বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের, যিনি মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য বাকশক্তি দান করেছেন। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক মানবতার মুক্তির দূত, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর, যিনি উম্মতকে জবানের হেফাজত এবং আখিরাতের জবাবদিহিতার পথ প্রদর্শন করেছেন।
১. ভূমিকা: বাকশক্তি কুদরতের এক অনুপম নিয়ামত ও বৈজ্ঞানিক রহস্য
আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে অগণিত নিয়ামতে ধন্য করেছেন। মানুষের প্রতিটি অঙ্গ আল্লাহর এক একটি কুদরতের নিদর্শন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
وَإِن تَعُدُّوا نِعْمَتَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا
“তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও, তবে তা গুনে শেষ করতে পারবে না।” [সূরা ইবরাহীম: ৩৪]
এই অগণিত নিয়ামতের মাঝে অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত হলো—‘আল-বায়ান’ বা মনের ভাব প্রকাশ করার বাকশক্তি। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
الرَّحْمَٰنُ عَلَّمَ الْقُرْآنَ خَلَقَ الْإِنسَانَ عَلَّمَهُ الْبَيَانَ
“পরম করুণাময় আল্লাহ! তিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে মনের ভাব প্রকাশ করতে (কথা বলতে) শিখিয়েছেন।” [সূরা আর-রহমান: ১-৪]
কথা বলার পেছনের বৈজ্ঞানিক বিস্ময়
বিজ্ঞান আজ প্রমাণ করেছে যে, মানুষের কথা বলার প্রক্রিয়াটি অতি জটিল এক নিউরোলজিক্যাল ও ফিজিওলজিক্যাল সমন্বয়:
✦ মানুষের মস্তিষ্কের বাম অর্ধাংশ (Left Hemisphere) মূলত ভাষা উৎপাদন ও কথা বলার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
✦ যখনই মানুষ কোনো কথা বলতে চায়, মস্তিষ্ক তাৎক্ষণিকভাবে ফুসফুসকে বাতাস নির্গমনের সংকেত পাঠায়।
✦ ফুসফুস থেকে নির্গত নিয়ন্ত্রিত বাতাস স্বরযন্ত্র বা ল্যারিঙ্কসে (Larynx) গিয়ে পৌঁছায়।
✦ স্বরযন্ত্রে থাকা ভোকাল কর্ডের (Vocal Cords) অতি সূক্ষ্ম কম্পনের ফলে মৌলিক শব্দ বা কম্পাঙ্ক তৈরি হয়।
✦ এরপর গলবিল, জিহ্বা, তালু, দাঁত ও দুই ঠোঁটের নিখুঁত সঞ্চালনের মাধ্যমে সেই বাতাস বিভিন্ন বর্ণ, শব্দ ও পূর্ণ বাক্যে রূপান্তরিত হয়।
শৈশবে পেশি ও স্নায়ুর সমন্বয় থাকে না বলে শিশুরা অস্পষ্ট কথা বলে। ধীরে ধীরে আল্লাহ তাআলা এই মাংসের টুকরো জিহ্বাটিকে এত সুনিপুণ নিয়ন্ত্রণ দেন যে, মানুষ হাজারো ভাষা অনর্গল প্রকাশ করতে পারে। সুবহানাল্লাহ! অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়—যে জবান আল্লাহর দেওয়া এত বড় মুজিযা, আজ তা-ই আমাদের পাপের সবচেয়ে বড় উৎসে পরিণত হয়েছে।
২. জবানের অভাবনীয় ক্ষমতা ও সমকালীন বাস্তবতা
إِنَّمَا يُعْرَفُ عَقْلُ الرَّجُلِ بِلِسَانِهِ
“কথার মাধ্যমেই মানুষের বিবেক ও বুদ্ধিমত্তা চেনা যায়।”
শব্দের ক্ষমতা যে কত তীব্র ও গভীর, তা সামান্য গভীরভাবে ভাবলেই অনুধাবন করা যায়:
একজন পরনারী, যার দিকে তাকানোও শরীয়তে সম্পূর্ণ হারাম ছিল; সাক্ষী ও সম্মতির ভিত্তিতে শুধু দুটি শব্দ বলা হলো—‘আমি কবুল করলাম’। মুহূর্তের মধ্যে সে আজীবনের পরম আত্মীয়া ও হালাল জীবনসঙ্গিনী হয়ে গেল। আবার রাগের মাথায় এই মুখ দিয়েই উচ্চারণ করা হলো মাত্র একটি শব্দ—‘তালাক’। কোনো অস্ত্র বা যুদ্ধ ছাড়াই আজীবনের ভালোবাসার সঙ্গীটি চিরতরে পরনারী হয়ে গেল!
সামান্য জিহ্বার লাগামহীনতার কারণে মানুষের আজীবনের সম্মান ধূলিসাৎ হয়। সমকালীন রাজনীতিতেও আমরা দেখেছি, অবজ্ঞাসূচক একটি শব্দের কারণে ক্ষমতা ও মসনদ তছনছ হয়ে যায়, কোটি মানুষের হৃদয়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে।
মনে রাখবেন, ইসলামে কেবল মুখ দিয়ে আওয়াজ করাই কথা নয়—স্মার্টফোনের স্ক্রিনে আঙুল দিয়ে টাইপ করাও জবানের হুকুম রাখে! ফেসবুকে কটু মন্তব্য, ট্রোলিং, স্ক্রিনশট ছড়িয়ে অন্যের সম্মানহানি, মিথ্যা গুজব ছড়ানো—এগুলো সবই জবানের মারাত্মক গুনাহ।
وَقُل لِّعِبَادِي يَقُولُوا الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنزَغُ بَيْنَهُمْ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلْإِنسَانِ عَدُوًّا مُّبِينًا
“আর আমার বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন সর্বোত্তম ও সুন্দর কথাই বলে। নিশ্চয়ই শয়তান তাদের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করে। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।” [সূরা বনী ইসরাঈল: ৫৩]
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক, সত্য ও স্পষ্ট কথা বল। তাহলে তিনি তোমাদের আমলসমূহ সংশোধন করে দেবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।” [সূরা আহযাব: ৭০-৭১]
৩. জবানের ভয়াবহতা ও জাহান্নামের সতর্কবাণী
আমরা মুখ দিয়ে যা-ই বলি না কেন, তার প্রতিটি শব্দ নিখুঁতভাবে রেকর্ড হচ্ছে:
إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
“স্মরণ রেখ, দুই গ্রহণকারী ফেরেশতা ডানে ও বামে বসে সবকিছু লিপিবদ্ধ করে; মানুষ যে কথাই মুখ দিয়ে উচ্চারণ করে, তা লেখার জন্য সদা প্রস্তুত প্রহরী নিযুক্ত রয়েছে।” [সূরা ক্বাফ: ১৭-১৮]
১. জাহান্নামে যাওয়ার প্রধান কারণ
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে? তিনি ইরশাদ করলেন: “মুখ (জবান) এবং লজ্জাস্থান।” [জামে তিরমিযী: ২০০৪]
২. মু'আয (রা.)-কে নবীজির ঐতিহাসিক চাবুক
হযরত মু'আয ইবনে জাবাল (রা.) দীর্ঘ সফর শেষে নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! দ্বীনের সমস্ত আমল নিয়ন্ত্রণকারী মূল ভিত্তি কোনটি?” নবীজি (সা.) নিজের পবিত্র জিহ্বা মোবারক হাত দিয়ে ধরে বললেন: «كُفَّ عَلَيْكَ هَذَا» — “এটিকে সংযত রাখ।”
মু'আয (রা.) অবাক হয়ে বললেন, “আমরা যা মুখ দিয়ে বলি, তার জন্যও কি আমাদের পাকড়াও করা হবে?” নবীজি (সা.) ব্যথিত হয়ে বললেন:
অর্থ: “তোমার মা তোমাকে হারাক হে মু'আয! মানুষের জিহ্বার উপার্জিত পাপ ছাড়া আর কী এমন জিনিস আছে যা মানুষকে মুখের ওপর আছড়ে ফেলে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে?” [জামে তিরমিযী: ২৬১৬]
৩. অতল গহ্বরে নিক্ষেপকারী একটি কথা
অর্থ: “নিশ্চয়ই বান্দা কখনো এমন একটি কথা অবহেলাভরে বলে ফেলে, যার পরিণতির কথা সে ভাবেও না; অথচ সেই একটি কথার কারণে সে জাহান্নামের এত গভীরে নিক্ষিপ্ত হয়, যা পূর্ব ও পশ্চিমের দূরত্বের চেয়েও বেশি।” [সহীহ মুসলিম: ২৯৮৮]
৪. নবীজির অপছন্দের ৩ শ্রেণির বক্তা
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন তাঁর কাছ থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী আসনে অবস্থান করবে অহংকারী বাচালরা:
অর্থ: “কিয়ামতের দিন আমার কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় ও সবচেয়ে দূরে থাকবে: ১. الثَّرْثَارُونَ (অনর্থক বেশি কথা বলা বাচাল), ২. الْمُتَشَدِّقُونَ (কৃত্রিমভাবে মুখ বাঁকিয়ে অহংকার প্রদর্শনকারী বাগ্মী), এবং ৩. الْمُتَفَيْهِقُونَ (অহংকারী ব্যক্তিরা)।” [জামে তিরমিযী: ২০১৮]
৫. আমল ধ্বংসকারী জবান (নফল নামাজি নারীর কাহিনী)
এক সাহাবী নবীজির দরবারে এসে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! অমুক নারী রাতভর তাহাজ্জুদ পড়ে, দিনে নফল রোজা রাখে এবং প্রচুর সদকা করে; কিন্তু মুখের ভাষা দিয়ে প্রতিবেশীদের কষ্ট দেয়।” নবীজি (সা.) এক বাক্যে ফায়সালা দিলেন: «هِيَ فِي النَّارِ» — “সে জাহান্নামী!”
এরপর লোকটি বললেন, “আরেক নারী কেবল ফরজ আদায় করে, নফল তেমন পড়ে না, সামান্য পনিরের টুকরো সদকা করে; কিন্তু জবান দিয়ে কখনো কাউকে কষ্ট দেয় না।” নবীজি বললেন: «هِيَ فِي الْجَنَّةِ» — “সে জান্নাতী!” [মুসনাদে আহমাদ: ৯৬৭৫]
৬. জবানের কাছে সমস্ত অঙ্গের মিনতি
অর্থ: “আদম সন্তান সকালে ঘুম থেকে উঠলে শরীরের সমস্ত অঙ্গ জিহ্বাকে বিনীতভাবে অনুরোধ করে বলে: ‘আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। কারণ আমরা তোমার ওপর নির্ভরশীল। তুমি যদি সোজা থাক, আমরাও সোজা থাকব; আর তুমি যদি বাঁকা হয়ে যাও, তবে আমরাও ধ্বংস হয়ে যাব’।” [জামে তিরমিযী: ২৪০৭]
৭. ঈমান সোজা হওয়ার শর্ত জবান সোজা হওয়া
অর্থ: “কোনো বান্দার ঈমান পরিপূর্ণ সোজা হতে পারে না যতক্ষণ না তার অন্তর সোজা ও শুদ্ধ হয়। আর তার অন্তরও শুদ্ধ হয় না যতক্ষণ না তার জিহ্বা সোজা হয়।” [মুসনাদে আহমাদ: ১৩০৪৮]
৪. সালাফদের সতর্কতা ও নীরবতার অলৌকিক শক্তি
যাঁদের ঈমান ও জান্নাতের সনদ স্বয়ং আল্লাহ দিয়েছেন, তাঁরা এই জবানকে কতটা ভয় করতেন:
১. সিদ্দিকে আকবর (রা.)-এর কান্না: ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) নির্জনে বসে নিজের জিহ্বা হাত দিয়ে টেনে ধরে কাঁদতেন। হযরত উমর (রা.) দেখে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূলের খলিফা! থামুন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন!” আবু বকর (রা.) কেঁদে বললেন:
“এই জিহ্বাই আমাকে সমস্ত ধ্বংস ও বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে!” [মুয়াত্তা মালেক: ১৮১৪]
২. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)-কে নবীজির ধমক: হযরত আয়েশা (রা.) একবার হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন, “সাফিয়্যা তো খাটো!” নবী করীম (সা.) তীব্র ব্যথায় শিউরে উঠে বললেন:
“আয়েশা! তুমি এমন একটি কথা বলেছ, যা সাগরের পানিতে ফেলে দিলে পুরো সাগরের পানি তিক্ত ও দূষিত হয়ে যেত!” [জামে তিরমিযী: ২৫০২]
বর্শার আঘাত বনাম কথার আঘাত
“বর্শার ফলার আঘাত সময়ের ব্যবধানে শুকিয়ে যায়; কিন্তু জবানের নিষ্ঠুর আঘাতের ক্ষত জীবনেও সারে না!” [শরহে জামী]
চুপ থাকার সুসংবাদ ও জান্নাতের গ্যারান্টি
অর্থ: “যে চুপ থাকল, সে মুক্তি পেল।” [জামে তিরমিযী: ২৫০১]
অর্থ: “যে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, অন্যথায় নিশ্চুপ থাকে।” [সহীহ বুখারী: ৬০১৮]
অর্থ: “যে ব্যক্তি আমার কাছে তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী অঙ্গ (জিহ্বা) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী অঙ্গের (লজ্জাস্থান) হেফাজতের জামিন হবে, আমি মুহাম্মদ তার জান্নাতের জামিন হব!” [সহীহ বুখারী: ৬৪৭৪]
إِذَا تَمَّ الْعَقْلُ نَقَصَ الْكَلَامُ — “মানুষের বিবেক যখন পূর্ণতা পায়, তখন তার কথা কমে যায়।”
مَنْ كَثُرَ كَلَامُهُ كَثُرَ سَقَطُهُ، وَمَنْ كَثُرَ سَقَطُهُ قَلَّ حَيَاؤُهُ — “যার কথা বেশি তার ভুল বেশি, যার ভুল বেশি তার লজ্জা কমে, যার লজ্জা কমে তার তাকওয়া কমে, আর যার তাকওয়া কমে তার অন্তর মৃত হয়ে যায়।”
ইমাম আওযায়ী (রহ.) বলেন: “খাঁটি মুমিন কাজ বেশি করে কথা কম বলে, আর কপট মুনাফিক কথা বেশি বলে কাজ কম করে!”
নবীজি (সা.)-এর স্বভাব مبارক: «كَانَ طَوِيلَ الصَّمْتِ قَلِيلَ الضَّحِكِ» — “তিনি দীর্ঘ সময় চুপ থাকতেন এবং খুব কম হাসতেন।” [মুসনাদে আহমাদ: ২০৮১০]
“নদীর অগভীর স্রোতের কলতানকে সাগরের নিস্তব্ধতা বলে—যার ভেতরে আত্মমর্যাদা ও প্রজ্ঞা যত গভীর, সে তত বেশি নিশ্চুপ থাকে।”
৫. ক্লাইম্যাক্স: মরুভূমিতে ৪০ বছর কুরআনের ভাষায় কথা বলা মহীয়সী নারী
জবানকে আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচাতে আমাদের পূর্বসূরিরা কেমন সাধনা করেছেন, তার এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন বিখ্যাত মুহাদ্দিস হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.)। কিতাবুল মুস্তাতরাফে বর্ণিত সেই পূর্ণাঙ্গ সংলাপ নিচে মোবাইল-বান্ধব কার্ড আকারে কোনো প্রকার টেবিল ছাড়া হুবহু তুলে ধরা হলো:
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) বলেন, আমি একবার হজের সফরে বের হলাম। নির্জন মরুভূমির মাঝে দেখলাম চাদর গায়ে জড়িয়ে এক বৃদ্ধা মহিলা একা বসে আছেন। কাফেলা থেকে বিচ্ছিন্ন এই মহিলার কাছে গিয়ে আমি কথা বলতে লাগলাম:
১. ইবনে মুবারক সালাম দিলেন: “আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।”
سَلَامٌ قَوْلًا مِّن رَّبٍّ رَّحِيمٍ
অর্থ: “পরম দয়ালু রবের পক্ষ থেকে তাদের বলা হবে সালাম।” [সূরা ইয়াসীন: ৫৮]
২. প্রশ্ন: “এখানে আপনি কী করছেন?”
وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَا هَادِيَ لَهُ
অর্থ: “আল্লাহ যাকে পথহারা করেন, তাকে পথ দেখাবার কেউ নেই।” [সূরা আ'রাফ: ১৮৬] (বুঝলাম তিনি কাফেলা হারিয়ে ফেলেছেন)
৩. প্রশ্ন: “কোথায় যাবেন?”
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى
অর্থ: “পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছিলেন।” [সূরা বনী ইসরাঈল: ১] (হজ শেষ, বায়তুল মুকাদ্দাস যাবেন)
৪. প্রশ্ন: “কতক্ষণ ধরে এখানে বসে আছেন?”
ثَلَاثَ لَيَالٍ سَوِيًّا
অর্থ: “একটানা পূর্ণ তিনটি রাত।” [সূরা মারইয়াম: ১০]
৫. প্রশ্ন: “খাবার-পানি তো দেখছি না, কী খেয়ে আছেন?”
وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ
অর্থ: “যিনি আমাকে অন্ন দান করেন এবং পানীয় পান করান।” [সূরা শু'আরা: ৭৯]
৬. প্রশ্ন: “মরুভূমিতে তো পানি নেই, নামাজ পড়ছেন কীভাবে?”
فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا
অর্থ: “সুতরাং তোমরা পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করে নাও।” [সূরা নিসা: ৪৩]
৭. প্রশ্ন: “আমার কাছে কিছু খাবার আছে, খাবেন?”
ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ
অর্থ: “অতঃপর রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর।” [সূরা বাকারা: ১৮৭] (অর্থাৎ রোজা আছেন)
৮. প্রশ্ন: “মুসাফির অবস্থায় রোজা না রাখলে অসুবিধা কোথায়?”
وَأَن تَصُومُوا خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
অর্থ: “রোজা রাখাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণকর, যদি তোমরা উপলব্ধি কর।” [সূরা বাকারা: ১৮৪]
৯. প্রশ্ন: “আমার মতো সাধারণ ভাষায় কথা বলছেন না কেন?”
مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
অর্থ: “মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লেখার জন্য সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।” [সূরা ক্বাফ: ১৮]
১০. প্রশ্ন: “আপনার বংশ বা গোত্র কী?”
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ
অর্থ: “যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার পেছনে পড়ো না।” [সূরা বনী ইসরাঈল: ৩৬]
১১. অনুনয়: “ভুল হয়েছে, আমাকে মাফ করবেন।”
لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
অর্থ: “আজ তোমাদের প্রতি কোনো তিরস্কার নেই; আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন, তিনি তো শ্রেষ্ঠ দয়ালু।” [সূরা ইউসুফ: ৯২]
১২. প্রস্তাব: “আমার উটনীর পিঠে চড়ে কাফেলার কাছে চলুন।”
وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ يَعْلَمْهُ اللَّهُ
অর্থ: “তোমরা যে সৎকাজই কর না কেন, আল্লাহ তা জানেন।” [সূরা বাকারা: ১৯৭]
১৩. সওয়ার হওয়ার পূর্বে দৃষ্টি অবনত করার স্মরণ:
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ
অর্থ: “মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন দৃষ্টিকে অবনত রাখে।” [সূরা নূর: ৩০] (ইবনে মুবারক দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন)
১৪. উটের গায়ে আটকে চাদর কিছুটা ছিঁড়ে যাওয়ায়:
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ
অর্থ: “তোমাদের ওপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল।” [সূরা শু'আরা: ৩০]
১৫. উট শক্ত করে বাঁধার কৌশল দেখে:
فَفَهَّمْنَاهَا سُلَيْمَانَ
অর্থ: “আমি এ বিষয়ের সঠিক সমাধান সুলাইমানকে শিখিয়ে দিয়েছিলাম।” [সূরা আম্বিয়া: ৭৯]
১৬. উটের পিঠে উঠে সওয়ারীর দোয়া:
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَٰذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَىٰ رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ
অর্থ: “পবিত্র সে সত্তা যিনি একে বশীভূত করেছেন, অথচ আমরা একে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম ছিলাম না এবং নিশ্চয়ই আমরা আমাদের প্রতিপালকের দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।” [সূরা যুখরুফ: ১৩-১৪]
১৭. ইবনে মুবারকের দ্রুত হাঁটা ও উট তাড়া করার আওয়াজে:
وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِن صَوْتِكَ
অর্থ: “চলার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন কর এবং কণ্ঠস্বর নিচু কর।” [সূরা লুকমান: ১৯]
১৮. কবিতার ছন্দ গুনগুন করায় বৃদ্ধার নসীহত:
فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنَ الْقُرْآنِ
অর্থ: “অতএব কুরআন থেকে যতটুকু সহজ মনে হয় তিলাওয়াত কর।” [সূরা মুয্যাম্মিল: ২০]
১৯. প্রশ্ন: “আপনার স্বামী কি বেঁচে আছেন?”
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَسْأَلُوا عَنْ أَشْيَاءَ إِن تُبْدَ لَكُمْ تَسُؤْكُمْ
অর্থ: “এমন বিষয়ে প্রশ্ন করো না, যা প্রকাশ পেলে খারাপ লাগবে।” [সূরা মায়েদা: ১০১]
২০. কাফেলায় পৌঁছে: “কাফেলায় আপনার কে আছে?”
الْمَالُ وَالْبَنُونَ زِينَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا
অর্থ: “সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য।” [সূরা কাহফ: ৪৬] (বুঝলাম ছেলেরা আছে)
২১. প্রশ্ন: “ছেলেরা কাফেলায় কী কাজ করে?”
وَعَلَامَاتٍ وَبِالنَّجْمِ هُمْ يَهْتَدُونَ
অর্থ: “নক্ষত্রের সাহায্যেও মানুষ পথ নির্দেশনা পায়।” [সূরা নাহল: ১৬] (ছেলেরা কাফেলার গাইড)
২২. ছেলেদের নাম জানতে চাইলে ৩টি আয়াত পড়লেন:
১. ছেলে ইবরাহীম: وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا [সূরা নিসা: ১২৫]
২. ছেলে মূসা: وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَىٰ تَكْلِيمًا [সূরা নিসা: ১৬৪]
৩. ছেলে ইয়াহইয়া: يَا يَحْيَىٰ خُذِ الْكِتَابَ بِقُوَّةٍ [সূরা মারইয়াম: ১২]
ইবনে মুবারক নাম ধরে ডাকতেই চাঁদের মতো সুন্দর ৩ যুবক দৌড়ে আসল।
২৩. ছেলেদের মেহমানের জন্য খাবার কেনার নির্দেশ:
فَابْعَثُوا أَحَدَكُم بِوَرِقِكُمْ هَٰذِهِ إِلَى الْمَدِينَةِ فَلْيَنظُرْ أَيُّهَا أَزْكَىٰ طَعَامًا فَلْيَأْتِكُم بِرِزْقٍ مِّنْهُ
অর্থ: “তোমাদের একজনকে রূপার মুদ্রাসহ শহরে পাঠাও; সে যেন দেখে সবচেয়ে পবিত্র খাবার কোনটি এবং তা নিয়ে আসে।” [সূরা কাহফ: ১৯]
২৪. খাবার আনার পর মেহমানকে আপ্যায়ন:
كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا بِمَا أَسْلَفْتُمْ فِي الْأَيَّامِ الْخَالِيَةِ
অর্থ: “বিগত দিনগুলোতে তোমরা যা করেছিলে, তার বিনিময়ে তৃপ্তির সাথে পানাহার কর।” [সূরা হাক্কাহ: ২৪]
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) যুবকদের বললেন, “যতক্ষণ না এর রহস্য বলবে, আমি এক লোকমাও মুখে দেব না!”
ছেলেরা কেঁদে ফেলে বলল: “ইনি আমাদের পুণ্যবতী মা। বিগত ৪০ বছর যাবত আমাদের মা কুরআনের আয়াত ছাড়া একটি কথাও মুখ দিয়ে বের করেন না! তাঁর সার্বক্ষণিক ভয়—যদি অনর্থক কোনো কথার কারণে পরকালে আল্লাহর আদালতে আসামি হয়ে দাঁড়াতে হয়!”
ইবনে মুবারক (রহ.) চোখের পানিতে সিক্ত হয়ে পাঠ করলেন:
ذَٰلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَاءُ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ
“এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।” [সূরা হাদীদ: ২১]
৬. জবান হেফাজতের বাস্তবমুখী ৫টি প্রেসক্রিপশন
১. ৫ সেকেন্ডের ফিল্টার বিরতি: কোনো কথা মুখ দিয়ে বের করার আগে কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় কমেন্ট টাইপ করার আগে নিজেকে মাত্র ৫ সেকেন্ড প্রশ্ন করুন—“এই কথাটি কি আমার আমলনামায় নেকী হিসেবে লেখা হবে, নাকি গুনাহ হিসেবে?” যদি নেকী হয় বলুন, নয়তো গিলে ফেলুন।
২. রাগ উঠলে জিহ্বা লক করার কৌশল (তাবিজের গল্প): মাওলানা তারিক জামিল বলেন, এক পরিবারে শাশুড়ি ও বউয়ের রোজ ঝগড়া হতো। এক বিজ্ঞ বুজুর্গ তাদের একটি করে কাগজের তাবিজ দিয়ে বললেন, “যখনই রাগ উঠবে, এটি জিহ্বার নিচে দাঁত দিয়ে চেপে রাখবে, খবরদার মুখ খুলবে না!” জিহ্বার নিচে কাগজ চেপে রাখায় কেউ আর কথা বলতে পারত না; ফলে ঝগড়াও বন্ধ হয়ে গেল। মূলত তাবিজ নয়—দাঁত ও জিহ্বা চেপে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ থাকাই ছিল ঝগড়া থামানোর আসল দাওয়াই।
৩. মেপে মেপে কথা বলা: দারুল উলূম দেওবন্দের মহান বুজুর্গ হযরত মিয়াঁ আসগর হোসাইন ও পাকিস্তানের মুফতীয়ে আজম মুফতী মুহাম্মাদ শফী (রহ.) অনর্থক কথার গুনাহ থেকে বাঁচতে নিজেদের মাতৃভাষা উর্দু ছেড়ে আরবীতে কথা বলার চুক্তি করেছিলেন, যাতে সাবধানে ধীরস্থিরভাবে কথা বলতে হয়।
৪. ডিজিটাল জবান নিয়ন্ত্রণ: যেসব ফেসবুক গ্রুপ, পেজ বা কমেন্ট বক্সে গীবত, পরনিন্দা ও ট্রোলিং হয়, সেখান থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখুন। ফেসবুক স্ক্রল করার সময় কারও চরিত্রহনন দেখতে পেলে এড়িয়ে চলুন।
৫. জিহ্বাকে সর্বদা যিকিরে সিক্ত রাখা: জিহ্বা কখনো খালি থাকতে পারে না; হয় সে অনর্থক কথা বলবে, নয়তো আল্লাহর যিকির করবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «لَا يَزَالُ لِسَانُكَ رَطْبًا مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ» “তোমার জিহ্বা যেন সর্বদা আল্লাহর যিকিরে সতেজ ও সিক্ত থাকে।” [তিরমিযী: ৩৩৭৫]
৭. নববী দোয়া ও আত্মশুদ্ধি
জবানের সমস্ত অনিষ্ট, পদস্খলন ও পাপ থেকে বাঁচতে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে এই অত্যন্ত জামে ও ফজিলতপূর্ণ দোয়াটি শিক্ষা দিয়েছেন। এটি আমাদের সকলের প্রতিদিন পাঠ করা উচিত:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযু বিকা মিন শাররি সাম'ঈ, ওয়া মিন শাররি বাশারী, ওয়া মিন শাররি লিসানী, ওয়া মিন শাররি ক্বলবী, ওয়া মিন শাররি মানিয়্যী।
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আমার কানের অনিষ্ট থেকে, চোখের অনিষ্ট থেকে, জবানের অনিষ্ট থেকে, অন্তরের অনিষ্ট থেকে এবং কামপ্রবৃত্তির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” [আবু দাউদ: ১৫৫১, তিরমিযী: ৩৪৯২]
মহান রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে জবানের মারাত্মক গুনাহসমূহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন। আমাদের মুখের ভাষাকে সুন্দর, নির্মল ও সত্যবাদী বানিয়ে দিন। আমাদের এই জবানকে জান্নাতে যাওয়ার সহজ উসিলা বানিয়ে দিন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন