম দেওবন্দ ফতোয়া নং ২০৯৫৬ পড়ুন →
দারুল উলূম দেওবন্দ ফতোয়া নং ৪৬২৯৭ পড়ুন →
জামিয়া ফারুকিয়া করাচি ফতোয়া নং ৯১২৪ পড়ুন →
দারুল ইফতা ইনফো ফতোয়া cai5 পড়ুন →
মাসিক আল-কাউসার ফতোয়া নং ২৩৬৭ পড়ুন →
দারুল ইফতা আজাদভিলি ফতোয়া পড়ুন →
ইসলাম কিউএ ফতোয়া নং ১০১৪৪৯ পড়ুন →
JKN Fatawa গবেষণা পোস্টটি পড়ুন →
পরিশেষ: আমাদের মানসিক প্রশান্তি ও করণীয়
ইসলাম সংকীর্ণতার ধর্ম নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা দ্বীনকে সহজ করেছেন। হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে সাধারণ মানুষের পক্ষে কাবার নিখুঁত মিলিমিটার বা ডিগ্রি ধরে দাঁড়ানো অসম্ভব বলেই শরিয়ত “জিহাত বা দিক”-কে ফরজ করেছে, “আইন বা পিনপয়েন্ট”-কে নয়।
অতএব, আপনার ঘরের দেয়াল কিংবা স্থানীয় কোনো মসজিদ যদি ক্বিবলার মূল কোণ (বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে প্রায় ২৭৭°) থেকে ৮°, ১০° বা ১৫° ডানে-বামে থাকে, তবে তা নিয়ে কোনো সংশয় পুষে রাখা শয়তানি ওয়াসওয়াসা ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে কারো নামাজ সামান্যতমও নষ্ট হবে না। অযথা পুরোনো মসজিদগুলোর মেহরাব ভাঙা বা কাতার বাঁকা করে মুসল্লিদের হৃদয়ে ফাটল সৃষ্টি করা থেকে বিরত থেকে আল্লাহভীতি ও একাগ্রতার সাথে সালাত কায়েম করাই প্রতিটি মুমিনের পবিত্র দায়িত্ব।








একটি মন্তব্য পোস্ট করুন