হাশিয়া ও কিতাবাত টীকা
সাপোর্ট করুন
হোম কওমী মাদ্রাসা দরসে কাফিয়া (৬০) : المندوب-এর তা'রীফ, دفع التباس এবং «وَا زَيْدَ الطَّوِيلَاهْ» নিষিদ্ধ হওয়ার তাহকীক্ব

দরসে কাফিয়া (৬০) : المندوب-এর তা'রীফ, دفع التباس এবং «وَا زَيْدَ الطَّوِيلَاهْ» নিষিদ্ধ হওয়ার তাহকীক্ব

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ পড়তে ১ মিনিট লাগতে পারে
লেখা:
পড়তে ভালো লাগছে না? শুনে নিন
[toc]

المتن الأصلي (মূল কিতাবের ইবারত)

নিচের মূল আরবি ইবারতের প্রতিটি শব্দের ওপর মাউস হোভার করুন (বা মোবাইলে স্পর্শ করুন) সরাসরি শব্দার্থ দেখার জন্য। উপরে থাকা বাটন ব্যবহার করে এক ক্লিকে হরকত চালু/বন্ধ ও ইবারত কপি করতে পারেন:

وَقَدِ اسْتَعْمَلُوا صِيغَةَ النِّدَاءِ فِي الْمَنْدُوبِ، وَهُوَ الْمُتَفَجَّعُ عَلَيْهِ بـ«يَا» أَوْ «وَا»، وَاخْتُصَّ بـ«وَا»، وَحُكْمُهُ فِي الْإِعْرَابِ وَالْبِنَاءِ حُكْمُ الْمُنَادَى، وَلَكَ زِيَادَةُ الْأَلِفِ فِي آخِرِهِ، فَإِنْ خِفْتَ اللَّبْسَ قُلْتَ: «وَا غُلَامَكِيهْ»، «وَا غُلَامَكُمُوهْ»، وَلَكَ الْهَاءُ فِي الْوَقْفِ، وَلَا يُنْدَبُ إِلَّا الْمَعْرُوفُ، فَلَا يُقَالُ: «وَا رَجُلَاهْ»، وَامْتَنَعَ: «وَا زَيْدَ الطَّوِيلَاهْ»، خِلَافاً لِيُونُسَ.
ইবারতের সরল অনুবাদ:

"এবং নিশ্চয়ই আরবগণ ‘মানদূব’ (শোকগাথা-সম্বোধন)-এর ক্ষেত্রেও নিদার সীগাহ ব্যবহার করেছেন। আর ‘মানদূব’ হলো এমন সত্তা বা বিষয়, যার ওপর ‘يَا’ (ইয়া) অথবা ‘وَا’ (ওয়া)-এর মাধ্যমে শোক ও আহাজারি প্রকাশ করা হয়; এবং মানদূবকে ‘وَا’-এর সাথে খাস (সুনির্দিষ্ট) করা হয়েছে। এবং ই‘রাব ও বিনার ক্ষেত্রে মানদূবের হুকুম সাধারণ মুনাদার হুকুমের অনুরূপ। এবং আপনার জন্য মানদূবের শেষাক্ষরে অতিরিক্ত একটি ‘আলিফ’ বৃদ্ধি করা জায়েয; কিন্তু যদি আপনি এক সীগাহর সাথে অন্য সীগাহর সংমিশ্রণ বা বিভ্রান্তির (التباس) আশঙ্কা করেন, তবে আপনি বলবেন: «وَا غُلَامَكِيهْ» (হে তোমার দাস!) এবং «وَا غُلَامَكُمُوهْ» (হে তোমাদের গোলাম!)। এবং ওয়াক্বফের অবস্থায় আপনার জন্য শেষে ‘হা’ (هاء السكت) বৃদ্ধি করাও জায়েয। আর সুপরিচিত ও নির্দিষ্ট ব্যক্তি (المعروف) ব্যতীত কোনো অজ্ঞাত সত্তার ক্ষেত্রে নুদবাহ (শোক প্রকাশ) করা যায় না; সুতরাং «وَا رَجُلَاهْ» (হায় কোনো এক পুরুষ!) বলা যাবে না। এবং সিফাতের শেষে আলিফ-হা যুক্ত করে «وَا زَيْدَ الطَّوِيلَاهْ» (হায় দীর্ঘদেহী যায়েদ!) বলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; যদিও ইমাম ইউনুস (রহ.) এতে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।"


দরসের পটভূমি ও রূপরেখা (تشریح)

আজকের ৬০তম দরসে কিতাবের মুসান্নিফ আল্লামা ইবনু হাজিব (রহ.) মুনাদার অধ্যায়ের সমাপ্তিপর্বে ‘মানদূব’ (الْمَنْدُوب / শোকগাথা-সম্বোধন) সংক্রান্ত অতি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণিক নিয়মাবলি বিশদভাবে আলোচনা করেছেন:

  • প্রারম্ভিক ভূমিকা: মুনাদার পরিচ্ছেদে মানদূব আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা ও গভীর যোগসূত্র।
  • প্রথম বিষয়: মানদূব-এর শাব্দিক তাহকীক্ব, পারিভাষিক তা'রীফ এবং হুরূফে নুদবাহ সংক্রান্ত সূক্ষ্ম আপত্তি ও সমাধান।
  • দ্বিতীয় বিষয়: ই‘রাব ও বিনার ক্ষেত্রে মানদূব-এর সাধারণ ব্যাকরণিক বিধান।
  • তৃতীয় বিষয়: মানদূব ব্যবহারের বিশেষ রূপসমূহ এবং বিভ্রান্তি নিরসনে (دفع التباس) স্বরবর্ণের পরিবর্তন।
  • চতুর্থ বিষয়: মানদূব শুদ্ধ হওয়ার দুটি অপরিহার্য ক্বায়দা এবং ইমাম ইউনুসের মতের বিপরীতে জুমহূর উলামাগণের অকাট্য দলীল।

প্রারম্ভিক ভূমিকা (تمهيد): মুনাদার পরিচ্ছেদে মানদূবের অন্তর্ভুক্তি

«وَقَدِ اسْتَعْمَلُوا صِيغَةَ النِّدَاءِ فِي الْمَنْدُوبِ»

আলোচনার যৌক্তিক কারণ:

আরবগণ শোক, বিলাপ ও আহাজারি প্রকাশের সময় মানদূবের ক্ষেত্রেও হুবহু মুনাদার গঠনরীতি ও হরফে নিদা ব্যবহার করে থাকেন। যেহেতু মানদূবের বাক্যগঠন, হরকত এবং অধিকাংশ নাহবী আহকাম সাধারণ মুনাদার মতোই কার্যকর হয়, সেহেতু মুনাদার সাথে এর গভীর সাদৃশ্যের কারণে মুসান্নিফ মুনাদার পরিচ্ছেদের সমাপ্তিতে মানদূবের আলোচনা নিয়ে এসেছেন[১]


১. প্রথম বিষয়: মানদূব-এর তা'রীফ ও হুরূফে নুদবাহ

«وَهُوَ الْمُتَفَجَّعُ عَلَيْهِ بـ«يَا» أَوْ «وَا»، وَاخْتُصَّ بـ«وَا»»

১.১ শাব্দিক (لغوی) তাহকীক্ব

‘مَنْدُوبٌ’ শব্দটি বাবে যারাবা থেকে গঠিত ইসমে মাফ‘ঊল-এর সীগাহ; এর মূল ধাতু হলো: ن - د - ب (নাদবুন ও নুদবাহ)। অভিধানে এর অর্থ হলো: কোনো মৃত ব্যক্তির অতীত গুণাবলী ও সৌন্দর্য স্মরণ করে গভীর শোক ও আর্তনাদের সাথে ক্রন্দন করা, বিলাপ করা কিংবা আহাজারি করা।

১.২ পারিভাষিক (اصطلاحی) তা'রীফ

পারিভাষিক সংজ্ঞা:

«وَهُوَ الْمُتَفَجَّعُ عَلَيْهِ بـ«يَا» أَوْ «وَا»»

অর্থ: মানদূব হলো এমন সত্তা বা বিষয়, যার ওপর ‘يَا’ অথবা ‘وَا’-এর মাধ্যমে অন্তরের গভীর শোক, ব্যথা ও বেদনা প্রকাশ করা হয়।

১.৩ ‘মুতাফাজ্জা‘ ‘আলাইহি’ (المتفجع عليه)-এর দুটি সূরত

  • (ক) কোনো বড় দুর্যোগ বা মসিবত উপস্থিত থাকার কারণে আহাজারি করা:
    যেমন কোনো দেশে পরাক্রমশালী অত্যাচারী শাসকের জুলুমে অতিষ্ঠ হয়ে নাগরিকগণ বিলাপ করে বলে: «وَا حَسْرَتَاهْ وَوَا مُصِيبَتَاهْ» (হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! হায় আমাদের মহা বিপর্যয়!)। পবিত্র কুরআনে এমন চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে:
    ﴿ فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ ﴾
  • (খ) কোনো প্রিয়জনের বিয়োগ বা অনুপস্থিতির কারণে আহাজারি করা:
    যেমন কোনো প্রিয় ব্যক্তির মৃত্যুতে শোকার্ত হয়ে বলা হয়: «وَا زَيْدَاهْ» (হায় যায়েদ!) অথবা অঙ্গহানির তীব্র বেদনায় বলা হয়: «وَا رَأْسَاهْ» (হায় আমার মস্তক!)।
সূক্ষ্ম আপত্তি ও সমাধান: সীগায়ে নিদা বনাম দুটি হরফ

আপত্তি: মুসান্নিফ ভূমিকার ইবারতে বললেন: «اسْتَعْمَلُوا صِيغَةَ النِّدَاءِ» (তারা নিদার সীগাহ ব্যবহার করে), যা বাহ্যিকভাবে নিদার সকল হরফকে অন্তর্ভুক্ত করে। অথচ তা'রীফের মধ্যে তিনি কেবল দুটি হরফ উল্লেখ করলেন: «بـ«يَا» أَوْ «وَا»»! এটি কি আপাত স্ববিরোধী নয়?
সমাধান: বালাগাত শাস্ত্রের সুপ্রসিদ্ধ মূলনীতি হলো: «اَلْمُطْلَقُ إِذَا أُطْلِقَ يُرَادُ بِهِ الْفَرْدُ الْكَامِلُ» (কোনো শর্তহীন কথা যখন সাধারণভাবে বলা হয়, তখন তার দ্বারা সর্বাধিক পূর্ণাঙ্গ রূপটিই উদ্দেশ্য থাকে)। যেহেতু হরফে নিদার মধ্যে সবচেয়ে কেন্দ্রীয় ও কামেল হরফ হলো ‘يَا’, তাই শুরুতে সীগাহ দ্বারা ‘ইয়া’-কে বোঝানো হয়েছে; আর সংজ্ঞায় এসে তার পূর্ণ বিবরণ পেশ করা হয়েছে[২]

১.৪ হুরূফে নুদবাহ-এর বৈশিষ্ট্য

  • ‘وَا’: এটি মানদূবের জন্য সম্পূর্ণ খাছ বা সুনির্দিষ্ট হরফ (وَاخْتُصَّ بـ«وَا»)। এটি কেবল শোক ও বিলাপ প্রকাশের জন্যই নির্মিত; সাধারণ নিদায় এটি কখনোই ব্যবহৃত হয় না।
  • ‘يَا’: এটি মূলত সাধারণ নিদার প্রধান হরফ। তবে যখন কোনো বাক্য শুনলে সাধারণ নিদার সাথে মানদূবের কোনো বিভ্রান্তির আশঙ্কা না থাকে, কেবল তখনই শোক প্রকাশের ক্ষেত্রেও রূপকভাবে ‘يَا’ ব্যবহার করা জায়েয।

২. দ্বিতীয় বিষয়: মানদূব-এর ব্যাকরণিক হুকুম

«وَحُكْمُهُ فِي الْإِعْرَابِ وَالْبِنَاءِ حُكْمُ الْمُنَادَى»

মানদূব-এর ই‘রাব (মু‘রাব হওয়া) এবং বিনা (মাবনী হওয়া)-এর যাবতীয় বিধান হুবহু সাধারণ মুনাদার নিয়মানুযায়ী পরিচালিত হবে:

  • মুফরাদ মায়রিফাহ হলে: মুনাদা যেমন মুফরাদ মায়রিফাহ অবস্থায় মারফূ‘ (যম্মার ওপর মাবনী) হয়, মানদূবও তেমনি মারফূ‘ ও মাবনী হবে; যেমন: «وَا زَيْدُ» (হায় যায়েদ!)।
  • মুযাফ হলে: মুনাদা যেমন মুযাফ অবস্থায় মানসূব হয়, মানদূবও তেমনি মানসূব হবে; যেমন: «وَا عَبْدَ اللهِ» (হায় আব্দুল্লাহ!)।

৩. তৃতীয় বিষয়: মানদূব ব্যবহারের পদ্ধতি ও বিভ্রান্তি নিরসন

৩.১ স্বর দীর্ঘকরণ ও ওয়াক্বফের নিয়ম

«وَلَكَ زِيَادَةُ الْأَلِفِ فِي آخِرِهِ... وَلَكَ الْهَاءُ فِي الْوَقْفِ»

যেহেতু মানদূবের মূল উদ্দেশ্যই হলো কান্নার আওয়াজকে দীর্ঘ করা (مد الصوت) এবং হৃদয়ের শোককে ভারী করা, সেহেতু আরবরা মানদূব উচ্চারণের ক্ষেত্রে দুটি বাড়তি বৈশিষ্ট্য প্রয়োগ করে থাকে:

  • (ক) শেষাক্ষরে আলিফ বৃদ্ধি: শব্দের শেষাক্ষরে অতিরিক্ত একটি ‘আলিফ’ বৃদ্ধি করা সম্পূর্ণ জায়েয।
  • (খ) ওয়াক্বফে হা-এ সাকতাহ: বাক্য শেষ করে থামার সুবিধার্থে ওয়াক্বফের অবস্থায় শেষে একটি ‘হা-এ সাকতাহ’ (هاء السكت) বৃদ্ধি করা জায়েয।
  • সমন্বিত রূপ: «وَا زَيْدَاهْ» (ওয়া যায়দাহ! — হায় যায়েদ!)।

৩.২ সীগাহর বিভ্রান্তি এড়ানোর ক্বায়দা (دفع التباس)

«فَإِنْ خِفْتَ اللَّبْسَ قُلْتَ: وَا غُلَامَكِيهْ، وَا غُلَامَكُمُوهْ»

মানদূবের শেষে আলিফ বাড়ানো সাধারণ নিয়ম হলেও, যদি এই আলিফ বৃদ্ধির কারণে একটি ব্যাকরণিক সীগাহ অন্য সীগাহর সাথে সংমিশ্রিত (التباس) হয়ে অর্থের বিপর্যয় ঘটে, তবে সেখানে আলিফ আনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমন বিভ্রান্তি রোধে আরবগণ আলিফের পরিবর্তে ভিন্ন হরফ ব্যবহার করেন:

  • মেছাল ১: স্ত্রীলিঙ্গ একবচন মুখাতাবার ক্ষেত্রে («وَا غُلَامَكِيهْ»):
    • মূল বাক্য: «وَا غُلَامَكِ» (কাসরাযুক্ত কাফ যমীর: ‘হায় তোমার দাস!’ — এক নারীকে সম্বোধন করে)।
    • সমস্যা: যদি এখানে সাধারণ নিয়মে আলিফ বাড়ানো হয়, তবে কাফের কাসরা ফাতহায় রূপ নিয়ে শব্দটি দাঁড়াবে «وَا غُلَامَكَا»। ফলে এটি পুরুষ একবচনের সীগাহ «غُلَامَكَ»-এর সাথে মিশে যাবে; তখন শোকটি পুরুষকে করা হলো নাকি নারীকে তা বোঝা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
    • সমাধান: এই বিভ্রান্তি দূর করতে আরবরা আলিফের পরিবর্তে কাফের কাসরাকে দীর্ঘ করে ‘ইয়া’ (ي) যুক্ত করেন এবং ওয়াক্বফের হা যোগ করে বলেন: «وَا غُلَامَكِيهْ» (ওয়া গুলামাকীহ!)।
  • মেছাল ২: পুংলিঙ্গ বহুবচন মুখাতাবের ক্ষেত্রে («وَا غُلَامَكُمُوهْ»):
    • মূল বাক্য: «وَا غُلَامَكُمْ» (সাকিন মীমযুক্ত যমীর: ‘হায় তোমাদের দাস!’ — বহু পুরুষকে সম্বোধন করে)।
    • সমস্যা: যদি এর শেষে সরাসরি আলিফ যোগ করা হয়, তবে শব্দটি দাঁড়াবে «وَا غُلَامَكَمَا»। ফলে এটি দ্বিবচনের সীগাহ «غُلَامَكُمَا» (তোমাদের দুজনের দাস)-এর সাথে হুবহু মিশে মারাত্মক বিভ্রান্তি তৈরি করবে।
    • সমাধান: এই বিভ্রান্তি রোধে আরবরা আলিফ পরিহার করে মীমের ওপর যম্মা দিয়ে একটি ‘ওয়াও’ (و) বৃদ্ধি করেন এবং শেষে হা যোগ করে বলেন: «وَا غُلَامَكُمُوهْ» (ওয়া গুলামাকুমূহ!)।

৪. চতুর্থ বিষয়: মানদূব-এর জন্য দুটি অপরিহার্য ক্বায়দা

৪.১ ক্বায়দা ১: মানদূবকে অবশ্যই ‘মায়রূফ’ (সুপরিচিত) হতে হবে

«وَلَا يُنْدَبُ إِلَّا الْمَعْرُوفُ، فَلَا يُقَالُ: وَا رَجُلَاهْ»

অজ্ঞাত ব্যক্তির ক্ষেত্রে নুদবাহ নিষিদ্ধ:

শোক কেবল এমন কোনো সুনির্দিষ্ট ও সুপরিচিত (معروف / معين) ব্যক্তির ওপর প্রকাশ করা যায়, যার মহত্ত্ব, পরিচিতি ও গুণাবলী মানুষের জানা রয়েছে। কোনো অনির্দিষ্ট বা অজ্ঞাত (نكرة / مجهول) ব্যক্তির ক্ষেত্রে নুদবাহ করা সম্পূর্ণরূপে নাজায়েয।

যৌক্তিক কারণ: মানুষ শোকগাথা শোনার পর শোকার্ত ব্যক্তির প্রতি তখনই সহানুভূতি প্রকাশ করে, যখন তারা জানে যে বিলাপটি কার বিয়োগে করা হচ্ছে। যদি কোনো বিলাপকারী রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোনো অজ্ঞাত ব্যক্তির নামে আর্তনাদ করে বলে: «وَا رَجُلَاهْ» (হায় কোনো এক পুরুষ!), তবে মানুষ তার কান্নার কোনো অর্থই খুঁজে পাবে না; বরং তাকে অপ্রকৃতিস্থ বা পাগল মনে করবে। অতএব, নাকিরাহ শব্দের ক্ষেত্রে নুদবাহ বর্জন করা আবশ্যক।

৪.২ ক্বায়দা ২: নুদবাহর আলিফ ও হা মাওসূফের শেষে লাগবে, সিফাতের শেষে নয়

«وَامْتَنَعَ: وَا زَيْدَ الطَّوِيلَاهْ، خِلَافاً لِيُونُسَ»

মানদূবটি যদি কোনো ‘মাওসূফ ও সিফাত’ মিলে গঠিত হয় (যেমন: দীর্ঘদেহী যায়েদ), তবে জুমহূর নাহববিদগণের মতে নুদবাহর বাড়তি আলিফ ও হা মাওসূফ অর্থাৎ প্রথম শব্দের শেষেই যুক্ত করতে হবে; সিফাতের শেষে তা যুক্ত করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ও অসম্ভব (وَامْتَنَعَ)।
সুতরাং জুমহূরের মতে বিশুদ্ধ রূপ হলো: «وَا زَيْدَاهُ الطَّوِيلَ» (হায় যায়েদ—দীর্ঘদেহী!)। আর সিফাতের শেষে যুক্ত করে «وَا زَيْدَ الطَّوِيلَاهْ» বলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

৪.৩ ইমাম ইউনুস (রহ.)-এর ভিন্নমত ও তাঁর দুই দলীল

বসরার প্রখ্যাত নাহবী ইমাম ইউনুস ইবনে হাবীব (রহ.) জুমহূরের বিরোধিতা করে সিফাতের শেষেও আলিফ-হা যুক্ত করা জায়েয বলেছেন এবং «وَا زَيْدَ الطَّوِيلَاهْ» বলাকে বৈধ সাব্যস্ত করেছেন। তিনি দুটি দলীল পেশ করেছেন:

  • ১. আকলী (যৌক্তিক) দলীল: মাওসূফ ও সিফাত মূলত একই সত্তা। যখন মুযাফের নুদবাহর ক্ষেত্রে ভিন্ন সত্তা হওয়া সত্ত্বেও মুযাফ ইলাইহির শেষে আলিফ-হা যুক্ত হওয়া জায়েয; যেমন: «وَا غُلَامَ زَيْدَاهْ» (হায় যায়েদের দাস!); তখন মাওসূফ ও সিফাত তো এক ও অভিন্ন সত্তা হওয়ায় সিফাতের শেষে আলিফ-হা যুক্ত হওয়া আরও বেশি স্বাভাবিক হওয়া উচিত!
  • ২. নাক্বলী (বর্ণনাভিত্তিক) দলীল: আরবের এক বেদুইনের দুটি উট হারিয়ে যাওয়ায় শোকে বিলাপ করে সে বলেছিল:
    «وَا جُمْجُمَتَيَّ الشَّامِيَّتَيْنَاهْ»
    (হায় আমার শামদেশীয় দুটি উটনী!)। এখানে সে মাওসূফ «جُمْجُمَتَيَّ»-তে আলিফ-হা না এনে তার সিফাত «الشَّامِيَّتَيْنَاهْ»-এর শেষে তা যুক্ত করেছে।

৪.৪ জুমহূর উলামাগণের পক্ষ থেকে ইমাম ইউনুসের জোরালো খণ্ডন

জুমহূরের দ্ব্যর্থহীন সিদ্ধান্ত:

  • ১. আকলী দলীলের খণ্ডন: মুযাফ-মুযাফ ইলাইহির সাথে মাওসূফ-সিফাতের তুলনা করা ‘ক্বিয়াস মা‘আল ফারেক্ব’ (ভ্রান্ত তুলনা)। কারণ মুযাফ তার অর্থ প্রকাশে মুযাফ ইলাইহির প্রতি এমনভাবে মুখাপেক্ষী থাকে যে তারা উভয়ে মিলে একটি একক অখণ্ড শব্দের হুকুমে পরিণত হয় (ككلمة واحدة)। কিন্তু মাওসূফ ও সিফাত এমন নয়; মাওসূফ স্বয়ং একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ পদ, আর সিফাত হলো কেবল তার একটি বাড়তি গুণমাত্র। সুতরাং মাওসূফের বৈশিষ্ট্য সিফাতে টেনে নেওয়া ভিত্তিহীন।
  • ২. নাক্বলী দলীলের খণ্ডন: আরবি ব্যাকরণের সার্বিক মূলনীতির বিপরীতে কোনো এক মরুচারী বেদুইনের মুখনিঃসৃত একটি বিচ্ছিন্ন বাক্য কখনো সাধারণ কায়েদা হতে পারে না। এটি একটি ‘শায’ (شاذ / বিরল ব্যতিক্রম) ব্যবহার; আর শাযের ওপর ভিত্তি করে কখনো সার্বিক ব্যাকরণ রচনা করা যায় না[৩]

خلاصة الدرس (দরসের সার্বিক নির্যাস)

  • ১. মানদূবের তা'রীফ: এমন সত্তা বা বিষয় যার বিয়োগে বা উপস্থিত মসিবতে ‘يَا’ কিংবা ‘وَا’-এর মাধ্যমে শোক প্রকাশ করা হয়।
  • ২. হুরূফে নুদবাহ: ‘وَا’ হলো নুদবাহর জন্য সুনির্দিষ্ট হরফ; তবে দ্ব্যর্থহীন অবস্থায় ‘يَا’-ও ব্যবহার করা জায়েয।
  • ৩. মানদূবের ই‘রাব: হুবহু সাধারণ মুনাদার নিয়মে কার্যকর হবে (মুফরাদ মায়রিফাহ হলে মারফূ‘ ও মাবনী, মুযাফ হলে মানসূব)।
  • ৪. স্বর দীর্ঘকরণ: কান্নার আওয়াজ প্রলম্বিত করার স্বার্থে মানদূবের শেষে আলিফ এবং ওয়াক্বফের অবস্থায় ‘হা’ বৃদ্ধি করা জায়েয (যেমন: «وَا زَيْدَاهْ»)।
  • ৫. বিভ্রান্তি রোধে স্বর পরিবর্তন:
    • স্ত্রীলিঙ্গ মুখাতাবার ক্ষেত্রে আলিফ পরিহার করে ‘ইয়া’ আনা হয় («وَا غُلَامَكِيهْ»)।
    • পুংলিঙ্গ বহুবচন মুখাতাবের ক্ষেত্রে আলিফ পরিহার করে ‘ওয়াও’ আনা হয় («وَا غُلَامَكُمُوهْ»)।
  • ৬. মায়রূফ হওয়া আবশ্যক: মানদূবকে সর্বদা সুপরিচিত হতে হবে; অজ্ঞাত নাকিরাহ শব্দের নুদবাহ নিষিদ্ধ (যেমন: «وَا رَجُلَاهْ» নাজায়েয)।
  • ৭. সিফাতে আলিফ-হা নিষিদ্ধ: নুদবাহর আলিফ-হা মাওসূফে যুক্ত হবে, সিফাতে নয় (যেমন: «وَا زَيْدَاهُ الطَّوِيلَ» জায়েয, কিন্তু «وَا زَيْدَ الطَّوِيلَاهْ» নাজায়েয; এতে ইমাম ইউনুসের মত শায ও প্রত্যাখ্যাত)।
[support-banner]
সম্পর্কিত ট্যাগসমূহ:
লেখাটি ভালো লাগলে আপনার দোয়া বা অনুভূতি জানান
নিচের যেকোনো বোতামে ক্লিক করলে সরাসরি মন্তব্যের ঘরে প্রকাশ করার ব্যবস্থা হবে:
মন্তব্যসমূহ
দোয়াটি সফলভাবে কপি হয়েছে! নিচের কমেন্ট বক্সে পেস্ট (Paste) করে মন্তব্যটি সবার সাথে শেয়ার করুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন