হোম কাফিয়া দরসে কাফিয়া (৩৩) : بَابُ التَّنَازُعِ فِي الْفِعْلَيْنِ-এর তা'রীফ, ৪টি সুরত ও বসরী-কূফী মতভেদ

দরসে কাফিয়া (৩৩) : بَابُ التَّنَازُعِ فِي الْفِعْلَيْنِ-এর তা'রীফ, ৪টি সুরত ও বসরী-কূফী মতভেদ

২৩ আগস্ট, ২০২৬ পড়তে ১ মিনিট লাগতে পারে
লেখা:
কাফিয়া কূফী তানাযু ফিল ফেলান দরসে কাফিয়া নাহব ফায়িল বসরী
পড়তে ভালো লাগছে না? শুনে নিন
দরস: ৩৩ | ইলমে নাহব মূল বিষয়: بَابُ التَّنَازُعِ فِي الْفِعْلَيْنِ (দুটি ফে‘লের পারস্পরিক تنازع)-এর তা'রীফ, ফায়ায়েদে কুয়ুদ, تنازع-এর ৪টি সুরত এবং বসরী ও কূফী আলেমদের ঐতিহাসিক মতভেদ।
[toc]
কিতাবের মূল ইবারত (المتن الأصلي) (অর্থ দেখতে শব্দের ওপর স্পর্শ/ক্লিক করুন)
وَإِذَا تَنَازَعَ الْفِعْلَانِ ظَاهِرًا بَعْدَهُمَا، فَقَدْ يَكُونُ فِي الْفَاعِلِيَّةِ، مِثْلُ: ضَرَبَنِي وَأَكْرَمَنِي زَيْدٌ، وَفِي الْمَفْعُولِيَّةِ، مِثْلُ: ضَرَبْتُ وَأَكْرَمْتُ زَيْدًا، أَوْ فِي الْفَاعِلِيَّةِ وَالْمَفْعُولِيَّةِ مُخْتَلِفَيْنِ، فَيَخْتَارُ الْبَصْرِيُّونَ إِعْمَالَ الثَّانِي، وَالْكُوفِيُّونَ الْأَوَّلَ.

ইবারতের সরল অনুবাদ:

"এবং যখন দুটি ফে‘ল নিজেদের পরে واقع হওয়া একটিমাত্র ইসম যাহির (اسم ظاهر)-কে পাওয়ার জন্য تنازع (পরস্পর দাবি) করে, তখন কখনো এই تنازع ফায়িলিয়্যাতের মধ্যে হয়; যেমন: «ضَرَبَنِي وَأَكْرَمَنِي زَيْدٌ»; কখনো মাফ‘উলিয়্যাতের মধ্যে হয়; যেমন: «ضَرَبْتُ وَأَكْرَمْتُ زَيْدًا»; অথবা ফায়িলিয়্যাত ও মাফ‘উলিয়্যাতের মধ্যে পরস্পর ভিন্ন ভিন্ন হয়। অতঃপর বসরী আলেমগণ ২য় ফে‘লকে আমল দেওয়াকে পছন্দ করেন, আর কূফী আলেমগণ ১ম ফে‘লকে আমল দেওয়াকে উত্তম মনে করেন।"

দরসের মূল রূপরেখা (تشریح):

আজকের দরসে নাহব শাস্ত্রের অত্যন্ত বিখ্যাত ও সূক্ষ্ম অধ্যায় «بَابُ التَّنَازُعِ فِي الْفِعْلَيْنِ» নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এতে মূলত চারটি প্রধান বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে:

  • প্রথম বিষয়: تنازعِ فعلان-এর তা'রীফ (تعريف)।
  • দ্বিতীয় বিষয়: মুসান্নিফের ইবারতের বিশদ ব্যাখ্যা এবং ফায়ায়েদে কুয়ুদ।
  • তৃতীয় বিষয়: تنازع-এর ৪টি মৌলিক সুরত।
  • চতুর্থ বিষয়: বসরী ও কূফী আলেমদের মাযহাব, দলিলসমূহ ও অগ্রাধিকারের কারণ।

প্রথম বিষয়: تنازعِ فعلان-এর তা'রীফ (تعريف)

নাহব শাস্ত্রবিদদের পরিভাষায় تنازعِ فعلان বলা হয়:

هُوَ أَنْ يَتَوَجَّهَ عَامِلَانِ أَوْ أَكْثَرُ إِلَى مَعْمُولٍ وَاحِدٍ بَعْدَهُمَا، كُلُّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا يَقْتَضِيهِ عَلَى سَبِيلِ الْبَدَلِيَّةِ

অনুবাদ: "বাক্যের মধ্যে দুই বা ততোধিক ফে‘ল বা আমেল থাকা এবং তাদের পরে একটিমাত্র ইসম যাহির واقع হওয়া; এমতাবস্থায় যে পূর্ববর্তী প্রতিটি আমেল উক্ত পরবর্তী ইসমটিকে বিকল্প হিসেবে [বিনা শ্রমে] নিজের মা‘মূল বানানোর দাবি করা।"

দ্বিতীয় বিষয়: ইবারতের ব্যাখ্যা ও ফায়ায়েদে কুয়ুদ

মুসান্নিফ (المصنف) কিতাবে বলেছেন: «وَإِذَا تَنَازَعَ الْفِعْلَانِ ظَاهِرًا بَعْدَهُمَا»। নিচে এর ক্বায়দা সমূহের বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:

১. «إِذَا تَنَازَعَ» (যখন দাবি করে):

এখানে تنازع শব্দের আভিধানিক অর্থ (মারামারি বা শত্রুতা করা) উদ্দেশ্য নয়; বরং এর ব্যাকরণগত অর্থ হলো—পরবর্তী ইসমকে নিজের فاعل বা مفعول বানানোর জন্য প্রতিটি ফে‘লের ব্যাকরণিক দাবি বা تقاضا করা।

২. «الْفِعْلَانِ» (দুটি ফে‘ল ও শবেহ ফে‘ল):

আওয়ামিলের মধ্যে ফে‘ল হলো সর্বাধিক শক্তিশালী আমেল (أقوى العوامل)। তবে ফে‘লের সাথে সাথে শবেহ ফে‘ল (شبه فعل) (যেমন: اسم فاعل, اسم مفعول, صفت مشبهة ইত্যাদি)-ও এর অন্তর্ভুক্ত।

শবেহ ফে‘লের দৃষ্টান্ত: «زَيْدٌ ضَارِبٌ وَمُكْرِمٌ بَكْرًا» এবং «بَكْرٌ شَرِيفٌ وَكَرِيمٌ أَبُوهُ»

দুইয়ের অধিক ফে‘ল হওয়া: মুসান্নিফ «الفعلان» (দ্বিবচন) দ্বারা সর্বনিম্ন সংখ্যার কথা উল্লেখ করেছেন। বাস্তবে দুইয়ের অধিক ফে‘লের মধ্যেও تنازع হতে পারে:

৩টি ফে‘লের হাদীসী দৃষ্টান্ত:
تُسَبِّحُونَ وَتَحْمَدُونَ وَتُكَبِّرُونَ دُبُرَ كُلِّ صَلَاةٍ ثَلَاثًا وَثَلَاثِينَ

(এখানে ৩টি ফে‘লই «دُبُرَ»-কে নিজের মাফ‘উল বানানোর দাবি করছে)।

৫টি ফে‘লের দৃষ্টান্ত (দরূদ শরীফ):
كَمَا صَلَّيْتَ وَسَلَّمْتَ وَبَارَكْتَ وَرَحِمْتَ وَتَرَحَّمْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ

(এখানে ৫টি ফে‘লই «عَلَى إِبْرَاهِيمَ»-এর মুতা‘আল্লাক্ব হওয়ার দাবিদার)।

৩. «ظَاهِرًا» (ইসম যাহির হওয়া):

تنازع কেবল ইসম যাহিরের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, যমীর (ضمير)-এর ক্ষেত্রে নয়। কারণ যমীর স্বয়ং সংশ্লিষ্ট ফে‘লের সাথে متصل হয়ে তার নিজস্ব মা‘মূল হয়ে যায়।

৪. «بَعْدَهُمَا» (ফে‘লদ্বয়ের পরে واقع হওয়া):

ইসম যাহিরটিকে অবশ্যই ফে‘লদ্বয়ের পরে আসতে হবে।

  • যদি ইসমটি শুরুতে আসে (যেমন: «زَيْدٌ ضَرَبْتُ وَأَكْرَمْتُ»), তবে তা مبتدأ হয়ে যাবে; ফলে تنازع থাকবে না।
  • যদি ইসমটি দুই ফে‘লের মাঝে আসে (যেমন: «ضَرَبْتُ زَيْدًا وَأَكْرَمْتُ»), তবে সর্বসম্মতভাবে ১ম ফে‘লই তাতে আমল করবে।

তৃতীয় বিষয়: تنازع-এর ৪টি সুরত

মুসান্নিফ বলেছেন: «فَقَدْ يَكُونُ فِي الْفَاعِلِيَّةِ ... أَوْ فِي الْفَاعِلِيَّةِ وَالْمَفْعُولِيَّةِ مُخْتَلِفَيْنِ»। আমল তলব করার বিচারে تنازع-এর মোট ৪টি সুরত হতে পারে:

সুরত ১: উভয় ফে‘ল ফায়িলিয়্যাত (فاعلية) দাবি করা:
দৃষ্টান্ত: «ضَرَبَنِي وَأَكْرَمَنِي زَيْدٌ» (যায়েদ আমাকে প্রহার করেছে এবং আমাকে সম্মান করেছে)।

বিশ্লেষণ: এখানে «ضَرَبَنِي» এবং «أَكْرَمَنِي» উভয় ফে‘লই «زَيْدٌ»-কে নিজের فاعل বানাতে চায়।

সুরত ২: উভয় ফে‘ল মাফ‘উলিয়্যাত (مفعولية) দাবি করা:
দৃষ্টান্ত: «ضَرَبْتُ وَأَكْرَمْتُ زَيْدًا» (আমি যায়েদকে প্রহার করেছি এবং সম্মান করেছি)।

বিশ্লেষণ: এখানে উভয় ফে‘লই «زَيْدًا»-কে নিজের مفعول به বানাতে চায়।

সুরত ৩: ১ম ফে‘ল ফায়িলিয়্যাত ও ২য় ফে‘ল মাফ‘উলিয়্যাত দাবি করা:
দৃষ্টান্ত: «ضَرَبَنِي وَأَكْرَمْتُ زَيْدًا» (যায়েদ আমাকে প্রহার করেছে এবং আমি যায়েদকে সম্মান করেছি)।
সুরত ৪: ১ম ফে‘ল মাফ‘উলিয়্যাত ও ২য় ফে‘ল ফায়িলিয়্যাত দাবি করা:
দৃষ্টান্ত: «ضَرَبْتُ وَأَكْرَمَنِي زَيْدٌ» (আমি যায়েদকে প্রহার করেছি এবং যায়েদ আমাকে সম্মান করেছে)।

চতুর্থ বিষয়: বসরী ও কূফী আলেমদের ঐতিহাসিক মতভেদ

মুসান্নিফ বলেছেন:

فَيَخْتَارُ الْبَصْرِيُّونَ إِعْمَالَ الثَّانِي، وَالْكُوفِيُّونَ الْأَوَّلَ
ঐকমত্যের স্থান (محل الاتفاق):

বসরী ও কূফী উভয় মাযহাবের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো—১ম বা ২য় যেকোনো একটি ফে‘লকে ইসম যাহিরে আমল দেওয়া ব্যাকরণগতভাবে সম্পূর্ণরূপে জায়েয। মতভেদ কেবল কোনটি افضل (উত্তম)—তা নিয়ে।

১. কূফী আলেমগণের মাযহাব (১ম ফে‘লকে আমল দেওয়া উত্তম):
  • দলিল ১: আরবি প্রবাদ হলো «اَلْأَوَّلُ فَالْأَوَّلُ» এবং «اَلْفَضْلُ لِلْمُتَقَدِّمِ» (অগ্রবর্তী সত্তাই শ্রেষ্ঠ ও অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য)। যেহেতু ১ম ফে‘লটি বাক্যে আগে এসেছে, তাই মা‘মূল পাওয়ার প্রথম হকদার সে-ই।
  • দলিল ২: যদি ২য় ফে‘লকে আমল দেওয়া হয়, তবে ১ম ফে‘লের মধ্যে ফায়িলের যমীর উহ্য রাখতে হবে; ফলে ১ম ফে‘লে إضمار قبل الذكر লাযেম আসবে, যা বর্জনীয়।
২. বসরী আলেমগণের মাযহাব (২য় ফে‘লকে আমল দেওয়া উত্তম — মুসান্নিফের নির্বাচিত মত):

বসরী আলেমগণ নিম্নোক্ত শক্তিশালী যুক্তির ভিত্তিতে ২য় ফে‘লকে আমল দেওয়াকে افضل সাব্যস্ত করেছেন:

  • দলিল ১ (নৈকট্য ও সংলগ্নতা): ২য় ফে‘লটি ইসম যাহিরের সবচেয়ে নিকটবর্তী (قربمجاورة)। আমেল ও মা‘মূলের মাঝে অনর্থক ব্যবধান না রাখাই উত্তম।
  • দলিল ২ (عطف قبل التمام থেকে রক্ষা): ১ম ফে‘লকে আমল দিলে ১ম বাক্যটি ফায়িল বা মাফ‘উল দ্বারা পূর্ণাঙ্গ হওয়ার পূর্বেই ২য় জুমলার আতফ (عطف) করতে হয়, যা বালাগাত ও ফাসাহাতের পরিপন্থী।
দলিল ৩ (পবিত্র কুরআনের ব্যবহার ও رسم الخط):
  • পবিত্র কুরআনের আয়াত: ﴿هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهْ﴾ *(সূরা আল-হাক্কাহ: ১৯)*। এখানে ২য় ফে‘ল «اقْرَءُوا» আমল পেয়ে «كِتَابِيَهْ»-কে নসব দিয়েছে। যদি ১ম ফে‘ল «هَاؤُمُ» আমল পেত, তবে কুরআনুল কারীমে «اقْرَؤُوهُ كِتَابِيَهْ» আসত।
  • পবিত্র কুরআনের অপর আয়াত: ﴿آتُونِي أُفْرِغْ عَلَيْهِ قِطْرًا﴾ *(সূরা আল-কাহাফ: ৯৬)*। এখানেও ২য় ফে‘ল «أُفْرِغْ» আমল পেয়ে «قِطْرًا»-কে মাফ‘উল বানিয়েছে।

দলিল ৪ (মুসান্নিফের কর্মপদ্ধতি): মুসান্নিফ নিজেও কাফিয়া কিতাবের সমস্ত দৃষ্টান্তে ২য় ফে‘লের চাহিদা অনুযায়ী ইসম যাহিরের ওপর ই‘রাব দিয়েছেন (যেমন: «ضَرَبَنِي وَأَكْرَمَنِي زَيْدٌ»-এ ২য় ফে‘লের কারণে পেশ দিয়েছেন)।

خلاصة الدرس : দরসের সার্বিক সারসংক্ষেপ

تنازعِ فعلان-এর হাকীকত:

দুই বা ততোধিক ফে‘ল তাদের পরবর্তী একটিমাত্র ইসম যাহিরকে মা‘মূল বানানোর জন্য ব্যাকরণিক দাবি উত্থাপন করা।

تنازع-এর ৪টি সুরত:
  1. উভয় ফে‘ল ফায়িলিয়্যাত চাওয়া («ضَرَبَنِي وَأَكْرَمَنِي زَيْدٌ»)।
  2. উভয় ফে‘ল মাফ‘উলিয়্যাত চাওয়া («ضَرَبْتُ وَأَكْرَمْتُ زَيْدًا»)।
  3. ১ম ফে‘ল ফায়িল ও ২য় ফে‘ল মাফ‘উল চাওয়া («ضَرَبَنِي وَأَكْرَمْتُ زَيْدًا»)।
  4. ১ম ফে‘ল মাফ‘উল ও ২য় ফে‘ল ফায়িল চাওয়া («ضَرَبْتُ وَأَكْرَمَنِي زَيْدٌ»)।
বসরী বনাম কূফী মাযহাবের সারকথা:
  • কূফীগণ: ১ম ফে‘লকে আমল দেওয়া উত্তম (তাক্বদীমের মর্যাদার কারণে)।
  • বসরীগণ (জুমহূর ও রাজেহ): ২য় ফে‘লকে আমল দেওয়া উত্তম (নিকটবর্তী হওয়ার কারণে এবং কুরআনী ব্যবহারের সমর্থনে)।
মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন